২২ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চলে গেলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী অরুনা সাহা

  চলে গেলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী অরুনা সাহা

স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল ॥ না ফেরার দেশে চলে গেলেন সুরেলাকন্ঠের অধিকারী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী (নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত) বরিশালের গৌরনদী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী পালরদী মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় এন্ড কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অরুনা সাহা (৭২)। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ বৃহস্পতিবার সকালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। মৃত্যুকালে তিনি ১ পুত্র, ১ কন্যাসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন ও গুনগ্রাহী রেখে গেছেন।

তার মৃত্যুর খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পরলে গোটা বরিশালজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। ওইদিন বিকেলে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা শেষে গৌরনদীর আশোকাঠী জমিদার বাড়ির পারিবারিক শ্মশানে তার অন্তেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। তার মৃত্যুতে বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে মন্ত্রী আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ এমপি, সাবেক সাংসদ এ্যাডভোকেট তালুকদার মোঃ ইউনুস, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা এ্যাডভোকেট বলরাম পোদ্দার, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও পৌর মেয়র মোঃ হারিছুর রহমান, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান সৈয়দা মনিরুন নাহার মেীর, যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সৈয়দ মনিরুল ইসলাম বুলেট ছিন্টু, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মোঃ হাবিবুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ মামুন মোল্লা, জেলার শ্রেষ্ঠ ইউপি চেয়ারম্যান সৈকত গুহ পিকলু, দৈনিক জনকন্ঠের স্টাফ রিপোর্টার খোকন আহম্মেদ হীরা, জোটের উপজেলা সভাপতি কাজী আল-আমিনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

অরুনা সাহা ছিলেন গৌরনদীর আশোকাঠী গ্রামের প্রভাবশালী জমিদার প্রয়াত মোহন লাল সাহার পুত্র গৌরনদী শিশু একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা মানিক লাল সাহার সহধর্মীনি। মানিক লাল সাহাও ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী। অরুনা সাহা জীবিত অবস্থায় জনকন্ঠের এ প্রতিনিধির সাথে একান্ত সাক্ষাতকারে জানিয়েছিলেন-যুদ্ধদিনের তার নানা অজানা কথা। এনিয়ে দৈনিক জনকন্ঠে “স্বাধীন বাংলা বেতারের উপেক্ষিত শিল্পী...” শিরোনামে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশের পর বর্তমান সরকার তাকে সম্মাননা প্রদান করে নারী মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়েছেন। জীবিত অবস্থায় এ গুনী শিল্পী অসংখ্য পদক পেয়েছেন।

সূত্রমতে, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মুক্তাঞ্চলে গান গেয়ে মুক্তিবাহিনীর দামাল ছেলেদের উদ্বুদ্ধ করেছেন অরুনা সাহা। ভারতের বিভিন্নস্থানে গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের জন্য তহবিল সংগ্রনের পাশাপাশি নিয়মিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তিনি গান গাইতেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে বসে তিনি সানিধ্য পেয়েছেন গুনী শিল্পী সরদার আলাউদ্দিন, আপেল মাহমুদ, মাজহারুল ইসলাম, শহীদুল ইসলাম, শান্তি মুখার্জি, মঞ্জুর আহমেদ, দীলিপ সোম, অবিনাশ শীল, মাধুরী আচার্য, স্বপ্না রায়, নমিতা ঘোষ, বাদল রশীদ, আব্দুর জব্বার, রমা ভৌমিক ও মানিক লাল সাহার।

স্বাধীন বাংলা বেতারের সারাজাগানো-‘কারার ওই লৌহ কপাট’/ ‘সবকটা জানালা খুলে দাওনা’/ ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য্য উঠেছে’/ ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’সহ অসংখ্য ঐতিহাসিক গানের সহশিল্পী অরুনা সাহার জন্ম ফরিদপুরের চকবাজার এলাকায়। তার বাবা পরিমল সাহা ছিলেন চকবাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। তিন বোন ও পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় অরুনা সাহা ডিগ্রীর ছাত্রাবস্থায় দেশে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাবার সাথে ভারতে পারি জমান। বালীগঞ্জ সার্কুলার রোডের একটি বাড়িতে বসে আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুর রহমানের সাথে তার পরিচয় হয়। তার সহযোগিতায় অরুনা সাহা সুযোগ পান স্বাধীন বাংলা বেতারের একজন নিয়মিত শিল্পী হিসেবে। নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একজন নিয়মিত শিল্পী হিসেবে গুরু দায়িত্ব পালন করেন অরুনা সাহা।

দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৪ সালে সামাজিকভাবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের আরেক নিয়মিত শিল্পী বরিশালের গৌরনদী উপজেলার প্রভাবশালী জমিদার প্রয়াত মোহন লাল সাহার পুত্র মানিক লাল সাহার সাথে অরুনা সাহা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর স্বামী ও স্ত্রীর দু’জনের উদ্যোগে গৌরনদীতে ‘কুহুতান’ নামের একটি সংগীত বিদ্যালয়ের আত্মপ্রকাশ ঘটে। স্বামী ও স্ত্রী দু’জনেই ওই বিদ্যালয়ে গানের ক্লাশ নিতেন। তাদের সৃষ্টি বাংলাদেশের খ্যাতনামা ব্যান্ড শিল্পী-জুয়েল, গোবিন্দ লাল সাহা, রুবি আক্তার, সন্ধ্যা বিশ্বাস, বাবুল সোম, আমিন মোল্লা, কাজী সেকান্দার, ডলি বণিকসহ শত শত শিল্পীরা আজ বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে সুনামের সাথে সংগীত পরিবেশন করছেন। বর্তমানে কুহুতান সংগীত বিদ্যালয়টি “গৌরনদী শিশু একাডেমী” নামে গৌরবোজ্জ্বল।

১৯৭৬ সালে অরুনা সাহা সংগীতের পাশাপাশি গৌরনদী টরকী বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৮১ সালে তার শ্বশুড়ের প্রতিষ্ঠিত তৎকালীন যশোর শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে অন্যতম বিদ্যাপীঠ গৌরনদীর পালরদী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেই তিনি অবসরগ্রহণ করেছেন। ১৯৯১ সালে ২৪ ফেব্রুয়ারী অরুনা সাহার স্বামী মানিক লাল সাহা পরলোকগমন করেন। পরবর্তীতে এক পুত্র ও এক কন্যাকে নিয়ে জীবন সংগ্রাম করেছেন অরুনা সাহা।

২০১৭ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কালজয়ী শিল্পী আব্দুর জব্বারের মৃত্যুর খবরশুনে অসুস্থ্য হয়ে পরেছিলেন অরুনা সাহা। ওইসময় অরুনা সাহার পুত্র প্রভাষক রাজা রাম সাহা ও কন্যা আইভি সাহা জনকন্ঠর এ প্রতিনিধিকে বলেছিলেন-শিল্পী আব্দুর জব্বারের সাথে তার মায়ের কোন রক্তের সম্পর্ক না থাকলে ছিলো আত্মার সম্পর্ক। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তাদের পরিচয়। ওইসময় শিল্পী আব্দুর জব্বার ও শিল্পী আপেল মাহমুদ তার মা অরুনা সাহাকে বোন ডেকেছিলেন। তাইতো ভাইয়ের (আব্দুর জব্বার) মৃত্যুর সংবাদ শুনে অসুস্থ্য হয়ে পরেছেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী অরুনা সাহা।

রাজা রাম সাহা বলেন, অনেকদিন মায়ের মুখে গুনী শিল্পী আব্দুর জব্বার ও আপেল মাহমুদ মামার অসংখ্য গল্প শুনেছি। তারা টানা নয়মাস নিজের আপন ছোট বোনের মতো মাকে (অরুনা) আগলে রেখেছেন। মা তাদের অনেক স্মৃতিচারণ করেছেন। এ দুই গুনী শিল্পীর অনুপ্রেরণায় মায়ের (অরুনা সাহা) মতো আরও অসংখ্য শিল্পীরা দেশের জন্য কালজয়ী গান গেয়েছেন। যে গানে অনুপ্রানিত হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরেছিলেন। মা বড় ভাইয়ের মতো তাকে জব্বার ভাই বলে ডাকতেন। তিনি (আব্দুর জব্বার) নিজের আপন ছোট বোনের মতো মাকে অরুনা বলে ডাকতেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী হিসেবে দীর্ঘ নয় মাস মা (অরুনা) ওইসব গুনী শিল্পীদের সাথে ভারতের দিল্লী, বোম্বে, গোয়া, পুনা, কানপুর, কাচরাপাড়া ও শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে গোবরা ক্যাম্পে ছিলেন।