২১ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গণহত্যা ১৯৭১ ॥ ঝালকাঠির বেশাইনখান

  • মোঃ রোকনুজ্জামান বাবুল

প্রতিদিনের মতোই ঝালকাঠি জেলার সদর উপজেলার কীর্ত্তিপাশা ইউনিয়নের বেশাইনখান গ্রামের মানুষ একটা সুন্দর দিন শুরু করতে চেয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর তা-বে তাদের জীবনে নেমে আসে ভয়াবহ বিভীষিকা। ১৯৭১ সালের ২০ জুন। স্থানীয় রাজাকারদের খবরের ভিত্তিতে গ্রামের একদিকের ধান ক্ষেত বাদে বাকি ৩ দিকের রাস্তা ও খাল ৪-৫টা ক্যাম্পের পাকিস্তানী আর্মি ঘিরে ফেলে। অনেক রাতেই তারা গ্রাম ঘেরাও করা শুরু করে এবং সকাল হতেই চারদিকে নিদ্রি বেড়াজাল তৈরি করে ফেলে। ফলে গ্রাম থেকে মানুষ তো দূরের কথা কোন একটি প্রাণীর পক্ষেও বের হওয়া সম্ভব ছিল না। এ অবস্থায় আশ্রয় নেয়া বহু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ মারা যেতে পারেন ভেবে গ্রামের লোকজন সামনে আসেন। যেহেতু সে সময় পাকিস্তানী বাহিনী এই এলাকার পাশর্^বর্তী পেয়ারা বাগান কেটে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিল, তাই পেয়ারা বাগান কাটার জন্য গ্রামের প্রায় ১০০-১৫০ জন পুরুষ দা-কাঁচি নিয়ে বের হয়ে গ্রামের সামনের দিকে বর্তমান স্কুল মাঠে উপস্থিত হয়। তখন তাদের সবাইকে ধরে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। সবাইকে একত্র করে বাঁধার পর গ্রামে আর কোন পুরুষ আছে কি-না দেখতে কিছু সংখ্যক পাক আর্মি গ্রামে ঢোকে। তখন গ্রামে যারা ছিলেন তাদের অধিকাংশই মহিলা ও শিশু। কেননা হিন্দুরা গণহত্যার আগেই গ্রাম ত্যাগ করেছিলেন। যারা গ্রামে ছিলেন তারা প্রাণ বাঁচাতে ডোবার কচুরিপানার নিচে লুকিয়েছিলেন। পাকিস্তানী বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় রাজাকার ও লুটেরা বাহিনী গ্রামে ঢুকে ব্যাপক লুটতরাজ করে। অন্যদিকে, রাশেদ আলী, প্রাইমারি স্কুল মাস্টার আবু বকর, সালাউদ্দিন মজনুসহ কয়েকজনকে পেয়ে পাকিস্তানী বাহিনী তাদেরকে ধরে নিয়ে আসে এবং গুলি করে হত্যা করে। পরবর্তীকালে আটককৃত শতাধিক মানুষকে পাকিস্তানী বাহিনী ও রাজাকার বাহিনী পেটানো শুরু করে। পেটাতে পেটাতে যারা মুমূর্ষু হয়ে পড়েন তাদেরকে গুলি করে হত্যার পর বটতলা খালের মধ্যে ফেলে দেয়।

বাকিদের দড়ি দিয়ে বেঁধে নৌকায় তুলে কুড়িয়ানা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নিয়ে কুড়িয়ানা হাইস্কুলের বড় একটি কক্ষে রাখা হয়। এরপর সন্ধ্যায় একজন কক্ষের সামনে এসে ইশারায় যত লোক ছিলেন তাদের দুই ভাগে ভাগ করতে বলে। তার নির্দেশে একজন একজন করে তার সামনে নিয়ে আসতো এবং তার নির্দেশেই আলাদা সারিতে রাখা হতো। এভাবে এক পাশে রাখা হয় মানিক বাহিনীর সদস্য ও যারা মুক্তিযোদ্ধা হবার যোগ্য এমন লোকজন এবং অন্য পাশে সাধারণ মানুষ। এভাবে এক পাশে প্রায় ১০জন আর বাকিদের অন্য পাশে রাখা হয়। প্রাথমিকভাবে কাউকে মুক্তি দেয়া হয়নি। এভাবেই দুই ভাগে তাদের ঝালকাঠি থানায় নিয়ে এসে থানা হাজতের উত্তরের কক্ষে রাখা হয়। দক্ষিণের কক্ষে রাখা হয় মানিক-রতনসহ বাকিদের। এ অবস্থায় পরদিন সকালে থানার ওসি বদরুদ্দিন কয়েকজনকে ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে ছিলেন সলিম উদ্দিন মিয়া, ওসি বদরুদ্দিন ও সিআই শাহ আলম। তারা নানা প্রশ্ন করে ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে তথ্য বের করার চেষ্টা করে। সেদিন অমানুষিক শারীরিক অত্যাচার চালিয়ে কারও মুখ থেকে একটি কথাও বের করা যায়নি। পরবর্তীকালে কেউ কেউ মুক্তি পান। মানিককেও তারা নানা প্রশ্ন করে। মানিকসহ আরও ৭জন পাকিস্তানী বাহিনীকে কোন তথ্য না দেয়ায় ৫টার দিকে থানা থেকে বের করে ঝালকাঠি পৌরসভার কাছে ডিপোর খোয়াঘাটে গুলি করে হত্যা করা হয়। এভাবে বেশাইনখান থেকে আটককৃতদের মধ্যে ১৩ জনকে ঝালকাঠি পৌরসভার খেয়াঘাটে হত্যা করা হয়। জানা যায়, মানিকের বুকে গুলির জবাবে তিনি ৩ বার ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি দিয়ে লুটিয়ে পড়েন।

গ্রামের ভিতরের লাশগুলোর কোনটির ছিল মাথা ফাটানো, কোনটির বুকের পাঁজর ছিল না। শুধু গুলিই নয়, পা দিয়ে মাড়িয়ে অনেককে হত্যা করা হয় সেদিন। লুটপাটের পাশাপাশি চলে ব্যাপক অগ্নিসংযোগ। পাকিস্তানী বাহিনী চলে যাবার পর গ্রামের মহিলারা স্বজনদের খুঁজতে থাকেন।

এই গণহত্যা নিয়ে আরও জানতে পড়ুন ‘১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র’ থেকে প্রকাশিত গণহত্যা নির্ঘণ্ট গ্রন্থমালায় মুনিরা জাহান সুমি রচিত বেশাইনখান গণহত্যা গ্রন্থটি

লেখক : উপ-পরিচালক, গণহত্যা নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র, খুলনা