২৭ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এসেছে এক অচেনা চৈত্র এখনই তীব্র গরম যেন ঠা ঠা গ্রীষ্ম!

এসেছে এক অচেনা চৈত্র এখনই তীব্র গরম যেন ঠা ঠা গ্রীষ্ম!

সমুদ্র হক ॥ এখন আর আকাশের মেঘ দেখে কিছুই বলা যায় না। নিকট অতীতে বলা যেত। আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তনের পালায় মেঘের আচরণও বিরূপ। তা না হলে চৈত্রের শুরুতেই এত গরম! সঙ্গে দুপুরের দাবদাহের রেশ টেনে নিয়ে যায় রাতের অনেকটা সময়। মধ্যরাতের পর অবশ্য একটু শীতল। তবে অল্প সময়ের জন্য। তারপর ধেয়ে আসে প্রকৃতির তাপ। এই চিত্র চৈত্রের চিরচেনা পরিচিতি দেয় না। বগুড়ার প্রবীণ ব্যক্তি খায়রুল সরকার স্মৃতি মেলে বললেনÑ ১৯৮৩ সালের ২৯ মার্চ পারিবারিক এক অনুষ্ঠানে স্যুট (কোট প্যান্ট) পরে গিয়েছিলেন। তখন ছিল চৈত্রের মধ্যভাগ (ভাবা যায়)। তিন যুগ পর সেই চৈত্র হারিয়েই গিয়েছে। উষ্ণ পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। বগুড়ার কেন্দ্রস্থল সাতমাথায় বৃহস্পতিবার বেলা একটার দিকে দেখা যায় রোদের তীব্রতায় জনচলাচল অনেকটা কমে গিয়েছে। নারীদের মাথায় ওড়না ও অবগুণ্ঠনে (মাথায় কাপড় দিয়ে) হাঁটতে দেখা যায়। নবাববাড়ি সড়কে গাছের নিচে গেঞ্জি গায়ে অবসন্ন দেহে দেখা যায় রিক্সা চালকদের। যাত্রীরা ‘এই খালি’ (এই রিক্সা) হাঁক দিলে হাত নেড়ে অপরাগতা জানায়। পথচারীদের স্বগোক্তি ‘একনি ইঙ্কে রোদ, বোশেখ মাসত যে কি হবি (এখনই এত রোদ বৈশাখে যে কি হবে)। পথের ধারের দোকানিদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দেয়া প্রচারের বড় ছাতার নিচে বেচাকেনা করতে দেখা যায়। কেউ চারধারে বাঁশ এঁটে ওপরে চাদর বিছিয়েছে। বেলের শরবত ও আইসক্রিম বিক্রি বেড়েছে। নিউ মার্কেটের দোকানিরা বললেন, দুপুরে খুব একটা বেচাকেনা হয় না, যা হয় বিকালের পর থেকে রাত পর্যন্ত। বাসাবাড়িতে ফ্যান চালানো শুরু হয়েছে। এখন উচ্চ বিত্ত অনেকের ঘরে তাপানুকূল (এয়ারকুলার) যন্ত্র আছে। সেগুলো সচল হয়েছে। রেফ্রিজারেটরে (ফ্রিজ) বরফ বাক্স ও ঠা-া পানির বোতল ভরে থাকছে। প্রাত্যহিক জীবনের এসব চিত্র বলে দেয় চৈত্রের রূপের পরিবর্তন কতটা।

দেশে বর্তমানে কোন ঋতুই ঠিকমতো চেনা যায় না। শীতের প্রতীক্ষা কোন ফল দেয়নি। মাঘ মাস শীতের থাবা না দিয়েই চলে গেল। ফাল্গুন এলো উষ্ণতার প্রলেপ নিয়ে। চৈত্র শুরু হলো চড়া রোদের দুপুরে বাউরি বাতাসের ধুলো উড়িয়ে। ক’বছর ধরে বর্ষার প্রাণ নেই। শরৎ, হেমন্ত, ঋতু শুধু কাব্যে। গ্রীষ্মটা একটু জানান দেয়। এবারের গ্রীষ্ম যে কোন পর্যায়ে ঠেকে! প্রকৃতির স্বাভাবিক চিত্র সরে যাচ্ছে। ক্রমেই উষ্ণ হচ্ছে বায়ুম-ল। গত হাজার বছরেও তা হয়নি। বিজ্ঞানীগণের তথ্য : গ্রীষ্মম-লীয় পর্যায়বৃত্ত পরিবর্তনে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অন্তত এক মিটার বেড়ে তাপমাত্রা বিপজ্জনক মাত্রার একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। যা ডেকে আনবে বড় ধরনের বিপর্যয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের কথা- বিশ্বে সর্বোচ্চ উষ্ণায়নের বছর হতে পারে ২০১৯ সাল। দু’বছর আগেই তা হওয়ার কথা ছিল। বিকিরণজনিত ঠা-া শুষ্ক ছিল। এবার তা হয়তো থাকবে না। যার ভয়াবহ প্রভাব পড়বে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। বাংলাদেশ ও ভারতে থাকবে সর্বোচ্চ তাপপ্রবাহ। ভারতের আবহাওয়া গবেষণা বিভাগ ইতোমধ্যে তীব্র তাপের সতর্কতা দিয়েছে। বাংলাদেশে দাবদাহের সঙ্গে যোগ হতে পারে তীব্র খরা। কিছুদিন ধরেই দেশের প্রকৃতি মরু প্রবাহের মতো। তার ওপর বৈশ্বিক উষ্ণতার আভাস।

গত শতকের এই সময়ের তাপমাত্রা পর্যালোচনা করে জানা যায় তাপমাত্রা ১ দশমিক ২২ ডিগ্রী সেলসিয়াস বেশি। চলতি বছর (২০১৯) তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে। দেশে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার এক রেকর্ড বলছে- ১৯৭২ সালের মে মাসের শেষে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৫ দশমিক ১ ডিগ্রী সেলসিয়াস ছিল রাজশাহীতে। এর ২৩ বছর পর ১৯৯৫ সালের এপ্রিল মাসে ছিল ৪৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস। ২০০৯ সালের এপ্রিল শেষে ছিল ৪২ দশমিক ৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস। ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস। পরবর্তী দুই বছর প্রায় একই তাপমাত্রা ছিল। চলতি বছর ওই তাপমাত্রাও ছাড়িয়ে যেতে পারে। ভয়াবহ খরা দেখা দিতে পারে উত্তরাঞ্চলে। উত্তরাঞ্চলের বৈশিষ্ট্য হলো : শীতের সময় যেমন শীত গ্রীষ্মে তেমনই গরম।