১৯ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বই ॥ একুশের সঙ্কলন

  • নাজনীন বেগম

মারুফ রায়হান সম্পাদিত ‘একুশের সঙ্কলন’ প্রকাশ পায় ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে। সাহিদা নাজের প্রকাশনায় সাময়িকীটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন নাজিব তারেক। প্রবন্ধ সঙ্কলনটির শিরোনামই নির্দেশ করে এর অন্তর্নিহিত বোধ, আবহমান বাংলার সাংস্কৃতিক বৈভবের এক পরিশুদ্ধ আবহ। সঙ্গত কারণে ভাষা সংগ্রামী, বাঙালীর সমৃদ্ধ চেতনার সৃজন ব্যক্তিত্বসহ আরও বিশিষ্ট লেখায় ‘একুশের সঙ্কলনে’র অবয়ব পাঠকের সামনে হাজির হয়েছে। ১৭তম প্রকাশনার এই সংখ্যাটি প্রবন্ধ, বই, অভিমত, স্মরণ, কবিতাসহ আরও কিছু কলেবরে সাজানো-গোছানো হয়। সম্পাদক মারুফ রায়হান তার অভিমতে এই সঙ্কলনটির যাত্রা শুরু, একুশের চেতনা এবং মুক্তির সংগ্রামকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় বাংলাও বাঙালীর ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। প্রবীণ এবং প্রতিভাবান তরুণদের লেখা নিয়ে বের হওয়া সঙ্কলনটি বাংলাদেশের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের এক সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশক। যেখানে মাতৃভূমি আর ভাষাকে সবার ওপরে স্থান দিয়েছেন আলোচ্য বিজ্ঞ লেখকবৃন্দ। এমন সব স্বনামধন্য লেখকের লেখায় যে গ্রন্থটি পাঠকের সামনে আসে তারা অত্যন্ত পরিচিতই শুধু নন আপন সৃজন দ্যোতনায় স্বমহিমায় উদ্ভাসিতও। বিশিষ্ট লেখক, সাহিত্যিক ও গবেষক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন ‘ভাষা ও ভরসা’ প্রবন্ধ। অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবে তিনি দৃঢ় মত প্রকাশ করেন ভাষা কোন মাসের নয় সারা বছরের। যা মানুষের প্রতিদিনের যাপিতজীবন, কর্মদ্যোতনা, প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম এবং সরকার পরিচালিত বিভিন্ন আদেশ-নির্দেশ আর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার সংযোজন। বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাকে তুলে ধরে এই বিজ্ঞজন ভাষা সংগ্রাম ও স্বাধীনতার মতো ঐতিহ্যিক ঘটনা পরম্পরায় আজও কেন সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষার প্রচলন দৃশ্যমান হয়নি এমন প্রশ্নেবিদ্ধ করেছেন সংশ্লিষ্টদের। এর জন্য সমস্ত দায়ভাগ চাপানো হয় রাজনীতিকরণকে। পক্ষান্তরে বিশ্বব্যাপী ইংরেজী ভাষার সম্প্রসারিত প্রভাবকেও রাজনীতিরই সফল সংযোজন বলে মনে করেন এই ভাষাতাত্ত্বিক। অন্য আর এক প্রবন্ধ ‘ভাষার দুর্দশা’ লিখেছেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। ভাষার যে ঐতিহ্যিক ভাব সম্পদ তা জাতিকে তিল তিল করে অর্জন করতে হয়। ভাষা হঠাৎ করে জেগে ওঠা কোন শব্দমালা কিংবা বাক্য নয়। যে সমৃদ্ধ চেতনায় ভাষা আপন শৌর্যে গড়ে ওঠে তার মূল কৃতিত্ব বর্তায় সে নির্দিষ্ট অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর ওপর। শুধু তাই নয় সিংহভাগ মানুষের কথন, চর্চা, পরিশীলিত এবং পরিমার্জিত ধারায় ভাষা সিক্ত হয়, পুরিপুষ্টও হয়। সেখানে গ্রহণ-বর্জনের ব্যাপারটা তার নিজস্বতায় ঘটে চলে। সুতরাং অপ্রয়োজনীয় শব্দ বর্জন কিংবা নতুন ও অন্য ভাষা থেকে শব্দ সংযুক্তকরণ ভাষার মহিমাকে অনন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। ইংরেজী, আরবী, ফারসীসহ বহু শব্দ বাংলা ভাষার সঙ্গে একীভূত হয়ে স্বাতন্ত্রিক বৈশিষ্ট্যে এগিয়ে গেছে। এমন সব দামী কথামালা উপস্থাপিত হয়েছে ‘ভাষার দুর্দশা’ প্রবন্ধে। অধ্যাপক যতীন সরকার লিখেছেন ‘বই থেকে হইনি বিমুখ’। একজন নিবেদিত শিক্ষক পরিশ্রমী পাঠক হবেন এটাই তো স্বাভাবিক। ছাত্র পড়ানোর বিমুগ্ধ আবহে শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতেও এ লেখকের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

একজন সৃজনশীল ব্যক্তি হয়েও প্রচারবিমুখ এই শিক্ষক নিজেকে নিয়তই শাণিত করেছেন, লেখনী শক্তি পরিশীলিত করে শিল্প সত্তায় নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন। সে সব বিস্ময়কর মনন ও সৃষ্টি শক্তি পাঠকের কাছে আদৃতও হয়েছে। বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের লেখা প্রবন্ধ ‘বই’তে উদ্দীপ্ত তারুণ্যের প্রতি তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশমান ধারায় সম্পৃক্ত হয়েও যেন বই পড়াকে প্রতিদিনের কাজের সূচক হিসেবে লালন করার নির্দেশনা আসে। বইকে তিনি অভিষিক্ত করলেন- ‘প্রিয় মানুষের মতো’। বইমেলা পরিদর্শন করে বই পড়ার নিয়মিত অভ্যাস তৈরি হওয়া অত্যন্ত জরুরী- এমনকি কালেরও চাহিদা। আর এক স্বনামধন্য সাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের লেখা ‘প্রকৃতির বই পড়ে...’ প্রবন্ধ ভিন্ন আঙ্গিকে, অন্য মাত্রায়। এখানে লেখক পাঠকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় এনেছেন। সেক্ষেত্রে উদীয়মান তরুণ লেখকদের সাধুবাদ দিয়েছেন নতুন নতুন বই প্রকাশ করার জন্য। তার মতো প্রতি বছর প্রকাশকের সংখ্যার সঙ্গে বইও বাজার দখল করছে যা পাঠক তৈরির নতুন সম্ভাবনাকে উজ্জীবিত করে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরও করবে। ভাষা সংগ্রামী, রবীন্দ্র গবেষক, কবি ও সাহিত্যিক আহমদ রফিক ‘প্রচলন এখনও দূরঅস্ত’ প্রবন্ধটিতে সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষার প্রচলন না হওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেন। তার মতে ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্যপূর্ণ বীজটি ছিল জীবনের সর্বস্তরে মাতৃভাষার ব্যবহার যা আজ অবধি দৃশ্যমান নয়। তিনি সুস্পষ্টভাবে অভিমত ব্যক্ত করেন শ্রেণী বিভক্ত সমাজে ভাষা থেকে আরম্ভ করে সমস্ত কার্যক্রম শ্রেণী স্বার্থেই নির্ধারিত হয়। ফলে এমন অসম ব্যবস্থাকে আঘাত করতে না পারলে মাতৃভাষা তার যথার্থ আসনে প্রতিষ্ঠিত হতে আরও সময় ক্ষেপণ করবে। প্রবন্ধগুলো মূল্যবান, জাতি ও ঐতিহ্যের দিশারি যা আবহমান বাংলা ও ভাষাকে পাঠকের কাছে নিয়ে আসে।