২২ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্বাধীনতা পুরস্কারের অনন্য এক গৌরব

  • রেজা সেলিম

২০১৯ সালের স্বাধীনতা পুরস্কারে যাদের ভূষিত করা হয়েছে তাদের মধ্যে অনন্য একটি নাম আবদুল খালেক। যিনি বাংলাদেশ পুলিশের প্রথম মহাপরিদর্শক। তিনি মুজিবনগর সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী আবদুল খালেক মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গৌরবময় ভূমিকার জন্যে এ বছর স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন। একই বংশোদ্ভূত পরিবারের একজন নগণ্য ভ্রাতুষ্পুত্র হিসেবে পাঠকের কাছে আবদুল খালেকের বৈচিত্র্যময় জীবনের সামান্য কিছু আলোকপাতের উদ্দেশে আজ এই রচনা। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে পুলিশের ভূমিকাকে অনন্য গৌরব এনে দিয়েছে। আমাদের ইতিহাসে সে কথা উজ্জ্বলভাবে লিখিত হলেও এখনও অনেক কিছু আমাদের জানার বাইরে রয়ে গেছে। এই রচনায় সেসবের কিছু সূত্র পাওয়া যাবে, হয়ত কেউ কোনদিন সেসব সূত্রের অনুসন্ধানী গবেষণায় যুক্ত হয়ে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করবেন।

কুমিল্লা জেলার বর্তমান ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার (সাবেক বুড়িচং) জিরুইন গ্রামের এক জনহিতৈষী ভূঁইয়া পরিবারে ১৯২৭ সালের ১ মার্চ আবদুল খালেকের জন্ম। পার্বত্য ত্রিপুরা, তিতাস ও গোমতি নদী ঘেরা বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া অঞ্চলটি দীর্ঘদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। হাঁটাপথ ছাড়া এ অঞ্চলে আর কোন উপায় ছিল না। ব্রিটিশদের ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল সার্ভিস চালুর পরে স্থানীয় রাজাপুর ও শশীদল স্টেশন স্থাপিত হলে এ অঞ্চলের মানুষ প্রথম যান্ত্রিক যানে শহরে প্রবেশের সুযোগ পায়। এছাড়া একটি বিপদ ছিল এই অঞ্চলের মানুষের নিত্যসঙ্গী আর তা হলো গোমতি নদীর বন্যা। উজান ত্রিপুরার পানির ঢল এসে বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়ার সকল ফসলি জমি তলিয়ে দিত। ফলে সম্ভাব্য প্রাপ্ত ফসলের সীমাবদ্ধ উৎপাদন এই এলাকায় একটি প্রকৃতিসৃষ্ট অভাব চালু করেই রেখেছিল।

আবদুল খালেকের পরিবার একটি বর্ধিষ্ণু মধ্যবিত্ত পরিবার ও স্থানীয় নেতৃত্বের অধিকারী ছিল। তার ভাইদের সকলেই শিক্ষিত ছিলেন ও উত্তর কুমিল্লায় সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য পরিচিত ছিলেন। তাদের মূল বাড়িটি তার পিতামহ উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে প্রায় ২০ বিঘা জমির ওপরে গড়ে তোলেন। আবদুল খালেক তাঁর আত্মজীবনী গ্রন্থ ‘স্মৃতিকথা’য় বাড়ির বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে- ‘তিনদিকে নিজস্ব খাল। কয়েকটি ঘর কাঠ-কেওয়ারি বৃহদাকার। বৈঠকঘর বিশাল, পুরু ছনের ছাউনি, দেখতে সুন্দর। গরমকালে খুব আরামপ্রদ। একাংশে মেহমানদের কোঠা, সরকারী কোন অফিসার এলে তাদের থাকার ব্যবস্থা। মাঝখানে চেয়ার, টেবিল, বেঞ্চ, জলচৌকি।’

বাড়ির বর্ণনা থেকে বোঝা যায় এই বাড়ির সদস্য হিসেবে তাঁর যথেষ্ট সুবিধা ও পেশা উন্নয়নে নির্দেশনা পাবার সুযোগ ছিল। তাঁর বড়ভাই আবদুল লতিফ ভুঁইয়া (যিনি আবদু ভুঁইয়া নামে বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন) প্রায় ত্রিশ বছর ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বার, ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রেসিডেন্ট পদে ছিলেন। প্রায়ই সরকারী কোন কর্মকর্তা তাদের বাড়িতে আসতেন ও কোন কোন সময় রাতযাপন করতেন। বাড়ির সকলেই তখন লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগী ছিলেন। ত্রিপুরা রাজপরিবারের উদ্যোগে এই অঞ্চলে বেশ কয়েকটি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়, যার মধ্যে অন্যতম বিদ্যাপীঠ ‘গঙ্গামণ্ডল রাজ ইনস্টিটিউট’, ও কুমিল্লার নওয়াব স্যার কে জি এম ফারুকী প্রতিষ্ঠিত ‘দেবিদ্বার আর পি হাই স্কুল’ বিশেষভাবে সুপরিচিত ছিল। একটি পারিবারিক আলোকিত পরিবেশে আবদুল খালেক ১৯৪১ সালে স্টার মার্কস পেয়ে দেবিদ্বার আর পি হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তখন প্রবেশিকা পরীক্ষা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত হতো ও সেবার এই পরীক্ষায় মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে তিনি প্রথম হয়েছিলেন। ১৯৪৩ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে বিজ্ঞানে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। উল্লেখ্য, যে স্কুল ও কলেজ জীবনে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ পরিবেশে পড়াশোনা করেও নিজ মেধার স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৪৮ সালে সম্মানের সঙ্গে এম এ পাস করে তিনি কিছুদিন জগন্নাথ কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে শিক্ষকতা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনাকালে সে আমলের সেরা ছাত্রদের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয় যাদের মধ্যে শহীদ মুনীর চৌধুরী অন্যতম।

১৯৫০ সালে আবদুল খালেক পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরির জন্যে আবেদন করেন ও পুলিশ বিভাগের জন্যে প্রার্থী হন। সে প্রসঙ্গে ‘স্মৃতিকথা’য় তিনি লিখেছেন, ‘ভাইবা পরীক্ষার সদস্যগণ আমাকে বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন বৈদেশিক চাকরিতে যেতে আমার আপত্তি কেন। আমি তাতে কিছুটা বিব্রত বোধ করে যে উত্তর দিয়েছিলাম কমিশনের সদস্যগণ তা আপত্তিজনক এবং শাস্তিযোগ্য মনে করেন। পরে জানতে পারলাম যে, শাস্তিস্বরূপ আমার প্রাপ্ত নম্বর থেকে অনেক নম্বর কেটে দেয়া হয়, তবে আমার পাস নম্বর রেখে দেয়া হয়।’

সে সময় পূর্ববঙ্গ থেকে মাত্র তিনজন পুলিশ সার্ভিসে নিয়োগ পেয়েছিলেন। ১৯৫১ সালের জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে তিনি সারদা একাডেমিতে প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে তার কর্মজীবন শুরু করেন। কর্তব্য ও ন্যায়নিষ্ঠা বজায় রেখে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের প্রথম আইজিপি পর্যন্ত হয়েছিলেন। একই সঙ্গে মুজিবনগর সরকারে তিনি স্বরাষ্ট্র সচিব ও বঙ্গবন্ধুর সরকারে ১৯৭৩ সালের এপ্রিল থেকে প্রথমে ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব, অর্থনৈতিক বিভাগের সচিব, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ক্রীড়া ও সংস্কৃতি বিভাগের সচিব, কৃষি, মৎস্য ও পশুপালন মন্ত্রণালয়ের সচিব, সবশেষে সংসদ সচিবালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সংসদ সচিব থাকাকালীন জিয়াউর রহমান সরকার তাকে ওএসডি করে ও বিদেশে চাকরি দিয়ে পাঠিয়ে দিতে উদ্যত হলে অবসরের পাঁচ বছর আগেই ১৯৭৮ সালে তিনি স্বেচ্ছায় সরকারী চাকরি থেকে ইস্তফা দেন।

পুলিশ বিভাগে চাকরিকালে তিনি বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো গোপালগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, পাবনা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ। এসব মহকুমা, জেলা ও পরবর্তিতে বিভাগের উর্ধতন কর্মকর্তা হিসেবে তিনি অত্যন্ত দক্ষতা ও সুনামের পরিচয় দেন। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে মুক্তিসংগ্রামের আন্দোলন পরিচালিত হয় তার এক নীরব সাক্ষী ও সহযোগী সমর্থক ছিলেন আবদুল খালেক। বৈবাহিক সূত্রে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে তার অতি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাঁর স্ত্রী ফরিদপুরের এক স্বনামধন্য পরিবারের সদস্য। আবদুল খালেকের শ্বশুরও ছিলেন পুলিশ বিভাগের একজন উর্ধতন কর্মকর্তা (ডিআইজি এ কে এম হাফিজুদ্দিন)।

সরকারী চাকরির সুবাদে ও একজন সচেতন অর্থনীতির ছাত্র হিসেবে আবদুল খালেক উপলব্ধি করেছিলেন পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি যা ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্যমূলক। এ কারণে তিনি বঙ্গবন্ধুর মুক্তিসংগ্রাম আন্দোলনে পরোক্ষ ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। এই বিষয়ে তিনি লিখেন, ‘জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তেমন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল না। ...এক পর্যায়ে ১৯৫০ সালের প্রথমদিকে পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬% অধ্যুষিত বাংলাদেশ পায় রাজস্ব বরাদ্দ-২০% ভাগ এবং বিদেশী সাহায্য ও অনুদান ২০%। কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে প্রতিরক্ষা বিভাগে এবং বেসরকারী চাকরিতে অত্যন্ত নগণ্য সংখ্যক (৫-১৫%) বাঙালী নিয়োগে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি লক্ষ্য করা যায়।’

পাকিস্তান সৃষ্টির পর যেসব বৈষম্য পূর্ববঙ্গের সরকারী চাকরিজীবীদের মনে নানাপ্রকার ক্ষোভ ও প্রতিবাদ দানা বাধে আবদুল খালেক তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। ফলে তাঁর স্বাধীনচেতা মনোভাবের কারণে চাকরির নানা পর্যায়ে তিনি বিড়ম্বনার শিকার হন। তিনি লিখেছেন, ‘ঢাকার ডিআইজি হিসেবে সামরিক কর্মকর্তাদের মনমানসিকতা ও নীতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে পারিনি।’ সামরিক উচ্চ মহল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে তল্লাশি ও অভিযান চালানোর আদেশ পেয়ে তা তিনি প্রত্যাখ্যান করায় তাকে তাৎক্ষণিক বরখাস্তের হুমকি দেয়া হলেও তিনি মাথা নত করেননি। সরকারের নানা সিদ্ধান্তে দ্বিমত পোষণ করায় ১৯৭০ সালের প্রথমার্ধে তাঁকে সারদা পুলিশ একাডেমিতে বদলি করে দেয়া হয়। তিনি সানন্দে সেখানে যোগ দেন ও সাধারণ স্কুলে ছেলেমেয়েদের ভর্তি করিয়ে দেন।

১৯৭১ সালের মার্চ মাস থেকে বিশেষ করে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর পরই দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়া শুরু হয়। ২৫ মার্চের কালোরাত শুরু হলে তিনি সারদায় প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এর অংশ হিসেবে সারদার আশপাশের রাস্তাঘাট কেটে দেয়ার প্রস্তুতি নেয়া হয়। স্থানীয় যুবকদের নিয়ে পুলিশের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী গঠন করা হয় এবং তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। ৩১ মার্চ ঈশ্বরদী থেকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী সারদা দখলের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলে আবদুল খালেক তাঁর স্ত্রী ও দুসন্তানকে নওগাঁয় রেখে আসেন। ১২ এপ্রিল পর্যন্ত সারদা দখলে রাখতে পারলেও একসময় প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে ও তিনি অন্যান্য পুলিশ সদস্যকে নিয়ে ভারতের উদ্দশ্যে যাত্রা করেন। এসময় তিনি বাংলাদেশের সকল পুলিশ সদস্যকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে স্বহস্তে একটি চিঠি লেখেন যা পুলিশ সদস্যদের মনোবল বৃদ্ধিতে ব্যাপক সহায়ক হয়েছিল।

সারদা ত্যাগের সময় পাকিস্তানী বাহিনীর আক্রমণে আবদুল খালেক এক সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে এক বৃদ্ধ মাঝি তাঁকে ঘাস দিয়ে আড়াল করে নৌকায় পদ্মা নদী পাড়ি দিতে সাহায্য করেন। এই আক্রমণে পাকিস্তানী বাহিনী সামরিক হেলিকপ্টার ব্যবহার করে ও প্রায় দুই হাজার মানুষকে প্যারেড মাঠের পাশে হত্যা করে। আবদুল খালেক সে সময় ঘটনাস্থলের মাত্র পাঁচ শ’ গজ দূরে থাকলেও অলৌকিকভাবে সেই নৌকার ঘাসের আড়ালে লুকিয়ে প্রাণ রক্ষা করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই বৃদ্ধ মাঝির কথা তিনি স্মরণ করতেন।

নওগাঁ থেকে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে তিনি ভারত চলে যান। এ সময় কুমিল্লায় পরিবারের সঙ্গে তার কোন যোগাযোগ ছিল না। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র তার বেঁচে থাকার খবর প্রচার করলে সকলের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। ভারতে ফিরে যেয়ে তিনি মুজিবনগর সরকারের অধীনে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শকের দায়িত্ব নেন। সে সময় তার বীরত্ব, সাহসিকতা ও যৌক্তিক ভূমিকার জন্য প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ তাঁকে ১৯৭১ সালের ৪ সেপ্টেম্বর এক আদেশবলে তাকে স্বরাষ্ট্র সচিবের দায়িত্ব দেন ও একই আদেশে তাঁকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পুলিশ মহাপরিদর্শকের দায়িত্ব চালিয়ে যেতে বলা হয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও শরণার্থী শিবিরগুলোর নিরাপত্তার কাজে তিনি পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের কাজ ভাগ করে দেন ও দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধের সহায়তায় পুলিশের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বণ্টন করে বিশেষভাবে প্রশংসিত হন।

স্বাধীন বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনী পুনর্গঠনে আবদুল খালেকের ভূমিকা উজ্জ্বলতর। বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে তিনি দেশের অভ্যন্তরে শান্তি-শৃঙ্খলা স্থাপনে বিশেষ উদ্যোগ নেন। পুলিশের জন্য সহায়ক নীতিমালা প্রণয়নেও তার বিশেষ ভূমিকা ছিল।

জিয়াউর রহমানের আমলে সরকারী চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে শেষ জীবনে তিনি আইন শিক্ষা ও পরামর্শ কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তার স্ত্রী সেলিনা খালেক বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের একজন বিশিষ্ট নেত্রী ও সমাজসেবক। তাদের বড় কন্যা সামিনা খালেক আইনজীবী ও জামাতা সৈয়দ মাহমুদ হোসেন (কুমিল্লার অপর এক কৃতী সন্তান) বাংলাদেশের বর্তমান প্রধান বিচারপতি। তার একমাত্র পুত্র বিকেএস ইনান দেশের একজন খ্যাতনামা স্থপতি। পুত্রবধূ সাইদা সুলতানাও একজন বিশিষ্ট স্থপতি। ২০১৩ সালের ১০ জুন এই প্রথিতযশা পুলিশ কর্মকর্তা ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

নির্লোভ, সৎ ও স্পষ্টভাষী মুক্তিযোদ্ধা আবদুল খালেক একাধিকবার সুযোগ পেয়েও কখনই বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের চিন্তা করেননি। তার দেশপ্রেমের অসামান্য পরিচয় পাওয়া যায় তার রচিত প্রায় কুড়িটির মতো গ্রন্থ ও পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত অসংখ্য কলামে। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার দিয়ে পুরো পুলিশ বাহিনীকে যেমন গৌরাবান্বিত করেছে তেমনই পরিবারের সদস্য হিসেবে নয়, বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমরাও সেই গৌরবের অংশীদার হয়েছি।

লেখক : পরিচালক, আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্প

rezasalimag@gmail.com