২৩ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জামায়াতে ইসলামী খোলস বদলায়, স্বভাব বদলায় না

  • শাহরিয়ার কবির

(গত শনিবারের চতুরঙ্গ পাতার পর)

শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে জামায়াতবিরোধী গণআন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন ১৯৯৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র শিবিরের ক্যাডাররা ছাত্রাবাসে ঘুমন্ত ছাত্রদের ওপর নৃশংস হামলা চালিয়ে ওয়ার্কার্স পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্র মৈত্রীর নেতা জুবায়ের চৌধুরী রীমুকে হত্যা করলে বিএনপি-জামায়াতের গাঁটছড়া সাময়িকভাবে শিথিল হয়েছিল। কারণ, রীমুর মা ছিলেন বিএনপির জেলা পর্যায়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেত্রী। পরদিন জাতীয় সংসদে সরকারী দল ও বিরোধী দলের সাংসদরা প্রায় একই সুরে জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের কথা বলেছিলেন। ২১ সেপ্টেম্বর (১৯৯৩) দৈনিক সংবাদের প্রতিবেদনে বলা হয়-

‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুমন্ত ছাত্রদের ওপর জামায়াত শিবিরের নৃশংস হামলা ও একজনকে খুন করার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সোমবার সংসদের পূর্ব নির্ধারিত দিনের কার্যসূচী মুলতবি করে বিষয়টির ওপর ৪ ঘণ্টা আলোচনা হয়েছে। সরকারী ও বিরোধী দলের ৩৩ জন সদস্য এতে অংশ নেন এবং প্রায় সবাই ওই ঘটনায় তাদের ঘৃণা প্রকাশ করে দেশে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি জানান। সরকারী দলের একজন সদস্য এ ব্যাপারে বিল আনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রয়োজনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে তিনি ওই বিলে ভোট দেবেন। সরকারী দলের পক্ষে সমাপনী বক্তৃতায় সংসদ উপনেতা অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি বন্ধের ব্যাপারে বলেন, এক্ষেত্রে সংবিধান কি বলে তা দেখতে হবে; তবে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, রগকাটা ও জবাই করার রাজনীতি চলতে দেয়া যায় না। আলোচনার মাঝামাঝি সময়ে রাত সোয়া ১০টায় সামান্য হৈচৈ করে জামায়াতের এমপিরা ওয়াক আউট করেন। তার আগ পর্যন্ত তারা মুখ কালো করে বসেছিলেন। ওয়াক আউট করার সময় তাদের একজন এমপি ‘পরে মজা টের পাবেন’- এ হুমকি দিয়ে গেছেন বলে আওয়ামী লীগের আবদুল আওয়াল মিয়া সংসদে অভিযোগ করেন।

‘সংসদ মুলতবি করে বিষয়টির ওপর আলোচনার জন্য ৩৩ জন বিরোধীদলীয় সদস্য নোটিশ দিয়েছিলেন। আলোচনা শুরুর আগে সংসদ উপনেতা বলেন, সরকারীদলের সদস্যরাও বক্তব্য রাখতে চান। স্পীকার ৬২ বিধিতে আওয়ামী লীগের অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং বিএনপি সদস্যরা যাতে আলোচনায় অংশ নিতে পারেন সেজন্য অন্যান্য সকল বিধি স্থগিত রাখেন। বর্তমান সংসদে বিরোধীদলের মুলতবি প্রস্তাবের ওপর উভয়পক্ষের আলোচনা এই প্রথম। জামায়াত বাদে অন্যান্য সকল দলের সদস্যদের একই ধারার বক্তব্য দেয়ার এই ঘটনা একাদশ ও দ্বাদশ সংশোধনী বিল পাসের পর আর ঘটেনি। সংসদ নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এ আলোচনার সময় অনুপস্থিত ছিলেন।

‘সংসদ উপনেতা বদরুদ্দোজা চৌধুরী সমাপনী বক্তৃতায় বলেছেন, জামাত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব সংবিধানের মাধ্যমে পরীক্ষা করার অবকাশ রয়েছে। জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে সংসদ যে সিদ্ধান্ত নেবে সরকার দৃঢ়ভাবে সে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। সংসদ উপনেতা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশ্য বলেন, আপনাকে ক্ষমাহীন পদক্ষেপ নিতে হবে। যারা মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে, সীমা লংঘন করেছে তাদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়াও এদের পেছনে যারা রয়েছে তাদের মুখোশ খুলে দিতে হবে। তিনি শিক্ষামন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উভয়ের উদ্দেশ্যে বলেন, শিক্ষাঙ্গনগুলোকে সন্ত্রাসমুক্ত করার জন্য যে কোন কঠোরতম পদক্ষেপ নেয়া হলে সংসদ আপনাদের পক্ষে থাকবে। আমরা এই সংসদ সদস্যরা আমাদের সন্তানদের হত্যার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। এর পরে যেন আর কোন মায়ের বুক খালি না হয় এ ধরনেরও কোন ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধ। আমরা ধর্মকে বিকৃত করে ফায়দা লুটার যে কোন অভিপ্রায়ের বিরুদ্ধেও ঐক্যবদ্ধ।

‘তিনি বলেন, যে রাজনীতি হত্যার, রগ কাটার, হাত কাটার, জবাই করার সেটা কি ধরনের রাজনীতি? এটা স্বাধীন দেশের রাজনীতি হতে পারে না। সিদ্ধান্ত নিতে হবে এ রাজনীতি চলতে দেয়া যায় কিনা। তিনি বলেন, এটা অত্যন্ত সত্য কথা যে এটা অসুস্থ ও বিকৃত রাজনীতি। মানসিক বিকৃতরা ছাড়া হত্যার রাজনীতি কেউ করতে পারে না। যারা হত্যা করে উল্লসিত হয় তারা স্বাভাবিক মানুষ নয়, সাইকোপ্যাথ। এই অস্বাভাবিক মানুষরা ভোটার হতে পারে না। যারা ভোটার হতে পারে না তারা রাজনীতি করবে কি করে?

‘তোফায়েল আহমেদ বলেন, শিক্ষা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বপদে থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলও তা চেয়েছে। বিএনপির যেসব এমপি মামুলি কথা বলেছেন তাদের উদ্দেশে তোফায়েল বলেন, নিজের দলের মধ্যে স্বাধীনতাবিরোধী যারা আছে তাদেরকে পদত্যাগে বাধ্য করুন। ১২ অনুচ্ছেদ (ধর্ম নিয়ে রাজনীতি নিষিদ্ধ) সংবিধানের পুনর্বহাল করতেও তিনি তাদের সাহায্য কামনা করেন।

‘আওয়ামী লীগের আবদুর রাজ্জাক বলেন, আজকের দিনটি ঐতিহাসিক। কারণ সরকারী দলও উপলব্ধি করছে অশুভ জামায়াত-শিবির টিকে থাকলে দেশ ধ্বংস হবে। তিনি বলেন, সংসদে যে ৪ দফা চুক্তি হয়েছিল তা বাস্তবায়িত হলে আজকের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না।...

‘বিরোধী দলের চীফ হুইপ মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ঘাতকদের কোন ধর্ম নেই, নীতি নেই, আসুন ওদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হই। তিনি বলেন, মতিন নামের মানুষগুলো বিএনপির রাজনীতিতে কোনদিন বিশ্বস্ত ছিলেন না। আজকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মতিনের নির্লিপ্ততায় তার নিজের দলের ছেলেরা খুন হচ্ছে। এ ঘটনায় শুধু নিন্দা নয়, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। এ অধিবেশনে সম্ভব না হলে আগামী অধিবেশনে এ ব্যাপারে বিল আনতে তিনি সরকারী দলের প্রতি আহ্বান জানান। আপনাদের প্রয়াত নেতা আপোস করতে গিয়ে জীবন দিয়েছেন। এ কথা উল্লেখ করে বিএনপির উদ্দেশে তিনি আপোসের পথ পরিহার করার আহ্বান জানান। তিনি ব্যর্থ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বরখাস্ত করার দাবিও জানান।

‘বিএনপি’র হুইপ অধ্যাপক শাজাহান বলেন, জামায়াত-শিবির সীমা লঙ্ঘন করেছে। তিনি নিজের এলাকার কথা উল্লেখ করে বলেন, ধর্মের নামে এমন কিছু নেই যে ওরা করতে পারে না। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে জামায়াত-শিবিরের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ’৭১-এ ওরা যেভাবে আমাদের মা-বোনদের ধর্ষণ করেছে, সেইভাবে তারা আজ ধর্মকে ধর্ষণ করছে। ইসলাম ধর্মকে তিনি জামায়াতের হাত থেকে রক্ষা করার আবেদন জানান। তিনি বলেন, বিএনপির বন্ধুরা আজ মনের কথা বলেছেন। প্রস্তাব নিয়ে আসুন, ওদের নিষিদ্ধ করুন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীকে বলতে হবে কি ব্যবস্থা নিয়েছেন ঐ মৌলবাদী ধর্মাশ্রয়ীদের বিরুদ্ধে।

চলবে...