১৯ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উগ্র শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ

শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ নতুন কিছু নয়। বিশ্বব্যাপী ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের কারণে শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে এক ধরনের অহংবোধ ও গর্ব তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। উপনিবেশকাল শেষ হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে শিক্ষা, সভ্যতা, সংস্কৃতি ইত্যাদির ক্রমবিকাশ ও ক্রমোন্নতির ফলে সেটা অনেকটাই কমে আসে। তবে এক শ্রেণীর শ্বেতাঙ্গদের মনে ও বাসনায় তা বরাবরই সুপ্ত ছিল। গত কয়েক বছরে ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া জুড়ে জনতুষ্টিবাদ বা লোকরঞ্জনবাদী রাজনীতি ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় উগ্র এবং কোন কোন ক্ষেত্রে জঙ্গী শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার অবকাশ পায়। বছর দুয়েক আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি গ্রহণ করে নির্বাচিত হলে সে দেশে নানা উগ্রগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটে। এর মধ্যে অন্যতম এডরোপা, প্যাট্রিয়ট ফ্রন্ট, এ্যাটমওয়াফেন ডিভিশন, ডেইলি স্টর্মার, ভ্যানগার্ড আমেরিকা, আমেরিকান রেনেসাঁসহ আরও কয়েকটি ছোট-বড় দল ও সংগঠন। উগ্র ডানপন্থী এই দলগুলো শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ ও নব্য নাৎসিবাদের সমর্থক। তারা বর্ণবাদী, এ্যান্টি সেমেটিক তথা ইহুদী বিদ্বেসী, সর্বোপরি মুসলিম ও অভিভাসনবিরোধী। গত ৫ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা এ্যান্টি ডিফেমেশন লিগ (এডিএল) নামের একটি সংগঠনের জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে উগ্র শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীদের উস্কানিতে ১ হাজার ১৮৭টি হিংসা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ২০১৭ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪২১টি। অর্থাৎ, এক বছরে বেড়েছে ১৮২ ভাগ। ২০১৮ সালে একটি সমাবেশের আয়োজন করে উগ্র জাতীয়তাবাদীরা, যার মাধ্যমে মুসলিম ও ইহুদী বিদ্বেষ ছড়ায়। তারা শুধু মসজিদ নয়, ইহুদীদের উপাসনালয় সিনাগগেও হামলা চালিয়ে থাকে।

জাতীয়তাবাদ, সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ বিশেষজ্ঞদের মতে, এরই বহির্প্রকাশ ঘটেছে নরওয়ে, সুইডেন, কানাডার কুইবেক, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি ও অন্যত্র। এর সর্বশেষ উদাহরণ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদ ঘিরে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা। যেখানে প্রায় অর্ধশত মুসলিমের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। উল্লেখ্য, এই ঘটনার প্রধান সন্দেহভাজন ব্রেন্টন টেরান্টকে হাতকড়া পরা অবস্থায় যখন রিমান্ডের জন্য আদালতে হাজির করা হয়, তখন তার মুখে ছিল হাসি এবং হাতের আঙ্গুলের ইশারায় শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের প্রতীক। হামলার আগে সে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর কাছে ৭০ পৃষ্ঠার একটি ইশতেহারও পাঠিয়েছিল। যাতে তার শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী ষড়যন্ত্রসহ চিন্তা ও জিঘাংসার প্রতিফলন ঘটে। এ থেকেই সম্যক বোঝা যায় যে, উগ্র শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ তাকে কতটা ঠা-া মাথার খুনীতে রূপান্তরিত করেছে। এমনকি সে উক্ত ইশতেহারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পেরও প্রশংসা করেছে। টেরান্টের গাড়িতে সার্বিয়ার জাতীয়তাবাদী রণসঙ্গীত বাজার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তদুপরি সে ছিল বসনিয়ার সার্ব নেতা কসাই বলে কুখ্যাত রাদোভান কারাদজিচের পাঁড় ভক্ত। সুতরাং টেরান্টের সন্ত্রাসী তথা খুনী না হয়ে উপায় কি?

বিশ্বখ্যাত জিনবিজ্ঞানী নোবেল জয়ী জেমস ওয়াটসন কিছুদিন আগে জিনগতভাবে শ্বেতাঙ্গরা আফ্রিকানদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে রীতিমতো হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলেন। তাঁর এই বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যাত হয় এবং বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীরাই তা প্রত্যাখ্যান করেন। পৃথিবীতে কোন জাতি বা ধর্ম শ্রেষ্ঠ এই বিতর্ক অর্বাচীন ও অর্থহীন। সব ধর্ম ও জাতিতেই ভাল-মন্দ আছে। শিক্ষা-সভ্যতা ও সংস্কৃতি একটি দেশ, জাতি ও ধর্মকে বুদ্ধিদীপ্ত ও শাণিত করে ক্রমশ। সেই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ ও নব্য নাৎসিবাদ ক্রমান্বয়ে বিশ্বের বহুত্ববাদের সংস্কৃতির জন্য রীতিমতো হুমকি হয়ে দেখা দিচ্ছে। অতএব সময় থাকতে সাবধান। বৈশ্বিক নেতাদের এ বিষয়ে সতর্ক ও সচেতন হওয়ার সময় সম্মুখীন।