২০ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গণহত্যা ১৯৭১ ॥ হরিণাগোপাল-বাগবাটী

  • আরিফ রহমান

দিনটি ছিল মঙ্গলবার। হানাদার বাহিনী তাদের স্থানীয় দোসরদের সহযোগিতায় আনুমানিক ভোর পাঁচটায় বাগবাটী গ্রাম ঘেরাও করে। গাড়ির শব্দে পাহারারত যুবকরা গ্রামবাসীদের সতর্ক করার আগেই এক শ’ পাকসেনা গ্রামে ঢুকে পড়ে তিন ভাগে অভিযান চালায়। একটি গ্রুপ হত্যা চালায়, একটি গ্রুপ ধর্ষণ করে, আরেকটি গ্রুপ পুরো গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

স্থানীয় রাজাকাররা পাকিস্তানীদের বাড়ি চিনিয়ে নিয়ে যায়। আকস্মিক হামলায় ঘুমন্ত মানুষ দিশেহারা হয়ে এদিক সেদিক ছোটাছুটি শুরু করে দেয়। পাকিরা যাকে চোখের সামনে পেয়েছে, তাকেই গুলি করে হত্যা করেছে। বিশেষ করে যুবক ও পুরুষদের। পালানোর সময় যারা গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েছিল তাদের আত্মীয়-স্বজনরাও দাঁড়াতে পারেনি স্বজনের পাশে।

সেদিন পাকিরা আট-দশজন নারীকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের শিকার অধিকাংশ নারি ছিলেন হিন্দু যুবতী এবং সদ্য বিবাহিতা। তাদের পিতা ও স্বামীর সামনেই হত্যা করা হয়। সেদিনের এক প্রত্যক্ষদর্শী রানী দত্ত বলেন, ভোরবেলা তিনি দেখতে পান মিলিটারি এসেছে। লোকজন ছুটছে। পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। গরু-বাছুর সব নিয়ে গিয়েছে। মিলিটারিরা তাঁর স্বামী, ভাসুর, ননদের জামাইসহ আরও অনেক নিকটাত্মীয়কে হত্যা করেছিল। সেই পরিবারগুলোর সবকিছু এক মুহূর্তের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। তাদের সেই দুঃখ, কষ্ট, বেদনা আজও লাঘব হয়নি।

পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী সেদিন ভোররাত থেকে প্রায় সকাল নয়-দশটা পর্যন্ত হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায়। সিরাজগঞ্জ শহর থেকে সুইপাররা এসে আশ্রয় নিয়েছিল হরিণা বাগবাটী উচ্চ বিদ্যালয়ে। সুইপাররা লাশগুলো একসঙ্গে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে গিয়ে কবর দেয়। এছাড়া অনেক লাশ কুয়ার মধ্যে ফেলে দেয়া হয়। সেসব লাশের পচা দুর্গন্ধ অনেকদিন পর্যন্ত দূর থেকে পাওয়া যেত।

যেই সুইপাররা লাশ মাটিচাপা দিত, তাদেরও মুক্তি ছিল না। সুইপারদেরও গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করা হতো। আমাদের জরিপ অনুসারে সেদিন সেখানে দুই শ’র অধিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। তাঁদের মাঝে কয়েকজনের নাম পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। অধিকাংশ শহীদের লাশ শনাক্ত না হওয়ার কারণ তাঁরা দূর-দুরান্তের গ্রাম থেকে এখানে এসেছিলেন জীবন বাঁচাতে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তাঁরা সবাই নিহত হন।

হরিণাগোপাল ও বাগবাটী গ্রামে বলরাম নবদাসের বাঁশঝাড় এবং ক্ষুদিরাম রায়ের কুয়ায় এলাকাজুড়ে রয়েছে একাত্তরের বধ্যভূমি। এছাড়া উত্তর আলোকদিয়া শ্মশানেও রয়েছে বধ্যভূমি। এ সকল বধ্যভূমি এখন ঝোপঝাড়ে আবৃত। প্রাণের ভয়ে সেই এলাকার গ্রামবাসী যে যার মতো পালিয়ে যান দূর-দূরান্তের গ্রামে বা আশপাশের ঝোপঝাড়ে। পরদিন বিকেলে অনেকে গ্রামে ফেরেন।

ফিরে এসে এই নারকীয় বীভৎসতা দেখে অনেকেই গ্রাম ছেড়ে পথচলা শুরু করেন শরণার্থী শিবিরের দিকে। অনেকে পাড়ি জমান দূরের কোন আত্মীয়ের বাড়িতে। অনেক তরুণ যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে।

হরিণাগোপাল-বাগবাটী গণহত্যা নিয়ে ‘গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট’-এর পক্ষ থেকে একটি গণহত্যা নির্ঘণ্ট গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। দীর্ঘ গবেষণার পর এই গ্রন্থটি লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের এমফিল গবেষক সুস্মিতা দাস। তিনি নিয়মিত লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত আছেন।

লেখক : গবেষণা কর্মকর্তা, গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র, খুলনা