১৯ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পাহাড়ে রক্তগঙ্গা ॥ সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারসহ নিহত ৬, গুলিবিদ্ধ ১৫

পাহাড়ে রক্তগঙ্গা ॥ সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারসহ নিহত ৬, গুলিবিদ্ধ ১৫
  • রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়িতে দুর্বৃত্তদের ব্রাশফায়ার;###;সাজেকের ভোটকেন্দ্র থেকে ফেরার পথে হামলা

চট্টগ্রাম অফিস/নিজস্ব সংবাদদাতা, রাঙ্গামাটি ॥ রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়িতে পাহাড়ী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে নিহত হয়েছেন ৬ জন। এদের মধ্যে এক সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার, এক গাড়ির হেলপার ও চার আনসার-ভিডিপি সদস্য। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আরও ১৫। এ ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে। নির্ধারিত সময়সূচী অনুযায়ী ভোট গ্রহণ শেষে সাজেক থেকে ফেরার পথে সন্ধ্যা আনুমানিক ছয়টায় খাগড়াছড়ি-বাঘাইছড়ি সড়কের ৯ কিলোমিটার নামকস্থানে ব্রাশফায়ারে হত্যার এ ঘটনা ঘটে। প্রাপ্ত তাৎক্ষণিক সংবাদে জানা গেছে, পাহাড়ী সংগঠন ইউপিডিএফের (ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট) সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। নিহত সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারের নাম আমির আলী। তিনি এলাকার কাচালং গার্লস হাইস্কুলের শিক্ষক। ব্রাশফায়ারে ঘটনাস্থলে চারজন এবং বাকি দুজন বাঘাইছড়ি হাসপাতালে নেয়ারপথে প্রাণ হারায় বলে প্রশাসন সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া গুলিবিদ্ধ আহতদের কারও নাম তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। এদের বাঘাইছড়ি-খাগড়াছড়ির বিভিন্ন হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়।

এদিকে, খবর পেয়ে সেনাবাহিনীর বাঘাইছড়ি জোনের একটি পেট্রোল, পুলিশ, বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে তল্লাশি কাজে অংশ নিয়েছেন। স্থানীয় ও প্রশাসনের বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, রাঙ্গামাটি জেলার ১০টি উপজেলায় সোমবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এসব উপজেলা হচ্ছে- রাঙ্গামাটি সদর, কাউখালী, নানিয়ারচর, বাঘাইছড়ি, লংগদু, বিলাইছড়ি, বরকল, কাপ্তাই, রাজস্থলী ও ঝুরাছড়ি। বাঘাইছড়ি ছাড়া অন্যান্য উপজেলায় শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে। বাঘাইছড়িতে ভোটগ্রহণ শেষে এসব নির্বাচনী কর্মকর্তা দুটি জীপযোগে বাঘাইছড়ি সদরে ফিরছিলেন। এসব কর্মকর্তা বাঘাইছড়ির সাজেকের কংলাক ও মাচালং ভোট কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করে নির্বাচনী সামগ্রী নিয়ে ফেরারপথে ব্রাশফায়ারের শিকার হন। ৯ কিলোমিটার নামকস্থানে দুটি জীপ পৌঁছার পর ওঁৎ পেতে থাকা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা ব্রাশফায়ার চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারসহ ৪ জন প্রাণ হারায়। বাকি ২ জন হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যায়। নিহতদের মধ্যে যাদের নাম নিশ্চিত করা গেছে তারা হলেন, গাড়ির হেলপার মন্টু চাকমা, ৪ আনসার ভিডিপির সদস্য হলেন- মোঃ আল আমিন, জাহানারা, বিলকিস ও মিহির কান্তি দেব। গুরুতর আহতদের মধ্যে যাদের নাম জানা গেছে তারা হলেন- স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা বদিউল আলম, প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক কাঞ্চন দে ও সোহেল চাকমাসহ গুলিবিদ্ধ আহত ১১ জনকে রাতেই চট্টগ্রাম সিএমএইচে হেলিকপ্টারযোগে পাঠানো হয়েছে। এদের মধ্যে পাঁচ পুলিশ, ৩ আনসার ও ৩ জন বেসামরিক সদস্য। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের কোন প্রার্থী ছিলেন না। সকালে ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার পর ইউপিডিএফ সমর্থিত বিভিন্ন পদের প্রার্থী ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। সকালে দেয়া হয় বাঘাইছড়ি সদরে এবং দুপুরে দেয়া হয় নানিয়ারচর ও কাউখালী। নির্বাচন শুরু হওয়ার আগে রাত থেকে সকাল পর্যন্ত ব্যালট বাক্সে ব্যালট ভরা এবং ভোট কেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়াসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ এনে বাঘাইছড়ি সদর, নানিয়ারচর ও কাউখালী উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয় বিভিন্ন প্রার্থী। বাঘাইছড়ি উপজেলার চেয়ারম্যান পদে বর্তমান চেয়ারম্যান জনসংহতি সমর্থিত বড়ঋষি চাকমার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন সাবেক চেয়ারম্যান জেএসএস সংস্কারের সুদর্শন চাকমা। বড়ঋষি চাকমা জনসংহতি সমিতির সন্তু গ্রুপের নেতা। আর সুদর্শন জনসংহতি সমিতি লারমা গ্রুপের কেন্দ্রীয় ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক। বড়ঋষি চাকমার অভিযোগ, তার প্রতিপক্ষ বিপুলসংখ্যক সন্ত্রাসী ও বহিরাগত নিয়ে ভোট কেন্দ্র দখল করে নেয়ায় তিনি ভোট বর্জন করেছেন।

কাউখালীতে চেয়ারম্যান পদে জনসংহতি সমিতি সমর্থিত অর্জুন মনি চাকমার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন নৌকা প্রতীকের সামসুদ্দোহা চৌধুরী। জনসংহতি সমিতি অর্জুন ভোট জালিয়াতি ও অনিয়মের অভিযোগ এনে দুপুরে নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দেন।

নানিয়ারচরে জনসংহতি সমিতি লারমা গ্রুপ সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী রূপম দেওয়ান এবং একই পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী জ্যোন্তিনা চাকমা ও পঞ্চানন চাকমা সকাল ১১টার দিকে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। এদের সকলের অভিযোগ, ভোট গ্রহণের আগেই জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যালট বাক্সে ব্যালট ভর্তি করা হয়েছে। বাঘাইছড়ির এ ঘটনার পর এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এলাকার লোকজন বিভিন্ন পয়েন্টে জড়ো হয়ে রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত অবস্থান করছিল। তবে সেনা, বিজিবি ও আনসার-ভিডিপির অতিরিক্ত সদস্য পৌঁছার পর জনমনে কিছুটা স্বস্তি এসেছে বলে সর্বশেষ খবরে জানা গেছে। এছাড়া, এ ঘটনার পর রাঙ্গামাটির দশ উপজেলা জুড়ে যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে, সে ব্যাপারে প্রশাসন প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করছে বলে জানানো হয়েছে।

এদিকে, মর্মন্তুদ এই ঘটনায় রাঙ্গামাটির সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদার এক বিবৃতিতে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং ঘটনার জন্য দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।