২১ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে কর্ণফুলী ড্রেজিংয়ে যুক্ত হলো শক্তিশালী ড্রেজার

  • ট্রায়াল সম্পন্ন ॥ জুন নাগাদ মূল কাজ শেষ করার টার্গেট কর্তৃপক্ষের

হাসান নাসির, চট্টগ্রাম অফিস ॥ চীন থেকে আসা বড় ও শক্তিশালী ড্রেজার যুক্ত হয়েছে কর্ণফুলী নদীর ড্রেজিং কাজে। ফলে বাড়ছে খনন কাজের গতি। ২৪২ কোটি টাকার এই প্রকল্পের কাজের প্রায় ২৮ শতাংশের কাজ শেষ হয়েছে। আগামী জুন মাস নাগাদ মূল খননের কাজ শেষ করার টার্গেট নিয়ে এগোচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। নদীর নাব্য বৃদ্ধি ও নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে প্রায় আড়াই কিলোমিটারজুড়ে পরিচালিত হচ্ছে ড্রেজিং কাজ। প্রকল্পের আওতায় একইসঙ্গে হবে তীর সংরক্ষণ ও জেটি নির্মাণের কাজও।

চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা যায়, সোমবার ড্রেজিং প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে চীন থেকে আসা বড় ড্রেজার। আগের দিন রবিবার ড্রেজারটির ট্রায়াল কাজ সম্পন্ন হয়। ‘সদরঘাট-বাকলিয়ার চর ড্রেজিং’ প্রকল্প নামে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ ও ২৫০ মিটার চওড়া এলাকায় এ খনন কাজ পরিচালনা করছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। কর্ণফুলী নদীর এই অংশ থেকে উত্তোলন করা হবে ৪২ লাখ ঘনমিটার মাটি ও বালি, যা দিয়ে ভরাট হবে হামিদচর এলাকা।

বন্দরের হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ সূত্রে জানানো হয়, যে পরিকল্পনা অনুযায়ী এতদিনে অন্তত ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও শেষ হয়েছে প্রায় ২৮ শতাংশ। এর কারণ যে তিনটি ড্রেজারে কাজ চলছিল, সেগুলো আকারে ছোট। কর্ণফুলী নদীর তলদেশে সৃষ্টি হয়েছে পলিথিন ও গৃহস্থালি আবর্জনার ৪ থেকে ৫ ইঞ্চি পুরু স্তর, যা ২০ ইঞ্চি ড্রেজার দিয়ে অপসারণ করা সম্ভব হচ্ছিল না। খনন কাজ পরিচালনার জন্য তাই প্রয়োজন হয় আরও বড় ড্রেজার। চীন থেকে আনা হয়েছে ৩১ ইঞ্চি সাইজের বড় ড্রেজার। গত ৪ মার্চ ড্রেজারটি কর্ণফুলী নদীতে নামে। ইতোমধ্যেই এর ট্রায়াল কাজ ভালভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চীফ হাইড্রোগ্রাফার ও ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পের পরিচালক কমান্ডার আরিফুর রহমান সোমবার জনকণ্ঠকে জানান, ড্রেজারের ট্রায়াল কাজ শেষ হওয়ার পর মাটি উত্তোলনের পাইপ স্থাপনের কাজ চলছে। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে আমরা বড় ড্রেজারের আউটপুট পাব। এতে করে ড্রেজিং কাজে গতি সঞ্চার হবে। তিনি জানান, ছোট ড্রেজারগুলো দিয়ে কার্যক্রম বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছিল কর্ণফুলীতে জমে যাওয়া পলিথিন ও আবর্জনার স্তূপের কারণে। এক ঘণ্টা খনন কাজ চালালে দুই ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হয়। কারণ ড্রেজারের দাঁতে আটকা পড়ে প্রচুর পরিমাণ পলিথিন, যা বার বার কাজকে থমকে দিচ্ছিল।

ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই সময়ের মধ্যে ৫০ শতাংশ কাজ শেষ করার আশা করা হয়েছিল। কিন্তু বিদেশ থেকে অত্যাধুনিক ড্রেজার আনার বিষয়টি পিছিয়ে যাওয়ায় তা হয়নি। ড্রেজিং শেষ হওয়ার পর প্রকল্পের আওতায় আরও তিন বছর চলবে নদীর রক্ষণাবেক্ষণ কাজ। এই সময়ের মধ্যে নতুন করে পলি এসে যেন ভরাট না হয়, তা দেখার দায়িত্বটিও প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর গুরুত্ব দেশের অর্থনীতিতে সর্বাধিক। কেননা, এই নদীতেই রয়েছে দেশের প্রধান বন্দর, যার মধ্যে দিয়ে মোট আমদানি-রফতানির বাণিজ্যের অন্তত ৯০ শতাংশ পরিচালিত হয়ে থাকে। দেশের আমদানি-রফতানি বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে নতুন নতুন টার্মিনাল নির্মাণের মাধ্যমে এর সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিদ্যমান সুযোগ সুবিধার উন্নয়নে জোর দিয়েছে সরকার। কেননা, দেশের শিল্প, ব্যবসা বাণিজ্য ও নতুন শিল্পায়নের বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা যায়, সর্বপ্রথম ক্যাপিটাল ড্রেজিং হয়েছিল ৮০’র দশকে। নেদারল্যান্ডের একটি কোম্পানি সে কাজ সম্পন্ন করে। এর প্রায় ১০ বছর পর ১৯৯০ সালে দ্বিতীয়বার ড্রেজিং হয়। এ প্রকল্পের কাজ করেছিল চায়না হারবার কোম্পানি। তারপর দীর্ঘ সময় কর্ণফুলীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং হয়নি। পাহাড় থেকে আসা পলিতে সদরঘাট থেকে বাকলিয়া এলাকায় ছোট ছোট চরের মতো সৃষ্টি হয়। জাহাজ চলাচলে প্রয়োজনীয় নাব্য রক্ষায় বন্দর কর্তৃপক্ষ কয়েক দফায় ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নিলেও তা থমকে যায় নানা সমস্যায়।

কর্ণফুলীর নাব্য রক্ষা ও নেভিগেশন নিশ্চিত করতে ২০১২ সালের জুলাই মাসে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের একটি প্রস্তাব পেশ করেছিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। সে প্রস্তাব ফাইলেই থেকে যায় অনেক বছর। ২০০৮ সালে ড্রেজিংয়ে উদ্যোগ নিয়ে ঠিকাদার নিয়োগের দরপত্র আহ্বান করা হয়। প্রকল্পের নাম হয় ‘ ক্যাপিটাল ড্রেজিং এ্যান্ড ব্যাংক প্রোটেকশন’। সর্বনি¤œ দরদাতা হিসেবে ২২৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকায় ড্রেজিংয়ের কাজ পায় ‘মালয়েশিয়া মেরিটাইম এ্যান্ড ড্রেজিং কর্পোরেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি এই কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়। প্রকল্পে ড্রেজিং ছাড়াও ২ হাজার ৬১৫ মিটার দৈর্ঘের তীর নির্মাণ, সদরঘাট এলাকায় ৪শ মিটার লাইটারেজ জেটি নির্মাণ ও মেরিন ড্রাইভ তৈরির কথা ছিল।

চট্টগ্রামব বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী ৬শ’ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু বিদেশী প্রতিষ্ঠানটি নিজে কাজ না করে ‘প্যাসিফিক মেরিন সার্ভিসেস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে স্থানীয় এজেন্ট নিয়োগ করে। কাজ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আসতে থাকে গুরুতর অনেক অভিযোগ। অভিযোগগুলোর মধ্যে উত্তোলিত মাটি বিক্রি, সিরামিক ইট নির্মাণ, শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ না করা উল্লেখযোগ্য। শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ এই প্রতিষ্ঠান ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে যন্ত্রপাতিসহ অনেক সরঞ্জাম ফেলে রেখে সটকে পড়ে। দফায় দফায় চিঠি দিয়েও এই প্রতিষ্ঠানের কোন সাড়া না পেয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই চুক্তি বাতিল করতে বাধ্য হয়। এরপর প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানটি আদালতে গেলে পুরো ক্যাপিটাল ড্রেজিং কাজই আইনী জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার আবর্তে পড়ে যায়। কিন্তু বন্দরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এই কাজটি যে কোনভাবে শেষ করার গুরুত্ব অনুভব করে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

নানা জটিলতায় দফায় দফায় থেমে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ অবশেষে শুরু করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা বাংলাদেশ নৌবাহিনী। তবে আদালতে মামলা থাকায় প্রকল্পটির নাম পরিবর্তন করতে হয়। ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের পরিবর্তে প্রকল্পটি ‘সদরঘাট টু বাকলিয়া চর ড্রেজিং’ হিসেবে নামকরণ হয়। তবে এবার যে ধারাবাহিকতায় এগিয়ে চলেছে তাতে করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে বলে আশা করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।