১৯ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সড়কেই বাস পার্কিং

সড়কেই বাস পার্কিং
  • এ নগর আপনার

রাজন ভট্টাচার্য ॥ এমনিতেই সড়কে বাস ও চালকদের নিয়ে বদনামের শেষ নেই। ইচ্ছেমতো চালানো, গাড়ির ছাল বাকল না থাকা, বাড়তি ভাড়া আদায়, চালকের লাইসেন্স না থাকা, রেষারেষিসহ হাজারো কথা। আলোচনা। সমালোচনা। তবুও বদনামের ঘর একটুও ছোট হয়নি। বরং বাড়ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সড়কে ইচ্ছেমতো বাস পার্কিং করে রাখার ঘটনা। এতে নগরীতে যানজট যেমন হয়, তেমনি চলাচলে সৃষ্টি হয় প্রতিবন্ধকতা। নগরীর সৌন্দর্যও নষ্ট হয়। অথচ কোন পরিবহন কোম্পানির অনুমোদনের অন্যতম শর্ত হলো নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি- বিআরটিএ বলছে, কাগজপত্রে ঢাকাসহ দেশের সকল বাস কোম্পানির নিজস্ব পার্কিং জোনের কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান নিজস্ব পার্কিং প্লেস ব্যবহার না করায় জনদুর্ভোগ হয়। আইনের দৃষ্টিকোণ থেকেও তা বৈধ নয়।

গোটা পরিবহন সেক্টরের নৈরাজ্য বন্ধে যখন দেশব্যাপী সবাই সোচ্চার ঠিক তখনও জ্বলন্ত উনুনে ঘি ঢালা হয়েছে মঙ্গলবার সকালে। রাজধানী ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্কসংলগ্ন প্রগতি সরণিতে বাসের চাপায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী। আবরার নিয়ম মেনেই পথচারী পারাপারের জন্য নির্ধারিত স্থান জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও আবরারের বন্ধুরা বলছেন, দুই বাসের অশুভ প্রতিযোগিতার বলি হতে হয় বেসরকারী বিশ^বিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থীকে। তিনি দুটি বাসের মাঝখানে পড়ে যান। পরে সুপ্রভাত বাসের নিচে চাপা পড়েন। আবরার নিয়ম মেনে নির্ধারিত জায়গা দিয়ে রাস্তা পার হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিলেন। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীরা যমুনা ফিউচার পার্কের সামনের সড়ক অবরোধ করে রাখেন। সেখানে উপস্থিত হয়ে ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম ঘোষণা দিয়েছেন, সুপ্রভাত পরিবহনের কোন গাড়ি আর ঢাকায় চলতে পারবে না। এই কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল করতেও পরিবহন নিয়ন্ত্রণ সংস্থা- বিআরটিএ কে আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা দেয়ার কথাও জানান তিনি। দুই বাসের পাল্লা পাল্লিতে এর আগে রাজধানীতে আরও শিক্ষার্থী নিহত হয়। যার প্রেক্ষিতে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার দাবি নিয়ে দেশব্যাপী ব্যাপক আন্দোলন হয়েছে। যদিও এর খুব একটা সুফল মেলেনি।

যাত্রী নিয়ে চলার সময় চালকরা যেমন বিশৃঙ্খল ও বেপরোয়া, তেমনি কাজ শেষেও রাস্তার ওপর গাড়ি রেখে যাওয়ায় মানুষের ভোগান্তি পোহাতে হয়। আবার কিছু কিছু পরিবহন কোম্পানি ইচ্ছাকৃতভাবেই রাত দিন জনভোগান্তি তৈরি করে রাখে। যদিও সিটি কর্পোরেশন থেকে বলা হচ্ছে, অনুমোদন না নিয়ে রাস্তা দখল আইনসিদ্ধ নয়। এজন্য সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।

রাজধানীর বনানী রেল স্টেশনের সামনের ব্যস্ততম সড়কে ঢাকার চাকা বাসগুলো এক লেন দখল করে দাঁড় করিয়ে রাখার দৃশ্য নিয়মিত। এর বিপরীত সড়কেও আরেকটি বেসরকারী কোম্পানির বাস সব সময় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ক্যান্টনমেন্টগামী একটি পরিবহন কোম্পানি বনানী এলাকায় সারিবদ্ধভাবে বাস রাখে। যাত্রী হওয়া সাপেক্ষে সেসব বাস ছেড়ে যায়।

কমলাপুর রেল স্টেশনের পাশ থেকে পীরজঙ্গি মাজার পর্যন্ত সড়কের দু’পাশে দীর্ঘ বাসের সারি। এরমধ্যে ৬ নম্বর পরিবহনের বাসই বেশি। আরও কিছু স্টাফ বাস রয়েছে। যেগুলো সকালে মতিঝিলের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যাত্রী নামিয়ে এই সড়কে পার্কিং করে। এছাড়া রয়েল ও তিশাসহ ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লাগামী বেশ কয়েকটি পরিবহন কোম্পানি রাস্তার ওপর বাস রাখে এই এলাকায়। রয়েছে বেশ কয়েকটি পরিবহন কাউন্টার। যারা রাস্তার ওপর বাস রেখে টিকেট বিক্রি শুরু করে। এর একটু সামনে গেলে কমলাপুর স্টেডিয়ামের পাশে স্টার লাইন পরিবহনের গাড়ি রাস্তায় রাখতে দেখা গেছে। সাদেক হোসেন খোকা কমিউনিটি সেন্টারের আশপাশের সবকটি রাস্তায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠার বাস পার্কিং করে রাখা হয় দিনভর।

সন্ধ্যার পর যারা মালিবাগ রেলগেট হয়ে বিশ^রোড দিয়ে সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী যাতায়াত করেন তারা নিশ্চয়ই দেখেছেন এই সড়কে বিভিন্ন বাস কোম্পানির অবৈধ পার্কিং করার দৃশ্য। সমস্যার শুরু মালিবাগ রেলগেট থেকে। রেলগেট সংলগ্ন সোহাগ পরিবহনের কাউন্টারের সামনে আন্তঃজেলা রুটের বাস দাঁড় করিয়ে নিয়মিত যাত্রী তোলা হয়। সরিয়ে দেয়া হয় অন্যান্য পরিবহন। এর একটু সামনে সোহাগের পার্কিং জোন। জায়গা না হওয়ায় এই পরিবহন কোম্পানির অন্তত ২০টি বাস দিয়ে অর্ধেক রাস্তা বন্ধ করে রাখা হয় প্রায় সব সময়ই। এ ব্যাপারে টার্মিনালের তত্ত্বাবধায়ক পরিচয় দেয়া আমিনুল নামের এক ব্যক্তি জানান, বাস বেশি। জায়গা কম। তাই অল্প সময়ের জন্য মাঝে মাঝে দু’একটি বাস রাস্তায় থাকে। কিন্তু জনদুর্ভোগের বিষয়ে তারা সব সময় সচেতন বলেও জানান। তার সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল তখন ২০টির বেশি বাস ছিল এই সড়কে।

মালিবাগ রেল গেট এলাকায় দায়িত্ব পালন করা ট্রাফিক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ক্ষমতাধর কোম্পানির পরিবহন। তাই জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করলেও আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারি না। কিছু বলতেও পারি না। বলতে গেলে উল্টো আমাদের ধমক খেতে হয়। তিনি বলেন, একটু সামনে গেলেই দেখবেন প্রতিটি ক্রসিংয়ে ট্রাফিক পুলিশ তৎপর। সড়কে পরিবহন নৈরাজ্য হলে রেকার লাগানো হচ্ছে। আদায় করা হচ্ছে জরিমানা।

মালিবাগ কমিউনিটি সেন্টারের রাস্তা ছাড়ালেই মিডলাইন আর বাহন পরিবহনের বাস খিলগাঁও উড়াল সড়ক পর্যন্ত। প্রতিদিন এই সড়কে দুই সারি করে বাস পার্কিং করে রাখা হয়। জানতে চাইলে বাহন পরিবহনের চালক মমিন জানান, কোম্পানির নির্দেশ অনুযায়ী আমরা গাড়ি রাখি। এক্ষেত্রে নিজেদের কোন মতামত নেই। তিনি বলেন, মানুষের দুর্ভোগ হলেও আমাদের করণীয় কিছু নেই। কারণ মালিকের নির্দেশ। তাই আমাদের পুলিশও কিছু বলে না। মিডলাইন পরিবহনের চালক আক্কাস বলেন, দিনভর চালানোর পর কিছু বাস মোহাম্মপুর ও এই এলাকায় রাখা হয়। এই এলাকার বাসগুলো সকাল থেকে পর্যায়ক্রমে ছেড়ে যায়। তিনি জানান, রাস্তা দখল করে রাখা ঠিক নয়। কিন্তু আমাদের কেউ কিছু বলে না।

খিলগাঁও কমিউনিটি সেন্টারের বিপরীত সড়কে মঙ্গলবার দেখা গেছে নূর এ মক্কা পরিবহনের অন্তত ৫০টি বাস দুই লেন জুড়ে রাখা হয়েছে। সৌদিয়াসহ আন্তঃজেলা রুটের আরও কিছু বাস দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। টিটিপাড়া মোড় থেকে সায়েদাবাদ হয়ে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত রাস্তার উভয় পাশ জুড়েই বাস পার্কিং করে রাখাই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রাম, সিলেট, পূর্বাঞ্চল, কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন গন্তব্যে এসব বাস ছেড়ে যায়।

রাতে সাতরাস্তা থেকে মহাখালী রেলগেট পর্যন্ত যানজট ও জনভোগান্তি বাড়ে শুধুমাত্র আন্তঃজেলা রুটের বাস রাস্তায় রাখার কারণে। শুধু তাই নয় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার বিভিন্ন রুটেও রাখা হয় বাস। এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে যেমন অসন্তোষ রয়েছে তেমনি পথচারীসহ যাত্রীদের অভিযোগের শেষ নেই। দিনের বেলাতেও মহাখালী বাস টার্মিনালের সামনের সড়কে এলোপাতাড়ি করে বাস রাখতে দেখা যায়।

কাকরাইল, নয়া পল্টন, ফকিরাপুল যেন বাস রাখার অঘোষিত টার্মিনাল। তবে সন্ধ্যার পর এ দৃশ্য একেবারেই জমে ওঠে। বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানির বাস একের পর এক আসতে দেখা যায়। আরামবাগেও সিটি সার্ভিসগুলোর বাস রাখার অভিযোগ রয়েছে। গোটা গুলিস্তানের সড়ক তো অনেক আগে থেকেই টার্মিনাল। ফুলবাড়িয়ায় একটি বাস টার্মিনাল থাকলেও তা ব্যবহার করে বিআরটিসি বাস। বেসরকারী বাসের বাড়ি তো সিটি করপোরেশনের রাস্তা। গুলিস্তান এলাকার ব্যবসায়ীদের বক্তব্য হলো, এই এলাকায় যানজটের ভোগান্তির মূল কারণ বাস দিয়ে রাস্তা দখল করে রাখা। বেশ কয়েকবার ভাসমান টার্মিনাল বন্ধের উদ্যোগ নেয়া হলেও তা বেশিদিন তা স্থায়ী হয় না।

অনেকে মজা করে বলেন, সন্ধ্যা হওয়া মানেই মানুষের ঘরে ফেরা। নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা। মহাকাল ধরে এর ধারাবাহিকতা চলে আসছে। এখনও গ্রামের সংস্কৃতিতে এই ধারা রয়েছে। যদি বলা হয়, বাসের বাড়ি কই। তবে জবাব হলো রাস্তা। কারণ ঢাকার বাসগুলো রাতে রাস্তাতেই থাকে। বাস রাখার জন্য নিরাপদ স্থান হিসেবে মানুষের জন্য নির্মাণ করা সড়ককেই চূড়ান্ত করা হয়েছে!

মীরপুর, ফার্মগেট, বনানী, গাবতলী, টেকনিক্যাল, ১০ নম্বর, এক নম্বর, ধানম-ি, গুলশান, বাড্ডা, নতুন বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার ওপর বাস রাখার কারণে নগরবাসীর অশান্তির কোন শেষ নেই। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যা বলেন, আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি এসব অবৈধ বাস পার্কিং বন্ধ করার জন্য। গোটা পরিবহন সেক্টর এখন সংস্কারের মধ্যে আছে। ধারাবাহিকভাবে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। সঙ্কট অনেক। তাই রাতারাতি সব সমাধান হবে না। আস্তে আস্তে নগরবাসী সুফল পাবেন।