২২ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লাহোর থেকে ক্রাইস্টচার্চ

  • সন্ত্রাসী হামলায় বাতিল যত ক্রিকেট সিরিজ;###;মোঃ রাশেদুল হক

২০০৯ সালে লাহোরে শ্রীলঙ্কান টিম বাস লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল বন্দুকধারীরা। সেখানে সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যবস্তু ছিল সরাসরি ক্রিকেটাররা। ওই ঘটনার পর বিদেশী দলগুলোর পাকিস্তান সফর বন্ধ হয়ে যায়। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে হামলায় সরাসরি বাংলাদেশী ক্রিকেটাররা হয়ত টার্গেট ছিলেন না। তবে ঘটনা গা শিউরে ওঠার মতো। দলের বেশিরভাগ সদস্য জুমার নামাজ পড়তে সেখানেই যাচ্ছিলেন। মসজিদে পৌঁছাতে মাত্র ৪-৫ মিনিট দেরি হওয়ায় বেঁচে যান তামিম ইকবাল- মেহেদী হাসান মিরাজরা। নইলে নিশ্চিত ৫০ জনের মৃত্যু তালিকা আরও দীর্ঘ হতো। তামিমের মতো ব্যবধানটা ছিল আসলে ৩০ সেকেন্ডের। ভাবুন কী অবস্থা হতো। প্রত্যক্ষ আক্রান্ত না হয়েও এটি তাই ক্রিকেট ইতিহাসেরই অন্যতম ভয়ঙ্কর ঘটনার একটি হয়ে থাকবে। স্বভাবিকভাবে বাতিল হয়ে গেছে সিরিজের শেষ টেস্ট।

ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় ব্যাপক প্রাণহানির পর সিরিজের শেষ টেস্ট বাতিল করে দেশে ফিরে আসে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। এই ঘটনায় নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের ওপর কতটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, সময়েই মিলিবে এই প্রশ্নের উত্তরর। তবে ঘটনার দু-দিন না পেরোতেই অস্ট্রেলিয়া অনুর্ধ-১৯ নারী ক্রিকেট দল তাদের আসন্ন নিউজিল্যান্ড সফর বাতিল করে। সব মিলিয়ে দেশটির ক্রীড়াঙ্গনেই সঙ্কটের ঘনঘটা। খোদ নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের (এনজেডসি) প্রধান নির্বাহী ডেভিড হোয়াইট সেটি উপলব্ধি করতে পারছেন। ঘৃণিত এই কা-ে গোটা ক্রিকেট বিশ্বের নিরাপত্তাই বদলে যাবে বলে মনে করছেন তিনি। শান্তির দেশগুলোর তালিকায় নিউজিল্যান্ডের অবস্থান ওপরের সারিতে। যেখানে মানুষ রাস্তায় হাঁটার সময়ও আস্তে কথা বলেন যাতে পাশের কারও সমস্যা না হয়। শান্তির সঙ্গে সাধারণ মানুষের বন্ধন এত দৃঢ় যে পুলিশকে সবসময় সঙ্গে অস্ত্রও বহন করতে হয় না। সেখানে এমন ঘটনায় পুরো বিশ্বই বিস্মিত।

এনজেডসি’ নির্বাহী হোয়াইট বলেন, ‘এটা ভীতিকর। আন্তর্জাতিক খেলা আয়োজনের পুরো দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দেবে এই ঘটনা। আমার মনে হয়, এখন সবকিছু পরিবর্তন হয়ে গেছে। অবশ্যই আমাদের বিষয়টি আরও গভীরভাবে ভাবতে হবে। নিউজিল্যান্ড নিরাপদ, এই ভাবনাটা আর রইল না। আমাদের এখন থেকে খুব, খুব বেশি সতর্ক থাকতে হবে; কর্তৃপক্ষ এবং স্পোর্টিং অর্গানাইজেশনকে, অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।’ এই ঘটনার পর বাংলাদেশ দলের সদস্যরাও দ্রুত ক্রাইস্টচা ছাড়তে অধির হয়ে পড়েন। হোয়াইট মনে করছেন, ক্রিকেটাররা যেমন পরিস্থিতির মুখে পড়েছিলেন, তাদের ঘাবড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। তিনি বলেন, ‘তারা ধাক্কা খাবে এটাই স্বাভাবিক। আর সবার মতো তারাও হতভম্ব। নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট ক্রাইস্টচার্চ এবং সেখানে গোলাগুলির ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহানুভূতি জানাচ্ছে। আমরা স্তম্ভিত এবং আতঙ্কিত, নিঃসন্দেহে নিউজিল্যান্ডের জনগণও।’

নিউজিল্যান্ড শান্তির দেশ। ওই দেশে কেউ খেলতে গেলে কখনও নিরাপত্তা শঙ্কায় ভোগেনি। তাই নিরাপত্তারক্ষীরও প্রয়োজন পড়েনি। রোমহর্ষক এই ঘটনায় সেই সুনাম নষ্ট হয়ে গেছে। ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার পর নিউজিল্যান্ডও আর নিরাপদ আশ্রয়স্থল রইল না বলে অকপটে স্বীকার করেন হোয়াইট, ‘এটা যেমন বিশ্বের কেউই ভাবতে পারেনি, তেমনি আমরাও ভাবতে পারিনি। এখন সবকিছু নুতন করে ভাবার সময় এসেছে।’ যোগ করেন তিনি।

যুগে যুগে ক্রিকেটে সন্ত্রাসের কালো থাবার এমনি কিছু চিত্র এখানে তুলে ধরা হলোÑ

২০০৯, লাহোর : দশ বছরের আগে সেটাও ছিল মার্চ মাস। ৩ মার্চ, সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টের তৃতীয় দিন খেলার উদ্দেশ্যে লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে যাচ্ছিল শ্রীলঙ্কা দল। কিন্তু পথেই প্রায় ১২ সন্ত্রাসীর এক দল লঙ্কান বাসটিতে আক্রমণ করে। সেই আক্রমণে অল্পের জন্য বেঁচে যান শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটাররা। যদিও আহত হয়েছিলেন ছয়জন। পাকিস্তান পুলিশের তিন সদস্যের পাশাপাশি নিহত হন দু’জন সাধারণ মানুষ। পরে বাসচালকের চতুরতায় স্টেডিয়ামে চলে আসতে পারে পুরো দল। সেখান থেকেই হেলিকপ্টারে করে বিমানবন্দর হয়ে দেশে ফিরে আসেন তারা। সিরিজের পাশাপাশি পাকিস্তানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটও বাতিল হয়ে যায়।

২০০৮, মুম্বাই: ২০০৮ সালের ২৬ নবেম্বর থেকে পরের তিন দিন ভারতের মুম্বাই শহরের ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ভয়াবহ হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। সে সময় ভারত সফরে ছিল ইংল্যান্ড দল। হামলার জেরে দুই দলের ওয়ানডে সিরিজের শেষ দুটি ম্যাচ বাতিল হয় এবং ইংলিশ ক্রিকেটাররা দেশে ফিরে যান।

২০০২, করাচী: ২০০২ সালে করাচীতে সফররত নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট দলের হোটেলের সামনে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানো হয়। এতে আহত হন নিউজিল্যান্ড দলের একজন সাপোর্ট স্টাফ। করাচীর দ্বিতীয় টেস্ট বাতিল করে এরপর দেশে ফিরে যায় কিউইরা।

২০০১, কলম্বো : কলম্বো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২০০১ সালের জুলাইয়ে আত্মঘাতী হামলা চালিয়েছিল তামিল টাইগাররা। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ১৪ জন তামিল গেরিলার পাশাপাশি নিহত হন এয়ারফোর্সের সাত সদস্য। নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট দল সে সময় অবস্থান করছিল শ্রীলঙ্কায়। সেবার অবশ্য সফর বাতিল করেনি তারা। কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল ম্যাচ।

১৯৯৬, কলম্বো: ১৯৯৬ সালের ৩১ জানুয়ারি কলম্বোর সেন্ট্রাল ব্যাংক অব শ্রীলঙ্কার মূল গেটের সামনে বিস্টেম্ফারকবোঝাই ট্রাক নিয়ে হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। নৃশংস সেই হামলায় মারা যায় ৯১ জন। এই হামলার জেরে বিশ্বকাপের প্রাথমিক পর্বের ম্যাচ খেলতে শ্রীলঙ্কা আসার ব্যাপারে আপত্তি জানায় অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ফলে শ্রীলঙ্কা সরাসরি উঠে যায় কোয়ার্টার ফাইনালে। পরে সেই বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়নও হয়েছিল লঙ্কানরা।

কলম্বো, ১৯৮৭ : ওই সফরে লঙ্কার মাটিতে তিনটি টেস্ট ও পরে চার ওয়ানডে খেলার কথা ছিল নিউজিল্যান্ডের। একই সময়ে শ্রীলঙ্কায় চলছিল গৃহযুদ্ধ। তখন কলম্বোয় নিউজিল্যান্ডের হোটেলের কাছাকাছি একটি বোমা হামলায় প্রায় ১১৩ জনের মৃত্যু হয়। যে কারণে এক টেস্ট খেলার পর পুরো সফর বাতিল করে ফিরে যায় কিউইরা।