২৪ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ফুটবলার রাকিবের নতুন অধ্যায় শুরু...

  • রুমেল খান

ফোনে নিয়মিত না হলেও ফেসবুকে মাঝেমধ্যেই কথা হতো তরুণটির সঙ্গে। তবে নানা ব্যস্ততায় মাস আটেক ধরে আর কোন যোগাযোগ হয়নি। হঠাৎই গত বৃহস্পতিবার ‘সারপ্রাইজ-ফোনকল এলো তরুণটির, ‘ভাইয়া, আমি তো বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। কাল শুক্রবার। আপনাকে দাওয়াত। যেভাবেই হোক বগুড়ায় আসতেই হবে কিন্তু!’ এত সংক্ষিপ্ত সময়ে ছুটি ম্যানেজ করে সেখানে যে যাওয়া সম্ভব না, সে কথা বোঝাতে বেশ বেগ পেতে হলো। বিয়ের জন্য তাকে অগ্রিম শুভকামনা জানালাম এবং পরে বগুড়া যাওয়ার আশ^াস দিলাম। তবে না যাওয়াতে রাকিব যে হতাশ হয়েছে, সেটা বুঝতে বাকি রইল না।

ফোনটা রেখে স্মৃতির অতলে ডুবে গেলাম। ফিরে গেলাম পাঁচ বছর আগে। মায়াবী, সুদর্শন সেই রাকিব নামের ছেলেটির সব কথা একের পর স্মৃতির দুয়ারে ভিড় করতে লাগল। রাকিবের সন্ধান দিয়েছিলেন শাহাদাত হোসেন যুবায়ের। ফুটবল-পাগল শ্মশ্রুম-িত সংগঠক, ডিজাইর সকার এজেন্সির প্রধান নির্বাহী অফিসার, বাংলাদেশ ফুটবল সাপোর্টার্স ফোরাম এবং সাইফ স্পোর্টিং ফ্যান ক্লাবের এই সাধারণ সম্পাদক আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘দারিদ্র্যতা-ইনজুরির কারণে রাকিবের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে না গেলে বাংলাদেশের ফুটবল ওর মতো রত্নকে পেলে অনেক উপকৃত হতো!’

যারা নিয়মিত জনকণ্ঠের খেলার পাতা পড়ে থাকেন, তারা নিশ্চয়ই জানেন জনকণ্ঠ সবসময়ই স্থানীয় খেলাধুলার ওপর গুরুত্বারোপ করে। বিশেষ করে দেশীয় বিভিন্ন অবহেলিত খেলার মেধাবী-প্রতিভাবান খেলোয়াড়, দুস্থ-অসুস্থ-নির্যাতিত খেলোয়াড়দের নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। পাঠকরা নিশ্চয়ই রাকিব হাসানকে ভুলে যাননি। বাংলাদেশ অ-১৬ জাতীয় দলের সাবেক এই ফুটবলারকে নিয়ে জনকণ্ঠ ২০১৪ সালের নবেম্বর থেকে ২০১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ছয়টি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। শিরোনামগুলো ছিল : ‘চিকিৎসার অভাবে পঙ্গুপ্রায় রাকিব’: জাতীয় অনুর্ধ-১৬ দলে খেলা এই মেধাবী ফুটবলারের সার্জারির খরচ যোগাতে অসহায় তার পরিবার, প্রয়োজন কমপক্ষে দেড় লাখ টাকা’, ‘জনকণ্ঠের রিপোর্ট প্রকাশে ক্রীড়াঙ্গনে সাড়া : ডিসেম্বরে অপারেশন রাকিবের!’ ‘মাঠে ফেরার দিন গুণছে সেই রাকিব’, ‘আবারও ইনজুরির শিকার ফুটবলার রাকিব!’, ‘ আবারও ফেরার স্বপ্ন দেখছে রাকিব ...’ এবং ‘সেই ফুটবলার রাকিব এখন হোটেলের রুম এ্যাটেনডেন্ট!’

ওই তিন বছরে প্রতিটি প্রতিবেদন লেখার সময় অবাক ও ভারাক্রান্ত মনে ভেবেছি, এত অল্প বয়সের একটি তরুণ কিভাবে এত চাপ নিয়ে, ঝড়-ঝাপটা সামলে, টেনশন নিয়ে জীবন-সংগ্রাম করে টিকে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে! এই বয়সেই এত অভিজ্ঞতা সবাই অর্জন করতে পারে না।

পাঠক নিশ্চয়ই উৎসুক হয়ে আছেন রাকিবের জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের গল্প শুনতে। গত ১৫ মার্চ, শুক্রবার বিয়ে করেন রাকিব। স্ত্রী অনামিকা ইসলাম মিতা। গৃহিণী মা পারুল বেগম এবং টিএমএস বালুর ডিপার্টমেন্টের চাকরিজীবী বাবা অহেদুল সরকারের তিন সন্তানের দ্বিতীয়জন মিতা (আরও দু’ভাই আছেন)। তারা থাকেন নওদাপাড়া বগুড়া সদরে। মিতা বগুড়ার টিএমএস টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছেন দ্বিতীয় সেমিস্টারে। বিয়ের পর রাকিব জেনে খুবই প্রীতি হয়েছেন, যখন জানতে পারেন মিতার প্রিয় খেলা ফুটবল! এছাড়া মিতার প্রিয় খেলোয়াড় ব্রাজিলের নেইমার (রাকিবের প্রিয় ব্রাজিলের মার্সেলোকে), প্রিয় ফুটবল দেশ ব্রাজিল।

মিতা জনকণ্ঠকে জানান, ‘আমি ওনার (রাকিবের) খেলা কখনও দেখতে পারিনি। তাই এজন্য অনেক আফসোস আছে। তবে আমার একটি স্বপ্ন আছে। আর তাহলো যদি ভবিষ্যতে আমাদের কখনও সন্তান হয়, তাহলে তাকে ফুটবলার বানাবো। তখন তার খেলা দেখে আক্ষেপ মেটাবো!’

মজার ব্যাপার হচ্ছে রাকিব-মিতার জন্ম একই মাসে! আরও অবাক হবেন, যখন শুনবেন মিতার জন্ম তারিখ ১২ জুন এবং রাকিবের জন্মতারিখ ১৩ জুন! তার মানে মিতা রাকিবের চেয়ে বয়সে একদিনের বড়! রাকিবের হাস্যমাখা জবাব, ‘আরে না ভাই, তারিখে ও আমার চেয়ে একদিনের বড়। কিন্তু সালের বিচারে আমি তো ওর চেয়ে দুই বছরের বড়! আমার জন্ম ১৯৯৮ সালে, ওর ২০০০ সালে। আমার ২১ চলে, আর ওর ১৯ চলছে। কাজেই বুঝতেই পারছেন, কে বড়! হা হা হা!’

রাকিব এখন চাকরি করছেন বগুড়ার ফাইভ স্টার হোটেল মম ইনে, অডার টেকার পদে। এখানে যোগ দেন ২০১৮ সালের ১ জুলাই। এর আগে চাকরি করতেন ঢাকার বনানীর গোল্ডেন টিউলিপে, রুম এ্যাটেনডেন্ট পদে। ওখানে কাজ করেছেন দশ মাস (২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত)।

বিয়েটা কিভাবে হলো? লাভ ম্যারেজ? ‘আরে না, আমার আর মিতার পরিবার মিলে ঠিক করে বিয়ে দিয়েছে। ওর সঙ্গে আমার আগে পরিচয় ছিল না।’

চাকরির পাশাপাশি রাকিব লেখাপড়াটাও চালিয়ে যাচ্ছেন। এখন তিনি পড়ছেন বগুড়ার সরকারী শাহসুলতান কলেজে বিএসএস-এর প্রথম বর্ষে। বিয়ে করে জীবনের নতুন-দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু করলেন, ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি? ‘চাকরির পাশাপাশি ফুটবলটাও চালিয়ে যেতে চাই, একসময় নিশ্চয়ই আমার পায়ের ইনজুরি ভাল হবে। তখন আবারও খেলবো।’ রাকিবের ভাষ্য।

রাকিব হাসানের বিগত জীবনের গল্পটা এরকমÑ তিনি বাংলাদেশ অ-১৬ জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার। বিকেএসপির সাবেক শিক্ষার্থী। ফুটবল খেলতে গিয়ে দু’বার পায়ে আঘাত পান। প্রতিবারই টাকার অভাবে অপারেশন করাতে সমস্যায় পড়েন। জনকণ্ঠ তাকে নিয়ে এ বিষয়ে একাধিকবার রিপোর্ট করে। শেষ পর্যন্ত দু’বারই তার চিকিৎসার খরচ জোগাতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক্রীড়া অন্তঃপ্রাণ এক ব্যক্তি।

লেফটব্যাক পজিশনে খেলা রাকিবের নিবাস বগুড়া সদরে। এখানেই জন্ম তার। খুবই দরিদ্র পরিবারেরর সন্তান তিনি। বাবা মোজাহার আলী সবজি বিক্রেতা। মা মিরিনা বেগম গৃহিণী। ৩ ভাই, ১ বোনের মধ্যে রাকিব তৃতীয়। রাকিবের ফুটবল ক্যারিয়ার এ রকমÑ ২০১১ সালে যাত্রা শুরু বিকেএসপির হয়ে। এরপর ২০১৩ সালে বগুড়া ফুটবল লীগের ১টি ম্যাচে (ফাইনাল) খেলা। অনুর্ধ-১৬ জাতীয় দলে ডাক পাওয়া ওই বছরই। সেবারই বয়সভিত্তিক সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ খেলতে যায় নেপালে (বাংলাদেশের কোচ ছিলেন রেনে কোস্টার, সহকারী কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন)। বাংলাদেশ সেমিতে হেরে যায় স্বাগতিকদের কাছে। সেবার দলের ৪ ম্যাচের ৩টিতেই খেলেন। জ্বর হওয়ায় ১টিতে খেলতে পারেননি।

২০১৩ সালে বিকেএসপির মাঠে একটি অনুশীলন ম্যাচ খেলতে গিয়ে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের সঙ্গে সংঘর্ষে বাম পায়ে মারাত্মক আঘাত পান। হাসপাতালে ৪০ দিন ভর্তি ছিলেন। বিকেএসপির ডাক্তার দেবাশীষ চক্রবর্তীকে দেখানোর পর জানতে পারেন পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেছে তার। যত দ্রুত সম্ভব অপারেশন করাতে হবে ভারতের কলকাতায় গিয়ে। এর জন্য প্রয়োজন (যাতায়াত, অপারেশন ও ওষুধ খরচ সব মিলিয়ে) প্রায় দেড় লাখ টাকা। শুনেই মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে রাকিবের বাবা-মায়ের! এত টাকা কোথায় পাবে তারা? উপয়ান্তর না দেখে রাকিব শরণাপন্ন হন বাংলাদেশ ফুটবল সাপোর্টার্স ফোরামের।

তাদের কাছ থেকেই বিষয়টি জেনে রাকিবকে নিয়ে বিশেষ রিপোর্ট করে জনকণ্ঠ। এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর এটি অনেকেরই নজরে আসে। বাংলাদেশ অনুর্ধ-১৬ জাতীয় দলের ইনজুরিগ্রস্ত ফুটবলার রাকিবের চিকিৎসার খরচ দিয়ে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক। তিনি রাকিবের চিকিৎসার ব্যাপারে বাড়িয়ে দেন সাহায্যের হাত। তাঁর সাহায্যেই ২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর রাকিবের অপারেশন হয়। প্রায় ২ লাখ টাকা খরচ হয় অপারেশনের জন্য।

সুস্থ হয়ে আবার খেলা শুরু করেন রাকিব। কিন্তু ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে অনুশীলন করার সময় পায়ে আবারও বা পায়ে ব্যথা পান। তারপর ৫ ফেব্রুয়ারি ডাক্তার প্রশান্ত আগারওয়াল রাকিবের পা পরীক্ষা করেন। জানান, বা পায়ের জয়েন্ট অপারেশন করতে হবে। এজন্য প্রায় দেড় লাখ টাকা লাগবে। আবারও অথৈ জলে পড়েন রাকিব। শেষে আর কোন উপায় না দেখে ওই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক্রীড়া সংগঠকের কাছেই আবারও রাকিবকে যেতে হয় অনেকটা অনিচ্ছায়-লজ্জায়! এবার তিনি অবশ্য আর্থিকভাবে সাহায্য করতে না পারলেও অন্য উপায় বাতলে দেন। রাকিবকে পাঠান ইপিলিয়ন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াজউদ্দিন আল মামুনের কাছে। মামুন রাকিবকে প্রয়োজনীয় অর্থ দেন। ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর একটি হাসপাতালে রাকিবের পায়ে অস্ত্রোপচার করেন ড. এম. আলী। অপারেশন সফল হয়। ডাক্তার জানান, আবারও ফুটবল মাঠে ফিরতে রাকিবের ছয় মাস লাগবে। এ সময়টায় তাকে ব্যায়াম করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ খেতে হবে। ওই সময় বিকেএসপির নিয়মের গ্যাঁড়াকলে পড়েন রাকিব। বিকেএসপির নিয়ম হচ্ছেÑ কোন শিক্ষার্থী যদি ৫/৬ মাসের মধ্যে তার চোট সারাতে না পারে, তাহলে তাকে বিকেএসপি থেকে বের করে দেয়া হয়! নিরূপায় হয়ে রাকিব কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে সময়টা একটু বাড়িয়ে নেন।

কিন্তু রাকিবের কপাল খারাপ। অপারেশন করে সুস্থ হলেও ডাক্তার জানিয়ে দেন, তিনি আর কোনদিনও ফুটবল খেলতে পারবেন না! যদি খেলেন এবং আবারও চোট পান, তাহলে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হবে! অথচ তার বিকেএসপির ক্লাসমেটদের অনেকেই এখন বিপিএল ফুটবলে বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে খেলছেন!

তারপরও ক্ষীণ হলেও আশা থাকে। ডাক্তার বলেন, বিদেশে গিয়ে যদি উন্নত চিকিৎসা করানো যায়, তাহলে পা-টা ভালমতো সারবে, এমনকি তখন ফুটবলও খেলা যাবে। সেই আশাতেই আছেন রাকিব।

দু’বারের ইনজুরি-অপারেশনে জীবনের গতিপথ বদলে যায় রাকিবের। ফুটবলার হবার সুনীল স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিয়ে ঢাকার বনানীর একটি হোটেলের রুম এ্যাটেনডেন্ট হিসেবে চাকরি করেন দশ মাস। কষ্ট পাবেন বলে শুরুতে মা-বাবাকে এই চাকরির কথা জানাননি রাকিব। এমনকি লজ্জায় বিকেএসপির কোন ক্লাসমেটদেরও জানাননি।

বিয়ে করে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করে সুখী হতে চান রাকিব। প্রত্যাশা পড়াশোনা শেষ করা এবং আবারও প্রাণের প্রিয় খেলা ফুটবলে ফেরা। তার এই প্রত্যাশা কতটা পূরণ হবে, সেটা সময়ই বলে দেবে।