১৯ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অস্থিরতার দিকে উঁকি দিচ্ছে আলজিরিয়া

  • তৌফিক অপু

আলজিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদুল আজিজ বুতেফ্লিকা আবারও প্রেসিডেন্ট পদে পুনর্নির্বাচনের জন্য দাঁড়াচ্ছেন। ব্যাপারটা রীতিমতোই একটা প্রহসন। ৮২ বছর বয়স্ক এই নেতা ইতোমধ্যে টানা চারটি মেযাদ পূর্ণ করেছেন। প্রতিটি মেয়াদ পাঁচ বছরের। বুতেফ্লিকা বা তার কোটারি আশা করে যে আগামী ১৮ এপ্রিল যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তাতে তিনি পঞ্চম বারের মতো নির্বাচিত হবেন।

অথচ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো বয়স এবং শারীরিক ও মানসিক অবস্থা কোনটাই তার নেই। অসুস্থ এই নেতা এখন সুইজারল্যান্ডের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নিজের ইন্দ্রীয়গুলো তার পুরো নিয়ন্ত্রণে নেই। ২০১৩ সালে স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে তাকে কদাচিৎ প্রকাশ্যে দেখা গেছে। মাঝেমধ্যে সরকার বুতেফ্লিকার ভিডিও প্রকাশ করেন সেখানে তাকে বিভ্রান্ত অবস্থায় দেখা যায়। তার ধামাধরা সরকর্মীরা তাকে ঘিরে থাকেন। এই বৃদ্ধ লোকটি কথা বলতে বা হাঁটাহাঁটি করতে পারেন কি পারেন না, তার পরও তিনি বিগত নির্বাচনে পার পেয়ে গেছেন।

আসলে আলজিরিয়ার প্রকৃত ক্ষমতা এখন আর বুতেফ্লিকার হাতে নেই। তিনি নামেমাত্র প্রেসিডেন্ট। তার আড়ালে দেশ চালাচ্ছে এবং আসল ক্ষমতা প্রয়োগ করছে গোপন একটি চক্র যা পৌভয়ের নামে পরিচিত। এই চক্র শুধু যে দেশ চালাচ্ছে তা নয়, তা থেকে তারা নিজেদের আখেরও গুছিয়ে নিচ্ছে, ধন সম্পদ গড়ছে। এই কাজটি তারা যাতে চালিয়ে যেতে পারে তার জন্য বুতেফ্লিকার আরও এক দফা ক্ষমতায় থাকা দরকার।

আলজিরিয়ানদের কাছে এমন প্রহসন বা তামাশা ঢের হয়েছে। তারা আর তা চায় না। তারা সংস্কার চায়, নতুন নেতৃত্ব চায়। সেই দাবিতে হাজার হাজার মানুষ সারাদেশের শহরে-নগরে ও রাজপথে নেমে এসেছে। তাদের দাবি বুতেফ্লিকা যেন আর না দাঁড়ান। কিন্তু জেনারেল, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিকদের শাসকচক্র বুতেফ্লিকার উত্তরসূরি খুঁজে বের করতে অপারগতার পরিচয় দিয়েছে। শুধু তাই নয় তারা প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতেও অক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। অথচ নতুন প্রজন্মের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় এসেছে। সেটা হলে আলজিরিয়ার বিশাল সম্ভাবনাময় ক্ষমতা উন্মোচিত হবে।

শাসকচক্র বলে, বুতেফ্লিকার ক্ষমতায় থাকা স্থিতিশীলতার পরিচয়। আর সমালোচকরা বলে এটা হলো বন্ধ্যত্ব। আলজিরিয়ায় শেষবারের মতো অবাধ ও সুষ্ঠু সংসদীয় নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯১ সালে। সে সময় প্রথম দফা নির্বাচনে ইসলামপন্থীরা বিজয়ী হলে জেনারেলরা দ্বিতীয় দফা নির্বাচন বাতিল করে দেয়। তখন থেকে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ যা ১৯৯০ এর দশকের বেশিরভাগ সময় ধরে চলে। এতে ২ লাখ লোক নিহত হয়। বুতেফ্লিকা দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে সেই ‘কৃষ্ণ দশক’ থেকে বের করে আনেন। ২০১১ সাল থেকে গণঅসন্তোষ ও বিক্ষোভে প্রতিবেশী অনেক দেশই প্রকম্পিত হলেও আলজিরিয়া তা থেকে মুক্ত থাকতে সক্ষম হয়। আজ আলজিরিয়া আরব বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ দেশগুলোর একটি।

তবে তার জন্য চড়া মাশুলও দিতে হয়েছে। এলিটশ্রেণী নির্মম শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতায় থাকার যৌক্তিকতা দেখাতে গিয়ে সেই গৃহযুদ্ধ ও জিহাদী আন্দোলনের হুমকির দোহাই দিয়ে থাকে। দেশে ১৯ বছর ধরে বলবত জরুরী অবস্থা ২০১১ সালে তুলে দেয়া হলেও রাজনৈতিক বক্তব্য বিবৃতির ওপর এখনও বিধিনিষেধ আছে। মিডিয়ার কণ্ঠরুদ্ধ, সরকারের সমালোচকদের হয়রানি করা হয়। কর্তৃপক্ষ খোঁড়া যুক্তিতে বিরুদ্ধবাদীদের জেলে পোরে। পার্লামেন্ট ও বিচার বিভাগের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের আজ্ঞাবহ ছাড়া আর কিছুই নয়।

তেল ও গ্যাসের মতো প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ আলজিরিয়ার অবস্থা অনেক ভাল হওয়ার কথা। কিন্তু যোগ্য নেতৃত্ব ও সুষ্ঠু নীতির অভাবে তা হচ্ছে না। গণঅসন্তোষ দেখা দিচ্ছে। শাসকগোষ্ঠীও বুঝতে পারছে যে সরকারী চাকরি দিয়ে ও ভর্তুকির ব্যবস্থা করেও তারা আর জনগণের আনুগত্য কিনতে পারছে না। তেল ও গ্যাসের দাম পড়ে যাওয়ায় সরকারের রাজস্ব কমেছে। বেকারত্ব বেড়ে ১১ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ কাজের সন্ধানে ঘুরছে। অন্যদিকে লাগামহীন দুর্নীতি পরিস্থিতিকে বিষময় করে তুলেছে।

শাসকগোষ্ঠী বুঝতে পারছে যে তারা সমস্যার সমাধান দিতে পারছে না। তথাপি তারা ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে চায়। তাই তারা বুতেফ্লিকাকে সময় ক্ষেপণের জন্য ক্ষমতায় রাখতে চায়। তাদের কাছে বুতেফ্লিকা হলেন একাদশ শতাব্দীর স্প্যানীয় বীর এলসিডর মতো অর্থাৎ জনগণের কাছে প্রেরণার উৎস। কিন্তু তারা এই সত্যটি অনুধাবনে অপারগ যে আলজিরিয়ার সিংহভাগ মানুষের কাছে বুতেফ্লিকা এখন আর অনুপ্রেরণা নন বরং উপহাস ও করুনার পাত্র। তারা চায় সংস্কার, মুক্ত গণতন্ত্র ও সত্যিকারের অবাধ প্রতিনিধিত্বমূলক শাসন। একদা লৌহমানব বুতেফ্লিকার মৃত্যু হলে দেশে কি হবে তা কেউ বলতে পারে না। হয়ত আরেকটা গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হবে দেশটি। তবে সেই গৃহযুদ্ধ ঠেকানোর কোন সদিচ্ছা শাসকগোষ্ঠীর আছে বলে মনে হয় না।

চলমান ডেস্ক

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট