২০ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাঘাইছড়িতে সন্ত্রাসী হামলা

অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে আবার সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে এবার সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে নির্বাচনী কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর। রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার কংলাক প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে উপজেলা নির্বাচন শেষ করে তিনটি চাঁদের গাড়িযোগে ফিরছিল দলটি। সন্ধ্যার দিকে দীঘিনালা-সাজেক সড়কের নয় মাইল এলাকায় ঘটে অতর্কিত হামলার ঘটনা। সন্ত্রাসী দুর্বৃত্তদের মুহুর্মুহু ব্রাশফায়ারে পোলিং কর্মকর্তা, দুই নারী আনসার সদস্যসহ মোট সাতজন নিহত হন। আহত ১৫ জনের মধ্যে ১১ জনের অবস্থা গুরুতর। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের আনা হয়েছে চট্টগ্রাম ও ঢাকা সিএমএইচে। ঘটনার পর পরই সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন নেমেছে উদ্ধার এবং দুষ্কৃতকারীদের ধরতে চিরুনি অভিযানে। বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এবং জেএসএসের (এমএন লারমা) গ্রুপের দু’জন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পারস্পরিক কোন্দলকে কেন্দ্র করে এই হামলার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জেএসএস এবং ইউপিডিএফ এই নির্বাচনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছিল। একটি গোয়েন্দা সংস্থা এই ঘটনার জন্য দায়ী করেছে ইউপিডিএফকে। রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার অবশ্য বলেছেন, ঘটনা কারা ঘটিয়েছে তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। যে বা যারাই এই ঘটনা ঘটাক না কেন, এটা যে নির্বাচন তথা গণতন্ত্রের ওপর আঘাত সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। পরদিন দুর্বৃত্তরা একই কারণে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে হত্যা করে বিলাইছড়ি আওয়ামী লীগের সভাপতি সুরেশ কান্তি তঞ্চাঙ্গ্যাকে।

উল্লেখ্য, বর্তমান সরকার কর্তৃক পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার পর ২০১৭ সালের ৫ ডিসেম্বর থেকে রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে বিবদমান আঞ্চলিক গ্রুপগুলো সংঘাত-সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে, যার জেরে এ পর্যন্ত প্রাণ দিতে হয়েছে অন্তত ৫৮ জনকে। সত্যি বলতে কি, খুনের বদলে খুন সেখানে যেন একটি রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক দল ও গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

কয়েকটি গ্রুপের পারস্পরিক সংঘাত, সংঘর্ষ, গোলাগুলি, রক্তপাত ও হানাহানির ঘটনায় সর্বাধিক বিপর্যস্ত হয়েছে পাহাড়ী জনপদের জনজীবন। ফলে অনেক তরুণ-তরুণীকে নিরাপত্তার জন্য ইতোমধ্যে এলাকাছাড়া হতে হয়েছে। সর্বাধিক আতঙ্কে বসবাস করতে হচ্ছে সেখানে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক বাঙালীকে। সবচেয়ে যা দুঃখজনক তা হলো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাইরে পাহাড়ী জনপদে শান্তি, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য স্থাপনের জন্য স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নেতৃস্থানীয়দের আদৌ কোন উদ্যোগ-আয়োজন নেই বললেই চলে।

১৯৯৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগ ও নেতৃত্বে পার্বত্য শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর সঙ্গত কারণেই আশা করা গিয়েছিল যে, ওই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। তবে দুঃখজনক হলো, দেশের জনগণের সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়িত হয়নি। বরং ইতোমধ্যে কোন কোন অঞ্চল আবার অস্থির ও অশান্ত হয়ে উঠেছে। এর জন্য পাহাড়ীদের পক্ষ থেকে প্রায়ই শান্তি চুক্তির ধারাগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ার অভিযোগ উত্থাপিত হয়ে থাকে। এই অভিযোগ সত্য নয়। বরং শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার বরাবরই আন্তরিক ও সচেষ্ট। তবে পার্বত্য অঞ্চলে সর্বাপেক্ষা জটিল সমস্যা ভূমি জরিপ ও বণ্টনের কাজটি এখনও অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে। বিষয়টি সময়সাপেক্ষ এবং জটিলও বটে। আইনী জটিলতাও আছে বৈকি। সর্বোপরি পার্বত্য অঞ্চলের অধিবাসীরা একাধিক ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীতে বিভক্ত। নেতৃত্বের সঙ্কটসহ বহুধাবিভক্ত গোষ্ঠী এমনকি সশস্ত্র গ্রুপও বিদ্যমান, যার জের চলমান। এমতাবস্থায় নিজেদের মধ্যে নেতৃত্বহীনতা, পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাস বিরাজমান থাকলে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন যে হবে সুদূরপরাহত, তাতে আর সন্দেহ কি? পাহাড়ীদের এই সারসত্য বুঝতে হবে যে, নিজেদের মধ্যে অবিশ্বাস ও অনৈক্য বজায় রেখে এমনকি সশস্ত্র সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়ে খুব বেশিদূর অগ্রসর হওয়া যাবে না। তাতে তারা নিজেদের গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনিবার্য ধ্বংসই ডেকে আনবে। বরং তাদের উচিত হবে বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সম্মান প্রদর্শন করে পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সুনিশ্চিত করা। আগামীতে এই ধরনের ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে এবং সব হত্যার দ্রুত বিচার হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব স্থানীয় প্রশাসনের এবং রাজনৈতিক নেতাদের। প্রয়োজনে এ বিষয়ে সরকারকে কঠোর হতে হবে।