২০ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গণহত্যা ১৯৭১ ॥ রাজশাহীর হরিপুর

  • মোহাম্মদ আরিফুল হক

একাত্তরে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর নারকীয় গণহত্যা শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ^ মানবতার ইতিহাসেও একটি কালো অধ্যায়। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর পরিকল্পিত গণহত্যায় প্রাণ দিতে হয়েছিল ৩০ লাখের অধিক মানুষকে। ধর্ষণ আর নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল ৫ লাখেরও বেশি মা-বোনকে। ২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকেই পাকিস্তানী সেনাবাহিনী দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো রাজশাহীতেও নিরীহ জনগণের ওপর হামলা করে। পাকিস্তানী সৈন্যরা কয়েকটি উপদলে বিভক্ত হয়ে রাজশাহীর উপশহরস্থ ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হয়ে শহরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। ভৌগোলিকভাবে পবা উপজেলা রাজশাহী শহরের চারপাশ দিয়ে অবস্থানের কারণে এবং এখানে স্থানীয়ভাবে কিছু রাজাকার বাহিনী তৈরি হওয়ায় পাকিস্তানী বাহিনীর কাছে এই এলাকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে রাজশাহী শহর থেকেও অনেক মানুষ পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নে আশ্রয় নেয়। সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় এলাকাটি সাধারণ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের যাতায়াতের এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। ৭ নবেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা এই অঞ্চলে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর একটি গাড়ি এ্যাম্বুশ করে কয়েকজন পাকিস্তানী সৈন্য ও আব্দুস সামাদ নামে একজন পাকিস্তানপন্থী বাঙালী দারোগাকে হত্যা করে। তাছাড়া এ সময় মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ করে এই অঞ্চলের শান্তি কমিটির কয়েকজন নেতাকে হত্যা করে।

১৩ নবেম্বর ১৯৭১। পাকিস্তানী বাহিনী ক্ষিপ্ত হয়ে ফজরের নামাজের পূর্বেই রাজশাহী-নবাবগঞ্জ রোডের দক্ষিণপাশে রাজশাহী কোর্ট থেকে গোদাগাড়ী উপজেলার ফরহাদপুর গ্রাম পর্যন্ত ঘিরে ফেলে। পাকিস্তানী বাহিনী ফজরের আজান হওয়ার সময় গ্রামের বাড়িঘরে আগুন দেয় এবং গুলি করতে শুরু করে। তাদের গুলি থেকে নারী, পুরুষ এমনকি গবাদী পশু পর্যন্তও রেহাই পায়নি।

১৩ নবেম্বর হরিপুর ইউনিয়নের ১৪৫ জনের বেশি লোককে কয়েক স্থানে জড়ো করে নির্মমভাবে হত্যা করে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। হরিপুর ইউনিয়নের অসংখ্য নারীকে নির্যাতন ও ধর্ষণ করে পাকিস্তানী নরপশুরা। গণহত্যার শিকার এসব মানুষের মধ্যে বেলুয়া খোলা মসজিদে তাবলীগ জামায়াতে আগত অন্য স্থানের লোকও ছিল। এছাড়া পাকিস্তানী বাহিনী স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় অন্যান্য স্থান থেকে লোকজন ধরে এনে এখানে হত্যা করে। রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যেরা গ্রামের নিরীহ মানুষের ওপর বিভিন্নভাবে অত্যাচার করত।

কসবা গ্রামের এসাহক আলী, হেমাজ উদ্দীন ও তাদের ভাতিজা আবদুল বারী, দবির মোল্লাপাড়া গ্রামের সামাদসহ ২০-২৫ জন মানুষকে পাকিস্তানী সেনারা সোনাইকান্দি বিওপি ক্যাম্পে ধরে নিয়ে হত্যা করে। বেলুয়া খোলাবো না গ্রামের বিভিন্ন স্থান থেকে ২৪/২৫ জনকে নদীর পারে ধরে নিয়ে একত্র করে হত্যা করে মাটিতে পুঁতে রাখে। কসবা, খোলাব না, দরগাপাড়া, বেড়পাড়া, টেংরামারি সমস্ত গ্রাম ফাঁকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। এলাকার বেশির ভাগ লোক বরেন্দ্র অঞ্চলের দিকে পালিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

সোনাইকান্দি গণকবর থেকে ১৩ নবেম্বর বিকেলে ২৫-৩০ জনের লাশ উত্তোলন করা হয়েছিল। লাশগুলো উত্তোলনের পরে দেখা যায়, বিভিন্নভাবে অত্যাচার করে তাদের হত্যা করা হয়। অনেককে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। লাশগুলোর চোখ, হাত ও পা বাঁধা ছিল।

দরগা পাড়ার নইমুদ্দীন ও আন্ধরকোটার একজন সাঁওতালসহ বেশকিছু মানুষকে পাকিস্তানী সৈন্যরা গুলির বাক্স বহন করতে দেয়। পাকিস্তানী বাহিনী গুলি করতে করতে তাদের নিয়ে বুলনপুরের আর. আই মিলের নিচে পুকুরের কাছ নিয়ে যায়। এখানে লুৎফর রহমানসহ সবাইকে গুলি করে হত্যা করে পুকুরে লাশ ফেলে দিয়ে যায়। পুকুরটি গভীর হওয়ায় লুৎফর রহমানের স্বজনেরা তার লাশ খুঁজে পায়নি। দরগাপাড়ার সাম মোহাম্মদকে জীবন্ত মাটি চাপা দেয়া হয়েছিল। কারণ, তিনি লাশ উত্তোলনের সময় তার জিহ্বা বের করেছিল।

কসবা গ্রামের গণহত্যা চালানোর সময় দুইজন লাইন থেকে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে বেঁচে যায়। মনিরুজ্জামান নামে ১৬ বছরের একজন পাকিস্তানী সেনাদের সঙ্গে হাতাহাতি করার কারণে তাকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মাংস তুলে হত্যা করে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী।

মরারীপুর গ্রামেও পাকিস্তানী বাহিনী হানা দেয়। মো. সাদিকুজ্জামান কাজলের ভাষ্যমতে, ‘গ্রামের কে. এম আবদুর রশিদ ছিলেন ব্রিটিশ আমলের গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তা। তিনি পাকিস্তানী বাহিনীর সঙ্গে কথাবার্তা বলে তার গ্রামকে গণহত্যার হাত থেকে বাঁচান’।

পদ্মা তীরবর্তী হওয়ার কারণে নদী ভাঙনের ফলে হরিপুর ইউনিয়নের গণকবরগুলোর বেশিরভাগই পদ্মাগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সোনাইকান্দি বিওপির গণকরবটি বিওপিতে প্রাচীর দেয়ার ফলে বর্তমানে বিওপি সীমানা দেয়ালের মধ্যে পড়েছে, সেখানে নেই কোন স্মৃতিস্তম্ভ।

এ গণহত্যা সম্পর্কে বিস্তারিত রয়েছে ‘১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ জাদুঘর ট্রাস্ট’ প্রকাশিত নির্ঘণ্ট গ্রন্থমালায় মো. গোলাম সারওয়ারের গবেষণা গ্রন্থ ‘হরিপুর গণহত্যা’য়। এই গ্রন্থমালার সম্পাদক ড. মুনতাসীর মামুন। এ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানের গণহত্যা নিয়ে ‘১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ জাদুঘর ট্রাস্ট’ ৭০টি নির্ঘন্ট গ্রন্থমালা প্রকাশ করেছে।

লেখক : গবেষণা কর্মকর্তা, গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র, খুলনা