২২ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সমাজ ভাবনা ॥ বিষয় ॥ বৃদ্ধ পিতামাতার ভরণপোষণ

  • উপেক্ষায় অনাদরে;###;সাবরিনা সুলতানা মিশু

বৃদ্ধাশ্রম নামটি শুনলেই চোখের সামনে ধরা দেয় ক্রন্দনরত মায়ের মুখ, সয়িমান বাবার দুর্বল চাহনি। এ যেন জীবনের চরম অভিশাপ। সারাজীবন নিজের ছেলে মেয়েদের বড় করে তুলে শেষ জীবনে সন্তানকে অবলম্বন করে বাঁচার চেষ্টা যেন অন্যায়। মনে মনে শপথ নিয়ে ফেলি কখনো মাকে চোখের জল ফেলতে দেবো না। সারাজীবন আঁকড়ে ধরে থাকব। দশ মাস দশ দিন যেমন গর্ভে আমাদের ধারণ করে রেখেছিলেন, তার ঋণ তো কখনো শোধ হওয়ার নয়। তার সাথে আছে আমাদের বড় হয়ে ওঠা পর্যন্ত মেনে নেয়া সমস্ত আবদার। একটু অসুখ হলেই নিজে না ঘুমিয়ে আমাদের জন্য সারা রাত জাগা, ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে আমাদের জন্য সবকিছু পরিপাটি করে সাজানো, সন্তান না খাওয়া পর্যন্ত না খেয়ে থাকা- এসব কথা লিখতে লিখতেও শেষ হওয়ার নয়। মানুষ জন্মানোর পর থেকে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। পড়ালেখা শেষ করে সে স্বাবলম্বী হয়। তারপর বিয়ে করে সংসার। এর মাঝে বাবা-মায়েরও বয়স কিন্তু বাড়তে থাকে, কমতে থাকে শরীরের শক্তি, অবলম্বন হয়ে পড়ে সন্তানেরা। সংসারের হাল ধরে সকলের দায়িত্ব নেয় বাড়ির ছেলে। কিন্তু কীসের খেয়ালে অতীতের সব স্মৃতি বিলুপ্ত হতে থাকে ছেলের। চিন্তায় তখন নতুন আত্মীয় স্বজন। ঘরের মাঝে জায়গা পায় অবলা পশুপাখিও। কিন্তু মস্ত ফ্ল্যাটে জায়গার কমতি পড়ে মা বাবার জন্য। এক সময়ের অবলম্বন সময়ের খেয়ালে বোঝা হয়ে পড়ে সন্তানের কাছে। অবশেষে বাবা-মায়ের ঠিকানা হয় বৃদ্ধাশ্রমে। এই ধরনের অভিজ্ঞতা হয়তো এখনো আমাদের সমাজে সচরাচর দেখা যায় না, কিন্তু বৃদ্ধাশ্রমে না পাঠিয়ে কোনো সেবা-যতœ ছাড়া ঘরের এক কোণে ফেলে রাখার মধ্যেও নেই কোনো প্রকার বাহাদুরি।

বৃদ্ধা আশ্রমে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে বাবা-মাকে বলতে শুনেছি- আমার ছেলেমেয়েরা ভালো থাকুক, আরও বড় হোক। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া পিতা-মাতা খোঁজেন একটি বাঁচার অবলম্বন, একটু থাকার আবাস। তাদেরকে একটুখানি থাকার জায়গা দিতে পারছে না সন্তানেরা। জাপান, চীন এমনকি ভারত সরকারও আইন করেছে সে সকল সন্তানের বিরুদ্ধে যারা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয় না। সরকার যদি এই বিষয়ে সোচ্চার হয় তাহলে কোনো সন্তান পারবে না তার বৃদ্ধ বাবা-মাকে এই বৃদ্ধ অবস্থায় বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে রেখে আসতে। এই ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অধিকারের জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত শিক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, নৈতিকতা, পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ ও সামাজিক সচেতনতা। মনে রাখতে হবে, আজকের নবীন ভবিষ্যতের প্রবীণ। বৃদ্ধাশ্রম নয়, পরিবারই হোক বাবা-মায়ের নিরাপদ আবাসস্থল। ডিজিটাল যুগের ইট-পাথরের পরিবেশেও অটুট থাকুক মিহি সুতায় বাঁধা পরিবারের সেই স্নেহ-ভালোবাসার বন্ধন, শ্রদ্ধা ও মর্যাদা।

ন্যাশনাল কলেজ অব হোম ইকোনমিকস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে