২০ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কবর দেখিয়া যান...

  • আইয়ুব আল আমিন

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষ এবং তাদের জীবন তুলনামূলক সহজ। এই সহজ মানুষগুলোর আবেগ অনুভূতি এবং ভালবাসা প্রকাশের ভঙ্গিও সহজ। এ-অঞ্চলের লোকসঙ্গীত ভাওয়াইয়াতেও এই সহজিয়া প্রভাব পড়েছে গভীরভাবে। তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, ক্ষিরখ্যাপা, কালজানি, তোরষা ফুলকুমার নদীর উপকূলবর্তী মানুষগুলো কাজে কর্মের ফাঁকে, অবসরে, দুঃখে, ব্যথায় একটু আনমনা হলেই গেয়ে ওঠে ভাওয়াইয়া। ভাবপূর্ণ যে গীত মানুষকে ভাব বিহ্বল করে দেয় তাই ভাওয়াইয়া। এর উচ্চালয়ের ভাঙ্গা আহাজারিপূর্ণ সুর সহজেই মানুষকে আবেগী করে তোলে। সোদামাটির গন্ধমাখা এ-সঙ্গীত দীর্ঘকাল ধরে আমাদের অন্তরাত্মায় গাঁথা। সদ্য প্রয়াত চিলমারীর সন্তান সফিউল আলম রাজাও এ সঙ্গীতকে বুকে ধারণ করেছিলেন ততটাই দরদ দিয়ে। সেটা তার গান শুনলেই বোঝা যায়। এজন্য শ্রোতা-দর্শক তাকে ভাওয়াইয়া রাজকুমার, ভাওয়াইয়া রাজা, ভাওয়াইয়ার ফেরিওয়ালা নামে ডাকত। তিনি প্রায়ই বলতেন ‘যে সঙ্গীতে দরদ নেই সেটা আমার কাছে সঙ্গীতই মনে হয় না।’ আধুনিক এই যুগে এসেও দোতারা, হারমনিয়াম, খোল তবলা নিয়ে তিনি যে আমাদের ঐতিহ্য, শেকড়ে গেঁথে গিয়েছিলেন এটা সত্যি অবাক করা।

শিশু বয়সেই বাবা মায়ের অনুপ্রেরণায় তিনি গান শেখা শুরু করেন। পরবর্তীসময়ে ভাওয়াইয়ার কিংবদনন্তি নুরুল ইসলাম জাহিদের কাছে দীর্ঘদিন এর তাত্ত্বিক বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন এবং ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন সকলের প্রিয় ভাওয়াইয়া রাজা। লোকসঙ্গীতের এই ধারার প্রতি তার গভীর অনুরাগ তাকে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যের কাছাকাছি নিয়ে যায়। তিনি বাংলাদেশ বেতারে ‘বিশেষ’ এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রথম শ্রেণীর তালিকাভুক্ত শিল্পী ছিলেন। দেশের প্রতিটি টিভি চ্যানেলে নিয়মিত তার সঙ্গীত পরিবেশিত হয়। দেশের গ-ি পেরিয়ে বিদেশের মঞ্চ-টিভিতেও সঙ্গীত পরিবেশন করে নন্দিত হন।

পূর্বপরুষের এই সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর গভীর ভালবাসা, অনুরাগ আরও সহজেই অনুমিত হয় ২০০৮ সালে যখন তিনি ঢাকায় ভাওয়াইয়া গানের দল প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ২০১১ সালে তিনি রাজধানীতে প্রতিষ্ঠা করেন ভাওয়াইয়া স্কুল। এখানে ভাওয়াইয়ার উপর এক বছরের ফ্রি কোর্স তিনি নিজেই করাতেন। ২০১৭ সালে পল্লবীতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘কলতান সাংস্কৃতিক একাডেমি’ যেখানে সঙ্গীত ছাড়াও সংস্কৃতির অন্যান্য শাখা অন্তর্ভুক্ত করেন।

রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমি, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, আড়িয়াল খাঁ সেন্টার, ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তাঁর একক সঙ্গীতানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০০৬ সালে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত বেঙ্গল বিকাশ প্রতিভা অন্বেষণে শ্রেষ্ঠ শিল্পী নির্বাচিত হয়েছিলেন। আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, ফেরদৌসী রহমান, রথীন্দ্রনাথের পর দীর্ঘ চার দশক বাদে তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘উত্তরের সুর’ এ প্লেব্যাক করেন এবং সকলের কাছে সমাদৃত হন। তিনি ভাওয়াইয়া গাওয়ার পাশাপাশি নিজেও রচনা করেন অসংখ্য ভাওয়াইয়া গান। ২০১১ সালে ভায়োলিন মিডিয়া থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর একক এ্যালবাম ‘কবর দেখিয়া যান’। এর আগে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন থেকে তার একটি মিক্সড এ্যালবামও প্রকাশিত হয়।

পেশাজীবনে সফিউল আলম রাজা ছিলেন একজন সাংবাদিক। দীর্ঘ ২৫ বছরের সাংবাদিক জীবনে তিনি দেশের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দৈনিকে দায়িত্ব পালন করেন কৃতিত্বের সঙ্গে। সাংবাদিকতায় তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুরস্কার, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারনেশনাল পুরস্কার, ডেমোক্র্যাসি ওয়াচ হিউম্যান রাইটস এ্যাওয়াড, ইউনেস্কো ক্লাব এ্যাসোসিয়েশন এ্যাওয়ার্ডসহ অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন।

এতকিছুর পরও সঙ্গীত অন্তপ্রাণ এই মানুষটি নিজেকে সুরের গহীন গভীরতায় সপে দিয়েছিলেন ভালবেসে। মাত্র ৪৮ বছর বয়স। একজন মানুষের জন্য কমই বলা যায়। এত সকালে দোতারার মায়া তিনি ছেড়ে যাবেন এটা অকল্পনীয় এবং আমাদের জন্য এক নিদারুণ অপ্রাপ্তি।

এটা ঠিক একবিংশ এই শতকে জীবনযাত্রার সকল ক্ষেত্রে আধুনিকায়নের সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গীতেও তার প্রভাব পড়েছে। সেখানে আমাদের ঐতিহ্য পরম্পরা, শেকড় মাটি ঘেষা সংস্কৃতি আজ বিরাট হুমকির সামনে দাঁড়িয়েছে অত্যন্ত নিরীহভাবে। এই পরিস্থিতিতে অন্তরে আত্মায় লোকসঙ্গীত ধারণ করা এই মানুষটিকে হারিয়ে আমরা যতটা ব্যথা পেলাম তার চেয়েও অধিক ব্যথা লাগল ভাওয়াইয়ার বুকে, অস্থি মজ্জায়...

নির্বাচিত সংবাদ