১৮ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রাষ্ট্রনায়কোচিত

নিউজিল্যান্ড প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন তাঁর দেশে জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিরও বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বলেছেন, সে একজন সন্ত্রাসী, একজন অপরাধী, একজন চরমপন্থী। আমার কাছে সে বেনামীও। সবার কাছে অনুরোধ, যাঁরা হারিয়ে গেলেন তাঁদের নাম বলুন, কিন্তু যার কারণে তাঁরা হারিয়ে গেলেন সেই লোকটির নাম বলবেন না। সে কুখ্যাতি অর্জন করতে চেয়েছিল, কিন্তু আমরা নিউজিল্যান্ডের মানুষ তাকে কিছুই দেব না, এমনকি তার নামও না।’

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে হামলার পর দেশটির প্রথম পার্লামেন্ট অধিবেশনে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি সম্মাননার নজির দেখিয়েছেন এই সহৃদয় প্রধানমন্ত্রী। মঙ্গলবারের বিশেষ এ অধিবেশনে উপস্থিত নিশ্চিত করা হয় নিউজিল্যান্ডের মুসলিম কমিউনিটির নেতাদের। তাদের প্রতি ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে পার্লামেন্টে তাঁর ভাষণ শুরু করেন। এর আগে অধিবেশনের শুরুতে কোরান তেলাওয়াত ও ইংরেজীতে তার অনুবাদ পাঠ করে শোনানো হয়। হামলাকারীর বিরুদ্ধে ‘নিউজিল্যান্ডের আইনের সব শক্তি প্রয়োগ করা হবে’ বলেও পার্লামেন্ট সদস্যদের আশ্বস্ত করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী। নিহতদের স্মরণে আজ শুক্রবারও নেয়া হয়েছে বিশেষ কর্মসূচী।

রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকা রাখার জন্য বিশ্ববাসীর ভালবাসা ও শ্রদ্ধা পাবেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে শেখার আছে বহু দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের। এটা তো স্পষ্টই যে, বিশ্বের দু-তিনটি দেশের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে নানা সময় বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার প্রতি পরোক্ষ সমর্থন দেখা গেছে। আমরা আশা করব, বিশ্বের সব দেশের শাসকেরা তার নিজ নিজ দেশে জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন।

মসজিদে বা মন্দিরে আগেও নারকীয় সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেছে। তবে নিউজিল্যান্ডের দুটি মসজিদে গত শুক্রবার জুমার নামাজ আদায়ের সময় হামলার যে ঘটনা ঘটে সেটি ব্যতিক্রম। এর বৈশিষ্ট্য ও নেপথ্যের ‘মতাদর্শ’ জানতে পেরে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়তে হয়। জঙ্গী হামলাকারী ব্রেনটন হ্যারিসন টারান্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই নারকীয় তা-বের ভিডিও গ্রহণ এবং তা সম্প্রচারের ব্যবস্থা আগেভাগেই নিয়ে রেখেছিলেন। তার হত্যাকা- সংঘটনের নেপথ্যে কেবল ধর্মীয়বিদ্বেষ নয়, ছিল বর্ণবিদ্বেষও। নিজেকে শ্বেতাঙ্গ খ্রীস্টান হিসেবে দম্ভ প্রকাশে তার আধিপাত্যবোধের অহঙ্কার রয়েছে।

সারা বিশ্বে ধর্ম পালনকারী মুসলিমদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ছড়ানো হচ্ছে যে, তারা জঙ্গী। নিউজিল্যান্ডের ঘটনা বিশ্বের বর্ণবিদ্বেষ ও ভিন্নধর্মীদের প্রতি বিদ্বেষের বাস্তবতাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। কোন ধর্মেরই মূল সুর ধ্বংসাত্মক নয়, বরং সব ধর্মই শান্তির কথা বলে। শান্তি ও মানবতার ললিত বাণী সৃজনশীলভাবে প্রতিটি দেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে কী উপায়ে পৌঁছানো যায় এবং উগ্রপন্থার সব ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা রোধ করা যায় সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। এজন্য ধর্মীয়গুরু, দার্শনিক ও রাষ্ট্রনায়কদের সচেতন উদ্যোগ সবচেয়ে বেশি জরুরী। নিজ নিজ দেশের সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ওইসব রাষ্ট্রের শাসকদের অবশ্য কর্তব্য। এক্ষেত্রে সামান্যতম শিথিলতা ও অসতর্কতার কোন সুযোগ নেই। খ্রীস্টান সংখ্যাগুরু দেশে খ্রীস্টান জঙ্গীরা কোন ধরনের ছাড় পাবে নাÑ এমনটাই ছিল প্রত্যাশিত। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী শুধু সে দেশটির রাষ্ট্রনায়কসুলভই নন, তিনি একজন বিশ্বনেতাসুলভ ভূমিকাও রেখেছেন। তাকে ধন্যবাদ।