১৮ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ডাকসু নির্বাচন ও একটি রাজনৈতিক সমীক্ষা

  • কবীর চৌধুরী তন্ময়

ছাত্ররাজনীতি বা ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সবারই ভিপি হওয়ার আশা-স্বপ্ন থাকে। কিন্তু এই ভিপি পদে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন কী কারণে নুরুল হক নুরুর চেয়ে ১ হাজার ৯৩৩ ভোট কম পেয়েছে এটি নিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে গবেষণা করার চেষ্টা করেছি। ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল এমন অনেক সাবেক ও বর্তমান ছাত্রনেতার সঙ্গে কথা বলেছি। আবার ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এমন ছাত্র নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছি। কথা বলেছি সাধারণ শিক্ষার্থীর সঙ্গেও। জানার চেষ্টা করেছি, বোঝার চেষ্টা করেছি, ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইন ডাকসু নির্বাচনে ১৫ হাজার ৩০১টি ভোট পেয়ে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন।

তাহলে ডাকসু নির্বাচনে ব্যক্তির জনপ্রিয়তা দেখে ভোট দিয়েছে? নাকি এখানে অন্যকিছু কাজ করেছে- এটি খোঁজার জন্য আমাকে আরও কিছু গ্রহণযোগ্য নেতাকর্মীর ভেতরে ঢুকতে হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে আমার নিজস্ব কিছু প্রিয় সংবাদকর্মীর সঙ্গে একান্তভাবে আলোচনা করেও বিস্তারিত বোঝার চেষ্টা করেছি।

জানা যায়, ভিপি পদে ছাত্রলীগের প্রার্থীর পরাজয়ের পেছনে রয়েছে সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, গ্রুপিং-লবিং, যাতে সাবেক ও বর্তমান অনেক ছাত্রলীগ নেতাই শোভনের পক্ষে কাজ করেনি। আবার অনেকে মনে করছে, বর্তমান কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সভাপতি হচ্ছেন উত্তরবঙ্গের। এই কারণে দক্ষিণবঙ্গের কতিপয় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর সঙ্গে শুধু মানসিক দূরত্বই সৃষ্টি হয়নি, সৃষ্টি হয়েছে রাজনীতিরও। ছাত্রলীগের জন্য সবাই অন্তঃপ্রাণ বলা হলেও মূলত ভেতরে ভেতরে আঞ্চলিকতার কারণে গ্রুপিং-লবিংয়ের কারণে নির্বাচনে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।

আঞ্চলিকতার অভিযোগটি আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে সিনিয়র এক সাংবাদিকের ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে। তিনি ফেসবুকে লিখেন, ‘আমাদের সময়ে দু’দুটি ডাকসু নির্বাচন, ছাত্র রাজনীতি, শিক্ষক রাজনীতি দেখার অভিজ্ঞতায় জানি- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বরিশাল গ্রুপের কোন নির্দিষ্ট দল নেই’। অন্যদিকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বললে একজন তার মোবাইল থেকে নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুরুর একটি ভিডিও দেখিয়ে বলেন, কুয়েত মৈত্রী হলে ‘জাল ভোটের ব্যালট পেপার’ উদ্ধার হওয়ার গুজব বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মনে ছাত্রলীগ সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করেছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই গুজব ছড়িয়ে পড়ায় এবং কতিপয় অনলাইন মিডিয়া যাচাই না করে এই গুজবের তথ্য প্রকাশ করায় এটি ভোটারকে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য করেছে।

ভিডিওতে নুরুল হক নুরু নিজে ঘুরতে ঘুরতে পড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখিয়ে ওই শিক্ষার্থী আরও বলেন, নুরুল হক নুরু ক্যাম্পাসে প্রহৃত হয়েছেন- এমন অপপ্রচার-গুজবেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে নুরুর প্রতি ‘সিমপ্যাথি’ জন্ম হয়েছে, যা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে নুরুকে ভোটদানে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, কোটা সংস্কার আন্দোলনে যেভাবে গুজব ছড়ানো হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবি সিদ্দিককে হত্যা করা হয়েছে মর্মে যেসব গুজব-মিথ্যাচারের প্রচার ঘটিয়েছে, এখান থেকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কি কোন শিক্ষা গ্রহণ করেছে? এ ধরনের গুজব যে ডাকসু নির্বাচনেও করবে না- এটা নিয়েও কি ছাত্রলীগের কোন প্রস্তুতি ছিল? আবার আঞ্চলিকতার চেয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি, বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার প্রতি দায়িত্ববান হওয়া নিয়ে ডাকসুকে ঘিরে আঞ্চলিক ওইসব নেতাকে নিয়ে আলোচনা, আহ্বান, আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল?

ছাত্রলীগের সিনিয়র নেতা যারা সরাসরি ডাকসুর নির্বাচনে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছে, নীতি নির্ধারণী ফোরামে ছিল এবং ডাকসুর নির্বাচনে যারা অংশগ্রহণ করেছে তাদের সবার একটা কথা ভাল করেই জেনে রাখার দরকার ছিলÑ গুজব, অপপ্রচার, মিথ্যাচার বর্তমানে এক শ্রেণী মানুষের কাছে বিভ্রান্ত করার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর কোটা সংস্কার আন্দোলন আর নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে গুজব-অপপ্রচার, মিথ্যাচারকে একটা সময় সত্য তথ্য-উপাত্ত দিয়ে মোকাবেলা করতে পারলেও তাৎক্ষণিকভাবে একটা শ্রেণী বিভ্রান্ত হয়েছিল। আওয়ামী লীগের অফিসে কথিত ছাত্রীকে ধর্ষণ, হত্যা করে লেকের পানিতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে-এমন মিথ্যাচারে তাৎক্ষণিক বিভ্রান্ত হয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা আওয়ামী লীগের অফিসে ঢুকে বিস্তারিত দেখতে বাধ্য করেছিল এই ‘অপপ্রচার’ বা ‘গুজব’।

অর্থাৎ তাৎক্ষণিকভাবে বিভ্রান্ত হলেও ‘গুজব’ ‘একটা সিদ্ধান্ত’ গ্রহণে বাধ্য করে। আর এই বিভ্রান্ত হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে ‘ক’-এর জায়গায় ‘খ’-কে ভোট প্রদান করলে তা আর সংশোধন করার কোন সুযোগ থাকে না, যা ডাকসুর নির্বাচনের অনেক ক্ষেত্রেই তাই হয়েছে।

ডাকসুর নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুরুকে এখন অনেকেই ছাত্রলীগের কর্মী বলা বা বানানোর চেষ্টা করছে। আবার সোশ্যাল মিডিয়াতে সেই প্রমাণপত্রও ভাইরাল করেছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি এবং সেই কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে নুরুদের পুরো টিমের আদর্শগত এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি জানার চেষ্টা করেছি। এবং ২০১৮ সালের ২৯ এপ্রিল জনকণ্ঠে ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন টার্গেট কারা?’-শিরোনামে প্রকাশিত লেখায় আমি বিস্তারিত তুলে ধরারও চেষ্টা করেছি। আমার জানা মতে, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ইতিহাসে সোহাগ-নাজমুলের হাত দিয়ে সৃষ্টি আরেক সোহাগ-জাকির ছাত্রলীগের কমিটি এতটাই বিতর্কিত ও সিন্ডিকেট নির্ভর হয়ে উঠেছিল, যা উপলব্ধি করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা এই ছাত্রলীগকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ছাত্রলীগে ফিরিয়ে নিতে দায়িত্ব হাতে তুলে নিয়েছিলেন। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায়, ২০১৬ সালে ২১ মে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অফিসিয়াল প্যাডে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদনকৃত স্বাক্ষরে দেখা যায়, একজন সহ-সভাপতি ও কয়েকজন নেতার নামের পাশে ব্র্যাকেট করা ‘ব ব হল’ এবং আরেকজনের পাশে ব্র্যাকেট করা ‘জিয়া হল’ উল্লেখ করেছে। ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে আমি এটির প্রতিবাদ করে জানিয়েছিলাম, এটি লজ্জার বিষয়। বঙ্গবন্ধুর নামের জায়গায় ‘ব ব’ লিখলেও তারা কিন্তু জিয়ার নামের ক্ষেত্রে কেউ ভুল করেনি (!) যা অনেক গণমাধ্যম ওই স্ট্যাটাস নিয়ে আমার অনুমতিক্রমে ‘বঙ্গবন্ধু লিখতে ছাত্রলীগের ‘চরম অনীহা’- শিরোনামে তখন এটি তুলে ধরেছে। বিতর্ক শুধু এখানে নয়, সংগঠনটি কেন্দ্রীয় থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, জামায়াত ঘরানার লোকদের ছাত্রলীগের পদ-পদবি দিয়েছে এমন বহু অভিযোগ রয়েছে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ তখন কী কারণে এই ধরনের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে? এখানে তদবির-লবিং ছিল কতটা? নাকি সিনিয়র কোন নেতার প্রচ- চাপ তারা উপেক্ষা করতে পারেনি- এটা তখনকার নেতৃত্বই ভাল বলতে পারবেন। কিন্তু আমার প্রশ্ন, ছাত্রলীগের কমিটিতে নাম লেখালেই কি তাদের জন্মগত আদর্শ আর রাজনৈতিক দর্শন রাতারাতি পরিবর্তন হবে বা হওয়া সম্ভব? ইতিহাস কি বলে...?

আমার মতে, ডাকসুর নবনির্বাচিত নুরুল হক নুরু কখনই বঙ্গবন্ধুর ছাত্রলীগের আদর্শ ধারণ করেনি, ধারণ করে না। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় এই নুরু বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে কথা বলেছে। ভিন্ন মত আর বাক স্বাধীনতার নামে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে কটূক্তি করেছে নুরুর সহযোদ্ধারা। ‘আমি রাজাকার’ বলে তখনই নিজেদের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরেছে।

আমরা জানি, ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৭ সালেই এই কোটা ব্যবস্থাকে আরও সম্প্রসারিত করে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের-এর আওতাভুক্ত করেন। নতুন করে যোগ করেন এক শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটা। আর তখন এর প্রতিবাদ করেন জামায়াত-শিবির যার ধারাবাহিকতা এখনও চলছে। আর কোটা সংস্কার আন্দোলনে তখনকার কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কী ভূমিকা ছিল- এটিও আওয়ামী লীগসহ সাবেক ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মী ভাল করেই অবগত আছে বলে আমার বিশ্বাস। ডাকসুর নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুরু ১২ মার্চ বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘ছাত্রলীগ একটা গুজবের সংগঠন। তারা সব সময় শুধু গুজব ছড়ায়’! নুরু ছাত্রলীগ করলে বা ছাত্রলীগের আদর্শ ধারণ করলে নিশ্চয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ইতিহাস-ঐতিহ্য জানা থাকত, পড়াশোনা থাকত। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে- এই নুরু গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে উপস্থিত বক্তব্যে বলেন, একটা সময় সেও ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছেন। শুধু তাই নয়, যে শেখ হাসিনাকে নিয়ে কটূক্তি করেছিলেন সেই শেখ হাসিনার মাঝে নুরু তার মায়ের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাচ্ছে!

আমাদের বুঝতে হবে, ব্যক্তিগত স্বার্থ আর ক্ষণিকের প্রাপ্তির আশায় শুধু সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী গোষ্ঠীকেই নয়, একজন বিতর্কিত অক্ষম মানুষকেও সক্ষম করে গড়ে তুললে, বিশ্বাস করলে একটা সময় নিজের জায়গাটাই ছেড়ে দিতে বাধ্য হতে হয়। আর সেখান থেকেই উত্থান হয় খন্দকার মোশতাকদের।

নানা আলোচনা-সমালোচনা মধ্য দিয়ে ডাকসু নির্বাচন-২০১৯ সম্পন্ন হয়েছে। এখান থেকে সকল ছাত্রছাত্রী ও ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছাত্রনেতাদের শিক্ষা নেয়ার পটভূমি তৈরি হয়েছে। ব্যক্তি স্বার্থ, আঞ্চলিকতা, গ্রুপিং-লবিং, রাগ-ক্ষোভ-অভিমানের চেয়েও দলীয় স্বার্থ, সংগঠনের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কী রেখে যাওয়া হচ্ছে- ছাত্রনেতারা নিশ্চয় এটি বিচার-বিশ্লেষণ করবে এবং সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও ২৮ বছর পর নতুন করে ভাবতে, সময় উপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও ঢেলে সাজাতে সুযোগ পাবে বলে মনে করছি।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন

এ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম (বোয়াফ)

kabir_tanmoy@yahoo.com