২০ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঘনচিনি ও স্যাকারিন মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে সফ্্ট ড্রিংকস

ঘনচিনি ও স্যাকারিন মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে সফ্্ট ড্রিংকস
  • বাহারি নামে এনার্জি ড্রিংকস

শাহীন রহমান ॥ দেশে শৌখিন খাদ্যপণ্য হিসেবে পরিচিত কার্বোনেটেড বেভারেজ। যা কোমল পানীয় বা সফ্ট ড্রিংক হিসেবে পরিচিত। রসনা বিলাস খাবারের তালিকায় কোমল পানীয়ের আবশ্যিক ব্যবহার রয়েছে দেশে। এর বাইরের বিভিন্ন ঘরোয়া বা সামাজিক অনুষ্ঠানে এটির অধিক ব্যবহার করতে দেখা যায়। দেশে বৈধভাবে যেমন সফ্ট ড্রিংকস উৎপাদন ও বাজারজাত করা হচ্ছে, তেমনি অনুমোদন ছাড়াও নিম্নমানের উপকরণ মিশিয়ে কোমল পানীয় তৈরির অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি সফ্ট ড্রিংকস এবং এনার্জি ড্রিংকস উৎপাদন ও বিপণন নিয়ে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি।

বিএসটিআইয়ের অভিযানে দেখা গেছে, রাজধানীর ঢাকার বেশি কিছু স্থানে অনুমোদনহীন এসব কার্বোনেটেড বেভারেজ কোম্পানি রয়েছে। যেখানে ঘনচিনি ও স্যাকারিন মিশিয়ে তৈরি করা হয় এই সফট ড্রিংকস। অত্যন্ত নোংরা পরিবেশে পাউডার বানিয়ে ড্রামে ভরে রাখা হয়। এগুলো পরে জমাট বেঁধে গন্ধযুক্ত হয়। এর মধ্যে চিনির গুঁড়া ও রং মিশিয়ে তৈরি করা হয় সফট ড্রিংকস। এর মধ্যে কমলার সেন্ট বা আমের সেন্ট দিলে কমলা বা আমের ড্রিংসে পরিণত হয়। বিশেষ করে রাজধানীর উত্তরখান এলাকা, কামরাঙ্গীরচর এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে এমন প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব রয়েছে। বিভিন্ন সময় এদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হলেও সুযোগ বুঝে আবার নকল সফ্ট ড্রিংকসের উৎপাদন শুরু করে দেয়। নকল ও নি¤œমানের সফ্ট ড্রিংকসমূলত গ্রাম এলাকায় পাঠানো হয়। স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েদের কাছে এটি অতি লোভনীয়।

আবার সম্প্রতি এনাজি ড্রিংকস নিয়েও শুরু হয়েছে নানা বিতর্ক। বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তারা অবশ্য জানিয়ে দিয়েছেন দেশে এনার্জি ড্রিংকস উৎপাদন ও বিপণনের অনুমোদন নেই। মূলত কার্বোনেট বেভারেজ হিসেবে সফ্ট ড্রিংকসের উৎপাদনের অনুমোদন রয়েছে। তবে জানা গেছে দেশে এনার্জি ড্রিংকসের উৎপাদন না থাকলেও এক শ্রেণীর উৎপাদন এবং বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান বিক্রির আশায় সফ্ট ড্রিংকস পণ্যের বিজ্ঞাপনে ব্যাপকভাবে এনার্জি ড্রিংকস উল্লেখ করছে। আর এ নিয়ে দেখা দেয় বিভ্রান্তি। তবে বিএসটিআই বলছে অতিমাত্রায় ক্যাফেইন থাকায় তারা আগেই এনার্জি ড্রিংকস উৎপাদনের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। ফলে দেশে এই পণ্য উৎপদনের কোন সুযোগ নেই। যারা সফ্ট ড্রিংকসকে এনার্জি ড্রিংকস হিসেবে বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করেছেন সেসব প্রতিষ্ঠানকে ইতোমধ্যে সতর্ক করা হয়েছে।

বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তারা জানান, যে কোন ড্রিংকস উৎপাদন ও বোতলজাতের ক্ষেত্রে প্রথম শর্তই হচ্ছে অটো মেশিনে সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করা। নির্ধারিত ১২০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তরল উপকরণগুলো ফুটিয়ে নিয়ে তা রিফাইন করার মাধ্যমে সংমিশ্রণ ঘটানো এবং বোতলজাত করা থেকে মুখ লাগানো পর্যন্ত সবকিছুই অটো মেশিনে ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন হওয়ার কথা। কিন্তু কথিত জুস, নিম্নমানের ড্রিংকস উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলোর কারখানাগুলোতে সবকিছুই চালানো হচ্ছে হাতুড়ে পদ্ধতিতে। ন্যূনতম মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা সেখানে নেই।

বিএসটিআই কর্মকর্তারা জানান, উচ্চমাত্রায় ক্যাফেইন থাকার কারণেই মূলত দেশে কোন প্রতিষ্ঠানে এনার্জি ড্রিঙ্কস উৎপাদন ও বাজারজাতের অনুমোদনই দেয়া হয়নি। ক্ষতিকর বিবেচনায় এই পণ্যের মান নির্ধারণ না করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সফ্ট ড্রিংকস নামে যেসব পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করা হচ্ছে তা হলো কার্বোনেটেড বেভারেজ। এসব পণ্যের বিজ্ঞাপনে এনার্জি ড্রিংকস শব্দ উল্লেখ করায় বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। কার্বোনেটেড বেভারেজ কোন এনার্জি ড্রিংকস পণ্য নয়। অথচ অনেক প্রতিষ্ঠান পণ্যের গায়ে এনার্জি ড্রিংকস উল্লেখ করছে। এটি এক ধরনের অপরাধ। এর বিজ্ঞাপনে ও পণ্যের গায়ে ‘এনার্জি ড্রিংকস’ উল্লেখ না করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়ে সতর্কও করে দেয়া হয়েছে। তারা বলেন, দেশে কোন প্রতিষ্ঠান এনার্জি ড্রিংকস উৎপাদন করছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এনার্জি ড্রিংকসে উচ্চ মাত্রার ক্যাফেইন থাকে, যা এ দেশে অনুমোদিত নয়। পাশাপাশি টরুইনন ও ইনোসিটল রয়েছে। এটি পান করলে দেহের ব্লাড সার্কুলেশন বা রক্তসঞ্চালন বেড়ে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এছাড়া এটি শিশু ও গর্ভবতী মহিলাদের পান করাও নিষিদ্ধ।

বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রতিটি পণ্যেরই একটি আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড থাকে। সে অনুযায়ী দেশে পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করার আগে বিএসটিআই থেকে মান নির্ধারণ করা হয়। মান নির্ধারণের পরেই কেবল তা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে উৎপাদন ও বাজারজাত করতে অনুমোদন বা লাইসেন্স দেয়া হয়ে থাকে। বিএসটিআই মান নির্ধারণ না করলে দেশে এসব পণ্যের বৈধ উৎপাদন ও বাজারজাতের কোন সুযোগ নেই। আবার বিদেশ থেকে আমদানির অনুমতিও বিএসটিআই কাউকে দেয়নি। বিএসটিআইয়ের সহকারী পরিচালক একেএম হানিফ বলেন, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সমন্বয় করেই দেশে কার্বোনেটেড বেভারেজ উৎপাদনের জন্য লাইসেন্স দেয়া হয়ে থাকে। এটি স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর নয়। এনার্জি ড্রিংকস নামে কোন পণ্য দেশে উৎপাদন ও বাজারজাত করার কোন অনুমতি বিএসটিআই কাউকে দেয়নি।

তবে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বলছেন প্রতি বছর কার্বোনেটেড বেভারেজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মান পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। এর বাইরে অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা বিএসটিআইয়ের কাছ থেকে কোন ধরনের অনুমোদন না নিয়েও এজাতীয় পণ্য উৎপাদনও বিপণন করে থাকে। তাদের বিরদ্ধে আগেও অভিযান চালানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তারপরও অনেকে অনুমোদন না নিয়ে এই ধরনের পণ্য উৎপাদন করে যাচ্ছে যা নিরাপদ খাদ্য আইনে অপরাধ।

তবে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বিএসটিআইয়ের অনুমোদন ছাড়া যারা কার্বোনেটেড বেভারেজ পণ্য উৎপাদন করছে তারাই মূলত পণ্যের গায়ে এনার্জিং ড্রিংকস নাম দিয়ে বিক্রি করে থাকে। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে হাতে নাতে ধরছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এতে দেখা গেছে এসব পণ্যের আপত্তিকর নামও ব্যবহার করা হয়। যেমন সেপিড এনার্জি ড্রিংকস, বেয়ার এনার্জি ড্রিংকসসহ বাহারি নামও ব্যবহার করা হয়।