২০ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অগ্নিঝরা মার্চ

অগ্নিঝরা মার্চ

শাহাব উদ্দিন মাহমুদ ॥ আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিল। জনসাধারণ প্রতিদিন স্বতঃস্ফূর্তভাবে মিছিল, সভা-সমাবেশ করে যাচ্ছিল। সব মিছিলের মুখ মিলছিল ধানমন্ডির ৩২নং সড়কে। এদিন সম্পর্কে দৈনিক পূর্বদেশ লিখেছে, ‘আজ ২২শে মার্চ শপথে শপথে প্রদীপ্ত দিন। প্রহরগুলো শুধু নয়, প্রতিফল যেন সংগ্রামের দুর্জয় প্রত্যয়ের এক একটি মৃত্যুঞ্জয় পতাকা হয়ে ৩২ নম্বর সড়ককে আন্দোলিত করেছে। এত প্রাণাবেগ, এত ভাবাবেগ, একদিনে এতবার এসে সঞ্চারিত হয়নি। জনতার এত জোয়ার এর আগে আছড়ে পড়েনি’। অসহযোগ আন্দোলনের ২১তম দিবস। জয় বাংলা সেøাগানে মুখরিত হাজার হাজার মানুষ বঙ্গবন্ধু বাসভবনের দিকে দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে যায়। বাসভবনে সমবেত জনতার উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বেশ কয়েকবার বক্তৃৃৃতা দেন। সংগ্রামী জনতার গগণবিদারী ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ ধ্বনি ও করতালির মধ্যে জনগণের নেতা ঘোষণা করেন, বন্দুক, কামান, মেশিনগান কিছুই জনগণের স্বাধীনতা রোধ করতে পারবে না। বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে শিশুকিশোরদের এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে শিশুকিশোররা বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করে। পল্টন ময়দানে সশস্ত্র বাহিনীর প্রাক্তন বাঙালী সৈনিকরা এক সমাবেশ এবং কুচকাওয়াজের আয়োজন করেন। সমাবেশে বক্তারা বলেন, বাংলার নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যে অভূূতপূর্ব ঐক্য গড়ে উঠেছে তাতে প্রক্তন সৈনিকরা আর প্রাক্তন হিসেবে বসে থাকতে পারে না। আমাদের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের মূল্যবান সম্পদ। আমরা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ পালনে প্রস্তুত। ধানম-িতে মার্কিন কনসাল জেনারেলের বাড়িতে বোমা ছোড়া হয়। ঢাকার কয়েকটি সংবাদপত্রে বাংলার স্বাধিকার শিরোনামে ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়। প্রথম পাতায় স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র-খচিত পতাকা। এ ক্রোড়পত্রে বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষরিত একটি বাণী এবং অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ, রেহমান সোবহান, এ এইচ এম কামারুজ্জামান প্রমুখের প্রবন্ধ ছাপা হয়। আন্দোলনের অংশ হিসেবে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে কবিতা পাঠের আসরে অংশ নেন আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান হাসান হাফিজুর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, ফজল শাহাবুদ্দিন, আলাউদ্দিন আল আজাদ, দাউদ হায়দার ও অন্যান্যরা। বিভিন্ন সংবাদ পত্রিকাগুলোর শিরোনাম ও খবরে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সকালে ২৫ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করে বলেন, পাকিস্তানের উভয় অংশের নেতৃবৃন্দের মধ্যে আলোচনাক্রমে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের পরিবেশ সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টির জন্য ২৫ মার্চের অধিবেশন স্থগিত রাখা হয়েছে। সকালে রমনার প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও জুলফিকার আলী ভুট্টো আলোচনা বৈঠকে মিলিত হন। এটা ছিল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ষষ্ঠ দফা বৈঠক। বৈঠক প্রায় সোয়াঘণ্টা স্থায়ী হয়। প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে নিজ বাসভবনে ফিরে আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, আমরা আন্দোলনে আছি এবং লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। দুপুরে প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে কড়া সামরিক প্রহরায় হোটেলে ফিরে ভুট্টো তাঁর উপদেষ্টাদের নিয়ে বৈঠকে বসেন। এই বৈঠক শেষে ভুট্টোর নেতৃত্বে পিপলস পার্টি নেতৃবৃন্দ সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ভবনে যান। সেখানে ভুট্টো ছাড়াও পশ্চিম পাকিস্তানের নেতা মমতাজ দৌলতানা, ওয়ালি খান, মুফতি মাহমুদ মীর, গাউস বক্স, সর্দার হায়াত খানের সঙ্গে ইয়াহিয়ার পৃথক পৃথক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখান থেকে ফিরে ভুট্টো হোটেল লাউঞ্জে এক অনির্ধারিত সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, প্রেসিডেন্ট এবং আওয়ামী লীগ প্রধান বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনের জন্য একটি সাধারণ ঐকমত্য পৌঁছেছেন। তবে ওই ঐকমত্য অবশ্যই পিপলস পার্টির কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। পিপলস পার্টির অনুমোদন ছাড়া কোন সিদ্ধান্ত পশ্চিম পাকিস্তানীরা মেনে নিতে পারে না। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান রাতে ২৩ মার্চ ‘পাকিস্তান দিবস’ উপলক্ষে প্রদত্ত এক বাণীতে বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মিলে-মিশে একসঙ্গে কাজ করার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। পাকিস্তান এখন এক ক্রান্তিলগ্নে উপনীত। গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনের পথে অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে গেছে। তবে আমরা যদি আমাদের লক্ষ্যে অবিচল থাকি তাহলে কোন কিছুই আমরা হারাব না।