২০ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বদলে যাচ্ছে সদরঘাটের দৃশ্যপট

বদলে যাচ্ছে সদরঘাটের দৃশ্যপট
  • ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ

সালাহ্উদ্দিন মিয়া, কেরানীগঞ্জ ॥ রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল সম্প্রসারণ, আধুনিকায়ন ও নৌ দুর্ঘটনা এড়ানোর পাশাপাশি কেরানীগঞ্জবাসীর নদী পারাপারের জন্য মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। গত ৭ মার্চ বৃহস্পতিবার রাতে সদরঘাটে একটি লঞ্চের ধাক্কায় নৌকায় থাকা একই পরিবারের ৭ জন নিহতের পর নৌ দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য গত ১২ মার্চ মঙ্গলবার বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সদরঘাট থেকে কেরানীগঞ্জের ১০০ বছরের পুরনো জেলা পরিষদ মার্কেটঘাট (গুদারাঘাট) ও লালকুঠিঘাট থেকে তেলঘাট দুটি বন্ধ করে দেয়। সেদিন সকালে সদরঘাট বরাবর চারটি নতুন পন্টুন বসিয়ে দেয় সংস্থাটি। সদরঘাটে খেয়া নৌকা চলাচলের জন্য ১০০ বছরের পুরনো ঘাট স্থানান্তর করে বিনাস্মৃতিঘাটে ও লালকুঠিঘাটটি স্থানান্তরিত হয়েছিল শ্যামবাজার ঘাটে। আর এতেই বাদ সেধেছিল কেরানীগঞ্জের গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ও দোকান মালিক বহুমুখী সমবায় সমিতি, নৌকার মাঝি, শ্রমিক ও সাধারণ জনগণ। সদরঘাটের খেয়া নৌকা পারাপারের ঘাটটি বহাল রাখার জন্য ২ দিন বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করে কেরানীগঞ্জ তৈরি পোশাক শ্রমিক ও মালিক সমবায় সমিতি ও সাধারণ জনগণ। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৩ মার্চ বুধবার বিকেলে সদরঘাট এলাকা পরিদর্শন করেন নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ ও স্থানীয় সংসদ সদস্য বিদ্যুত প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। নতুন যে চারটি পন্টুন বসানো হয়েছে তা আবার তাদের নির্দেশেই সরিয়ে খেয়াঘাট আপাতত চালু করা হয়। ওই দিন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নৌ পরিবহনের জন্য আমরা ১০ হাজার কি.মি রাস্তা তৈরি করে নতুন মাত্রা যোগ করতে চাই। সদরঘাটের বেহাল দশা পরিবর্তনের জন্য ব্যবসায়ীদের স্বার্থ, শিক্ষার্থীদের স্বার্থ ও সাধারণ মানুষের স্বার্থ অক্ষুন্ন রেখে স্থায়ীভাবে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে এবং অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে কারও সঙ্গে কোন ধরনের আপোস করা হবে না।

এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য বিদ্যুত প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, কেরানীগঞ্জবাসীর যাতে কোন ধরনের সমস্যা না হয় সে জন্য সুন্দর একটি মহাপরিকল্পনা করে একটি আধুনিক ঘাট নির্মাণ করা হবে যাতে সবারই লাভ হয়।

ঢাকা শহরের চারপাশে যে নদীগুলো রয়েছে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর তীর ঘিরে উচ্চ আদলতের নির্দেশে দখল ও দূষণ রোধে বিআইডব্লিউটিএ গত ২৯ জানুয়ারি থেকে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। নদীর তীরবর্তী জায়গাগুলো সংরক্ষণ না করলে সরকারের যে বৃহৎ পদক্ষেপ আছে কোনভাবেই তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। নৌ দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য ফতুল্লা ভিজি মুখ থেকে শুরু করে বাবুবাজার ব্রিজ পর্যন্ত ব্যাপক উন্ন্য়নের কাজ হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ। ঢাকা শহরকে যানজট মুক্ত ও নদীর পাড়কে সৌন্দর্যবর্ধন করার জন্য নদীর দুই তীরে ৫২ কি.মি রাস্তা তৈরি করার প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এছাড়াও এ প্রকল্পে থাকছে ৩ টি ইকোপার্ক, সবুজায়ন, ওয়াকওয়ে, আরসিসি ওয়াল, স্টেপিং, পার্কিংসহ বিভিন্ন ধরনের সৌন্দর্যবর্ধন কর্মকা-। প্রকল্পটির নাম দেয়া হয়েছে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালুনদীর তীরভূমিতে পিলার স্থাপন, তীররক্ষা, ওয়াকওয়ে ও জেটিসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ (২য় পর্যায়) শীর্ষক প্রকল্প। প্রকল্পের জন্য ৮ হাজার ৫শ’ কোটি টাকাও বরাদ্দ করা হয়েছে। এর আগেও ২০ কি.মি ওয়াকওয়ে ও ১ টি ইকোপার্ক নির্মাণ করা হয়েছে শ্যামপুরে। মূলত এ প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই উচ্ছেদ অভিযান চলছে। ইতোমধ্যে সদরঘাট নৌ টার্মিনালে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আগে পার্কিং ছিল না, বর্তমানে বিশাল পার্কিং ইয়ার্ড করা হয়েছে। যাত্রী নিরাপত্তার জন্য তৈরি হয়েছে সুন্দর আধুনিক ওয়েটিং লাউঞ্জ। আগের খেয়া নৌকা ঘাটটি বর্তমানে যথাস্থানে রাখা হলেও উন্নত ও আধুনিক ঘাট নির্মাণ করা হলে তা একটু এদিকসেদিক করে বসানো হবে। যাতে করে ব্যবসায়ী, শ্রমিক, মাঝি, ছাত্রছাত্রীসহ সর্বসাধারণের সুবিধাই হয় সে ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হবে। আধুনিক ঘাট নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত আগের ঘাট দিয়েই নৌকা পারাপার হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে একটি অন্তর্বর্তী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে জনকণ্ঠকে জানিয়েছেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ডেপুটি ডিরেক্টর মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, খেয়া নৌকার দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য লঞ্চ মালিকদের অবহিত করে দিয়েছেন লঞ্চ ছাড়ার পূর্বে পেছনে হ্যান্ড মাইকিংসহ স্টাফ ও আনসার সিগন্যাল দেবে, তবেই লঞ্চ ছাড়বে। এছাড়া লঞ্চের পেছনে সিসি ক্যামেরা ব্যবহারের নির্দেশও দেয়া হয়েছে এবং বিভিন্ন কমিটি গঠন করে তা তদারকি করা হচ্ছে। এমবি সুন্দরবন-১২ লঞ্চের সুকানি (লঞ্চ চালক) মোঃ জামান হাওলাদারকে নৌ দুর্ঘটনার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, সদরঘাটে অনেক নৌকা লঞ্চের পেছনদিক দিয়ে যাত্রী ওঠা-নামা করার ফলে বিভিন্ন সময় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। এছাড়া বিভিন্ন নদীতে মাছ ধরার জাল ফেলা হয় এবং বিভিন্ন জায়গায় নদীর মধ্যে চর তৈরি হয়, এতে লঞ্চ চলাচলে বিঘœ ঘটে। তার ওপর অনেক জায়গায় বয়া, বয়ার বাতি ও মার্কা নেই। এতেও সুকানিদের অনেক সমস্যা হয় ও দুর্ঘটনা ঘটে। সুকানি জামান আরও বলেন, লঞ্চে আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকা দরকার। যেমন হাইড্রো ও ইলেক্ট্রনিক হুইল, ইকো-সাউন্ড, রাডার, বিএসএফসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকা দরকার, যা দুর্ঘটনা এড়াতে অনেকটাই ভূমিকা রাখে। সদরঘাট নৌ টার্মিনাল সরজমিনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে লঞ্চ ইকুইপমেন্ট আইন আছে কিন্তু তা বাস্তবায়ন নেই। পাশাপাশি চলছে অনভিজ্ঞ চালক দিয়ে লঞ্চ চালানোর কাজ। তথ্যসূত্রে জানা যায়, কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে টাকার বিনিময়ে অদক্ষ লঞ্চ চালকদের ছাড়পত্র দেয়া হচ্ছে। যেখানে কোর্স সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক সেখানে কোন কিছু যাচাই-বাছাই না করেই সুকানি নিয়োগ দেয়া হয়। আর অদক্ষ সুকানির জন্যই ঘটছে নানান মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। প্রাণ হারাচ্ছে শত শত শিশু,মহিলা, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ, মাঝিসহ নানান বয়সের লোকজন।

সদরঘাট খেয়া নৌকা ঘাটের ব্যাপারে, নৌকা মালিক সভাপতি জনকণ্ঠকে বলেন, সরকার যেভাবে কাজ করছে আমরা সার্বিকভাবে সরকারকে সহায়তা করছি এবং আমাদের ঘাটের সকল মাঝিকে কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়ে দিয়েছি যাতে কোন নৌকা লঞ্চের পেছনে যাত্রী ওঠা-নামা না করায়। পাশাপাশি তারা যেন বিভিন্ন ঘাটে এ মর্মে ব্যানারও টানিয়ে দেয়।

ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা সদরঘাটের খেয়া ঘাটটি দিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ লোক তাদের কর্মস্থলে যাতায়াত করে। দেশ-বিদেশসহ প্রায় ৫ লক্ষাধিক ব্যবসায়ী এ ঘাট দিয়েই তাদের মালামাল আনা-নেয়া করে। কেরানীগঞ্জের নদীর পাড়জুড়ে রয়েছে বেশ কয়েকটি জাহাজ শিল্প। পাশাপাশি স্কুল, কলেজ ও হাসপাতালে যাতায়াতের জন্যও সদরঘাটের খেয়া নৌকা ঘাটটি সুবিধাজনক। তাই কেরানীগঞ্জবাসীর একটাই দাবি, ১০০ বছরের পুরনো ঘাট সংরক্ষণ করে সার্বিক কর্মকা- ও ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি স¦াভাবিক রাখা।