২২ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বডি শেমিং ॥ ভিন্ন ধারার সামাজিক পীড়ন

  • তৌফিক অপু

বেশ কিছুদিন ধরেই স্কুলে যেতে অনীহা প্রকাশ করছে অর্ক। ব্যাপারটা এমন পর্যায়ে যে, বাবা মা বকাবকি করেও কোন ফল পাচ্ছে না। কারণ জিজ্ঞেস করতেই অর্ক শুধুই বলে স্কুল তার ভাল লাগছে না। সে অন্য স্কুলে পড়তে চায়। অবস্থা বেগতিক দেখে অর্কের বাবা মা স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। শিক্ষকরা জানায়, অর্ক খুবই মনোযোগী ছাত্র এবং শিক্ষদের সঙ্গে সম্পর্কও খুব ভাল। স্কুলে না আসার কোন কারণ তো তারা দেখছে না। বরং শিক্ষকরাই বেশ চিন্তিত অর্ক কেন স্কুলে আসছে না? কোন ক্লু খুঁজে না পেয়ে অর্কের এক বন্ধুর শরণাপন্ন হয় বাবা মা। সেখান থেকে জানতে পারে ভয়াবহ তথ্যটি। অর্ক নাকি স্কুলের কিছু ক্লাসমেটদের কটূক্তির শিকার। এক কথায় যাকে বলে বডি শেমিং। অর্থাৎ অর্ক একটু মোটা বলে তাকে কিছু দুষ্টু সহপাঠীরা মটু মটু বলে ক্ষেপাতো। এতে অর্ক ক্ষেপে গেলে তারা আরও বেশি মজা পেত। এক পর্যায়ে নাকি অর্ক কান্না করে ফেলত। ব্যাপারটা নাকি অর্ক স্কুলের ক্লাস টিচারকে জানিয়েছে। কিন্তু ক্লাস ব্যাপারটা বেশ হাসিরছলেই উড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু দিনের পর দিন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি অর্ক মেনে নিতে পারেনি। হয়তো এ কারণেই অর্ক স্কুলে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। কথাগুলো শুনে বাবা মা ও বেশ অবাক। এত সামান্য একটা ব্যাপার নিয়ে অর্ক স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিতে পারে তা তাদের ধারণাতেই আসেনি। বাসায় গিয়ে অর্ক কে জিজ্ঞেস করাতেই সে বলে উঠল ওই দুষ্টু ছেলেরা ক্লাসে থাকলে সে আর স্কুলে যাবে না। এমন গো ধরল যে শেষমেশ অর্ক কে নিয়ে মানসিক ডাক্তারের কাছে যেতে হলো। সেখানে গিয়ে যেন ভুল ভাঙল বাবা মা’র। ডাক্তার জানালেন ব্যাপারটা মোটেও হালকা করে নেয়ার মতো বিষয় নয়। হাসি ঠাট্টার এই কটূক্তি অর্কের মনে দাগ কেটেছে ভীষণভাবে। আর এভাবে তা বাড়তে থাকলে তৈরি হবে পড়ালেখার প্রতি অনীহা এবং ধীরে ধীরে তা রূপ নিবে বিষণœতায়। যা জীবনকে হুমকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।

মানুষের শারীরিক আকৃতি, গঠন ও রঙ রূপ নিয়ে ঠাট্টা বা নেতিবাচক মন্তব্য করাকেই বলা হয় বডি শেমিং। এটাও একধরনের সামাজিক ব্যধি। কিন্তু কেউ যেন তা আজও আমলে নেয়নি। আর না নেয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে এর চর্চা আমাদের দেশে কম বেশি প্রায় প্রতিটি ঘরেই হয়ে থাকে। যে কারণে এটা যে ব্যাধি তা কেউ অনুধাবন করতে পারছে না। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা বখাটে কিছু ছেলে ছোকড়াদের শিস বাজানো, মেয়ে দেখলে উত্ত্যক্ত করা যে অপরাধ সেটাও বুঝি আমাদের সমাজ আবিষ্কার করেছে এই কিছুদিন হলো। যে কারণে এখন টিভি কিংবা পত্রিকায় বেশ ফলাও করে প্রচার হয় ইভটিজিং একটি সামাজিক ব্যাধি। ঠিক তেমনি বডি শেমিং যে সামাজিক ব্যাধি হয়ে দিন দিন বড় হচ্ছে তা হয়তো এখনও খুব কম মানুষেরই জানা। কিন্তু নীরবে কিংবা প্রকাশ্যে কত যে ঘটে যাচ্ছে অনাচার তার খোঁজ কেউ নিচ্ছে না। আর যারা বডি শেমিং এর শিকার তাদের মানসিক যন্ত্রণা কথা তো অজানাই থেকে যাচ্ছে। কেউ যখন মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছে কিংবা বিষণœতায় ভুগছে তখন তাদের ¯্রফে রোগী বলে সাব্যস্ত করা হয়। কিন্তু এর পেছনের কারণ খতিয়ে দেখার সুযোগ এদেশে খুব কমই হয়েছে।

পারিবারিক চর্চা ॥ এই আধুনিক সমাজে এখনও বিয়ে খেতে গেলে বর কনে দেখে নানা মানুষের নানা মন্তব্য ছুড়ে দিতে দেখা যায়। কনের সঙ্গে বরটা একদম বেমানান, কেউ বলে ওঠে, দেখ দেখ মেয়েটা বোধহয় বেশ কালো হবে, মেকআপ দিয়ে ঢেকে রাখলে কি হবে হাত দেখে বোঝা যায়সহ নানা ধরনের কটূক্তি ভরা মজলিশেই ছেড়ে দেয় অবলীলায়। বিষয়টা এমন যে, এ ধরনের মন্তব্য বিয়ের আসরে খুবই কমন। আবার কোন অতিথির বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এসে ঘরে বসে শুরু হয়ে যায় সে বাড়ির সদস্যদের নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য। ওদের ছেলেটাকে দেখেছ, মা-বাবা কারও মতোই হয়নি, একেবারেই ভিন্ন ধাঁচের। অথবা ওর ছোট ভাইকে দেখেছ কি মোটা আর কালো মনে হয় আলিফ লায়লার দৈত্যের মতো। আর এ ধরনের আলাপগুলো শুনে বাড়ির ছোট সদস্যরাও অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে সে ধরনের মন্তব্যে। নিজেদের অজান্তেই নিজের ছেলেমেয়েদের মনে ঢুকিয়ে দিচ্ছি বডি শেমিংয়ের মতো নোংরা বিষয়গুলো। যার ফলে ওদের মনে হবে এ বিষয়গুলো যেন একদমই স্বাভাবিক ব্যাপার। পারিবারিক এ চর্চা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। তা না হলে এই বাচ্চারাই স্কুল কলেজে গিয়ে এর প্রয়োগ করতে থাকে। যা অন্যের জন্য হয়ে যায় অস্বস্তিকর।

বর্ণবিদ্বেষী ॥ সেই প্রাচীনকাল হতে সাদা ও কালো চামড়ার ভেদাভেদ থেকেই মূলত বডি শেমিংয়ের সূত্রপাত। তারই একটি বড় নজির ঘটে গেল সম্প্রতি। এক অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক মসজিদে ঢুকে স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করে কেড়ে নিয়েছে পঞ্চাশোর্ধ প্রাণ। এ ঘটনায় যত না ধর্ম বিদ্বেষী ধারণা ছিল তার চেয়ে বেশি কাজ করেছে বর্ণবিদ্বেষী ধারণা। সে স্পষ্ট বোঝাতে চেয়েছে তাদের দেশ শুধু সাদা চামড়াদের জন্য, অন্যদের জন্য নয়। এটাই বডি শেমিং। এটা যে কতটা ভয়ঙ্কর তা এ ঘটনা দ্বারা প্রমাণিত। এখনও সাবধান হওয়ার সময় আছে আমাদের তা না হলে নৃশংসতা দিন দিন বাড়তে পারে।

মানসিক বিকাশে বাধা ॥ বাচ্চাদের প্রথম শিক্ষা গ্রহণ শুরু হয় ঘর থেকে। সেই ঘরেই যদি ভুল চর্চা হতে থাকে তাহলেই ঘটে যায় বিপত্তি। একটু খেয়াল করলেই দেখা যায় যে মেয়েটা কালো বলে সব সময় কথা শুনে আসে তার মানসিক অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। কিংবা সব সময় মটু মটু শুনে যে বাচ্চাটা বড় হয় সে এক সময় ভেবেই বসে সে মটু তাকে দিয়ে হয়তো কিছু হবে না। আবার সিনেমা নাটকে যেভাবে ভাঁড় হিসেবে মোটাদের উপস্থাপন করা হয় তা থেকে সবাই ভেবেই নেয় মোটা মানেই বুঝি হাসির পাত্র। ছোট বেলা থেকে ঠাট্টা বঞ্চনার শিকার হতে হতে এক সময় সে হীনম্মন্যতায় ভুগতে থাকে। বাধাগ্রস্ত হয় তার মানসিক বিকাশ। ধীরে ধীরে সে বিষণœতায় পতিত হয়। ভয় পেতে থাকে লোকালয়কে। বারবারই তার মনে হয় রাস্তায় বের হলেই বুঝি শুনতে হবে কটূক্তি। তার চেয়ে ঘরে বসে থাকা ভাল। নিজের গ-িতে আবদ্ধ হতে থাকে ক্রমাগত। এভাবেই একসময় নিজেকে আবিষ্কার করে নিঃসঙ্গ হিসেবে। কারণ ঘরের মানুষগুলোও তাকে সেভাবে সাপোর্ট করে না। আর এ পরিস্থিতিতেই এক সময় সে আত্মহত্যার মতো সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করে না। আর এ ধরনের কেস স্টাডিতে আত্মহত্যার ঘটনার সংখ্যা কম নয়। যা সত্যিকার অর্থেই আমাদের সমাজের জন্য অশনিসংকেত।

পরিবার, স্কুল-কলেজ, অফিস কিংবা কর্পোরেট যে কোন প্রতিষ্ঠানে হরহামেশা এখনও হচ্ছে বডি শেমিং। কিন্তু কেউ তা আমলে নিচ্ছে না। যে কারণে এখনও অফিস কলিগরা ফিসফিস করে, আরে ও তো দেখতে সুন্দর তাই বসের নেকনজরে থাকে। কিংবা মেয়েটা কাজ জানে ভাল কিন্তু কালো বলে ভাল পজিশনে যেতে পারল না, এই টাইপের কথা কিন্তু খুবই কমন অফিসগুলোতে। মেধার মূল্যায়ন যে হচ্ছে না তা নয়, যোগ্য জায়গায় থাকা সত্ত্বেও শুনতে হচ্ছে, ছেলে বা মেয়েটা আরও অনেকদূর যেতে পারত কিন্তু কালো বলে যেতে পারছে না। এ ধরনের মন্তব্য মানুষের মনে তীব্রভাবে আঘাত করে। যোগ্যতানুযায়ী পজিশনে থাকা সত্ত্বেও সে ভাবতে থাকে আমি বুঝি আরও অনেকদূর যেতে পারতাম কালো বলে বা বেশি মোটা বলে অফিস আমাকে মূল্যায়ন করছে না। সেই থেকে কমে যায় তার কর্মস্পৃহা। যার ফলে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে তার আর পৌঁছানো হয় না।

নেশায় আসক্তি ॥ সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ মানুষ নিঃসঙ্গতা থেকে নেশায় আসক্ত হয়। অনেকেই বলে ও তো বড়লোকের ছেলে, নেশা করা ছাড়া আর কি করার আছে ওর, টাকার তো অভাব নাই। কিন্তু ঘটনা যাচাই করলে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেই সে শুনতে পেত কিছু হবে না তোমাকে দিয়ে, কিংবা তুমি কিছু করার যোগ্যতা রাখো না, শুধু বসে বসে বাপের টাকা ধ্বংস করছ। সে যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে এক সময় সিদ্ধান্ত নেয় ড্রাগ সেবনের। এভাবেই ঝুঁকে পড়ে নেশার দিকে। আবার বডি শেমিংয়ের শিকার হয়ে যারা নিজ গ-িতে আবদ্ধ হয়েছে তারাও অশান্ত মনকে শান্ত করতে বেছে নেয় নেশার পথ। যা সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ। অথচ ব্যাপারটি কিন্তু সেই ছোট থেকেই শুরু। সন্তানের খারাপ লাগার বিষয়টা যদি একটু প্রাধান্য দিয়ে দেখা হতো তাহলে হয়তো এ দৃশ্য দেখতে হতো না।

নাটক, সিনেমা কিংবা বিজ্ঞাপনের প্রভাব ॥ বডি শেমিংয়ের আওতায় পড়ে এমন কিছু বিজ্ঞাপন অবলীলায় প্রচার হচ্ছে টিভি, সিনেমা কিংবা দেয়ালে সাঁটানো পোস্টারে। কালো মেয়েকে ফর্সা বানিয়ে দেয়ার ক্রিমের বিজ্ঞাপন। কারণ মেয়েটা কালো তার কোন ভবিষ্যত নাই আর বিয়ে তো অনেক দূর, এ ধরনের আশঙ্কা তৈরি করে সমাধান হিসেবে নিয়ে আসা হয় ক্রিমটিকে। ব্যস, রাতারাতি ফলাফল, এক সপ্তাহে মেয়ে হচ্ছে ফর্সা এবং সব সফলতা দ্রুত তার হাতে ধরা দিচ্ছে। কিন্তু এর মাধ্যমে যে বর্ণবাদিতা উস্কে দেয়া হচ্ছে তা যেন কেউ খেয়াল করছে না। একটা মেয়ে কালো থাকলে সমস্যাটা কোথায়? কালো হয়ে জন্মগ্রহণ করে নিশ্চয়ই কোন পাপ সে করেনি। তাহলে তাকে তার মতো করে থাকতে না দেয়ার কারণ কী? কেন বিজ্ঞাপন দিতে হবে ১৫ দিনে স্বাস্থ্য মোটা ও রোগা করে থাকি? সে যদি পাতলা গড়নের হয় তাতে কার কী সমস্যা? কিংবা মোটাও যদি হয় তাহলেও তো কারও কিছু বলার নেই। হ্যাঁ, শারীরিক ঝুঁকি থাকে এমন কিছু হলে অবশ্যই একজন সচেতন মানুষ ডাক্তারের শরণাপন্ন হবেন। কিন্তু বিজ্ঞাপন দিয়ে হেয় করার তো কিছু নেই। বেশিরভাগ সিনেমাগুলো দেখা যায় অতি শুকনো ও মোটা মানুষগুলো কমেডিয়ান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। সর্বোচ্চ যদি কিছু করা হয় তাহলে তা হবে খলনায়ক। এভাবে এদের প্রেজেন্ট করে মানুষকে স্থূল আনন্দ দেয়ার প্রয়াস ঘটিয়ে থাকে। যা আদতে কারও কাম্য নয়। স্মার্টনেসের সংজ্ঞা নিশ্চয়ই শরীরের কাঠামোতে লুকিয়ে নেই। তা লুকিয়ে আছে ব্যক্তিত্বের মধ্যে, কথা বলার ধরনের মধ্যে, পজেটিভ চিন্তাধারার মধ্যে। বাহ্যিক চেহারা কখনই ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ হতে পারে না। অথচ নাটক, সিনেমা কিংবা বিজ্ঞাপনগুলো প্রতিনিয়ত হেয় করে যাচ্ছে এ ধরনের প্রচারের মাধ্যমে। শক্ত হাতে দমন করা উচিত অন্যকে হেয় করা কিংবা বর্ণবাদ উস্কে দেয়ার মতো বিষয় প্রচারের ক্ষেত্রে। কারও সঙ্গে কারও তুলনা করা বন্ধ করতে হবে আগে।

কুসংস্কার ঘিরে আছে এখনও ॥ সময়ের সঙ্গে বিশ্বের সঙ্গে এদেশ এগোতে থাকলেও এখনও কিছু কিছু কুসংস্কার কুরে কুরে খাচ্ছে আমাদের। শুভ কোন যাত্রায় কানা-খোঁড়া মানুষকে সঙ্গে না রাখা, পাত্র পাত্রী দেখার সময় বাড়ির কালো সদস্যদের আড়াল করে রাখা। তাদের সঙ্গে নিয়ে কোথাও ঘুরতে না যাওয়া ইত্যাদি এখনও প্রচলিত। আরও বলে থাকে খাটো মানুষ শয়তানের লাঠি ইত্যাদি ইত্যাদি। আর যদি বাড়িতে কোন বিকলাঙ্গ বা মানসিক ভারসাম্যহীন কোন সদস্য থেকে থাকে তাহলে তো কথাই নেই। এমনও অনেক পরিবার আছে বিকলাঙ্গ কিংবা মানসিক ভারসাম্যহীন শিশুকে কখনও জনসম্মুখে আনে না। বাবা মা নিশ্চয়ই নিজহাতে সন্তানকে এমন তৈরি করে জন্মগ্রহণ করাননি। তাহলে কিসের এত দ্বিধা। সন্তানকে বাইরে নিয়ে গেলে যদি পাগল বলে ক্ষেপায় এই ভেবে বদ্ধ ঘরে আবদ্ধ করে রাখার কোন কারণ নেই। তাহলে আরও অসুস্থ হয়ে পড়বে। তাকে সুস্থ পরিবেশে সবার সঙ্গে মেলামেশার মাধ্যমেই বড় করে তুলতে হবে। তবেই সে নিজেকে পরিবর্তন করতে শিখবে। বলা তো যায় না তাদের মধ্যেই হয়তো আগামীর স্টিফেন হকিংস লুকায়িত আছে।

তৃতীয় লিঙ্গের প্রতি মনোভাব ॥ আমাদের দেশের মানুষ তৃতীয় লিঙ্গের প্রতি দূরত্ব বজায় রেখে চলতে চায়। অনেক সময় দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়ার মতোও আচরণ করে থাকে। কখনই মানুষ হিসেবে গণ্য করা হয় না। হিজড়া বলে সব সময় তাচ্ছিল্য করার একটা ব্যাপার লক্ষ্য করা যায়। আর হিজড়া সম্প্রদায় ক্রমাগত তথাকথিত সভ্য মানুষের অসভ্য আচরণে চরম বিরক্ত। নিজেদের বাঁচার ঢাল হিসেবে জোটবেঁধে চলা ফেরা করে, আচরণ করে উগ্র মাস্তানদের মতো। এক ধরনের জোর জবরদস্তির মধ্যে ঢুকে গেছে তারা। তাদের ধারণা কেউ আমাদের স্বাভাবিকভাবে নেবে না তাই জোর করে নিজেদের অধিকার যেন তারা আদাায় করতে চায়। অথচ তাদেরও অধিকার আছে সমাজের ভাল জায়গায় অবস্থান করার, ভাা পরিবেশে মেশার, ভাল ব্যবহার পাওয়ার। ভাল ব্যবহার পেলে হয়তো আজকের এই মাস্তানি ভাবটা তাদের মধ্যে থাকতো না। সবচেয়ে বেশি বডি শেমিংয়ের শিকার হচ্ছে তৃতীয় লিঙ্গ সম্প্রদায়। পরিবর্তন ঘটাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির।

মানসিক উৎকর্ষতায় প্রয়োজন কাউন্সিলিং ॥ কাউন্সিলিং মানুষের মনকে পরিবর্তন করে। কিন্তু মানসিক উৎকর্ষতার জন্য কাউন্সিলিং শুরু করতে হবে ঘর থেকেই। প্রয়োজনে মা-বাবার উচিত দক্ষ কারও কাছ থেকে অথবা মনো বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে নিজেদের কাউন্সিলিং সেরে ঘরে তা চর্চা করা। এতে করে সন্তানের অন্তত খোলা মন নিয়ে মেধা ও মননে বেড়ে উঠতে পারবে। মন থেকে নেগেটিভ বিষয়গুলো যতদূরে সরতে থাকবে ততই সুসন্তান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে সক্ষম হবে। সন্তানকে শেখাতে হবে কারও সঙ্গে কারও তুলনায় যেন না যায়। কখনই যেন অন্যকে কটাক্ষ করে কথা না বলে।

পাঠ্যপুস্তকের আওতায় আনা ॥ সামাজিকতা ও সু আচরণ শিশুকাল থেকেই বপন করা উচিত। তা না হলে মন মানসিকতায় বড় হয়ে ওঠে না তারা। আর এখন এ বিষয়টি আরও জরুরী। দিনকে দিন যেন নিজ গ-িতে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে শিশুরা। মনে হয় পড়াশোনা ছাড়া তাদের বিকল্প কোন কাজ নেই। কিভাবে কার সঙ্গে কথা বলতে হবে, কি আচরণ করতে হবে তা তাদের অজানাই থেকে যায়। যে কারণে আজও খবরের শিরনাম হয় ছাত্রের হাতে শিক্ষক লাঞ্ছিত। যদিও পরিবার হতে হবে শিক্ষার প্রাথমিক ধাপ। তথাপি শিক্ষকের ভূমিকাও কম নয়। প্রতিটি ছাত্র ছাত্রীদের শেখাতে হবে বন্ধুদের প্রতি বাবা মা, শিক্ষকের প্রতি, প্রতিবেশী কিংবা আশপাশের মানুষের প্রতি আচরণ কেমন হওয়া উচিত। কখনই অন্যকে কটাক্ষ করে কথা বলা উচিত নয়। প্রয়োজনে বিষয়গুলো পাঠ্যপুস্তকে গল্প আকারে নিয়ে আসা যায়। কিংবা শিক্ষণীয় কিছু গল্প সিলেবাসে সংযোজন করা উচিত। যেসব গল্প তুলে ধরবে ইভটিজিং, বডি শেমিংয়ের মতো জঘন্য আচরণ কিভাবে অন্যকে বিপথে ঠেলে দেয়।

সভা-সেমিনারের উদ্যোগ ॥ বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি পাড়া মহল্লাতেই কমবেশি সচেতনতামূলক ক্লাব বা সংগঠন রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে এ ধরনের বিষয় নিয়ে সভা-সেমিনার করার মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। ধর্মীয় ব্যাপারেও এ ধরনের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি করা আছে। মসজিদ, মন্দির, গীর্জায় এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়া যেতে পারে। বিভিন্ন স্বেচ্ছসেবী সংগঠন সেমিনারের আয়োজন করে অভিজ্ঞ বক্তাদের কথা তুলে ধরতে পারে। এতে করে সমাজে ভাল একটি প্রভাব পড়বে বলে আশা করা যায়।

কখনই অন্যকে ছোট করে বা কটাক্ষ করে নিজে বড় হওয়া যায় না, এ বোধটা আমাদের মনে প্রাণে গেঁথে নিতে হবে। বলার আগে ভাবতে হবে অন্যকে কটাক্ষ করার অধিকার আমার আছে কি না? শুধু গায়ের জোরে কিংবা ঠাট্টারছলে কাজগুলো করা মোটেও উচিত নয়। এতে নিজের কুরুচি প্রকাশ পায়। মনে রাখতে নিজ আচরণ যেন পুরো পরিবারকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে। অন্যের মঙ্গল প্রত্যাশায় যেন দিনটি শুরু হয় আমাদের।