১২ নভেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নারীর অধিকার অর্জনে সিডওর ভূমিকা

১৯১৪ এবং ১৯৩৯ সালের শুরু হওয়া ১ম ও ২য় মহাযুদ্ধের অনিবার্য পরিণতিতে যে মাত্রায় মানবিক বিপর্যয় ও নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ সারা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দেয় তখন ‘জাতিসংঘে’র মতো একটি বিশ্ব শান্তির প্রতিষ্ঠান গঠন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়ায়। যারই প্রেক্ষাপটে ১৯৪৫ সালে বিশ্বজোড়া এই মানবিক এবং সর্বজনীন সংগঠনের শুভযাত্রা শুরু হয়ে যায়। অমানবিক প্রলয়কা-ে হিংসার উম্মত পৃথিবী যখন বিশ্বব্যাপী ত্রাসের সঞ্চার করে সেখানে অবহেলিত এবং দুর্বল অংশ হিসেবে নারী ও শিশুদের চরম দুর্দশায় নতুন করে আরও একটি নারী বিষয়ক অধিকার অর্জনের সাংগঠনিক প্রক্রিয়া চলতে থাকে। যুদ্ধের বিভীষিকা সারা পৃথিবীকে মহাদুর্যোগের আবর্তে ফেললে নারী ও শিশুরাই হয় সব থেকে বেশি ন্যক্কারজনক ঘটনার শিকার। ফলে নারীদের নিয়ে নতুন করে ভাবা শুরু হয়। অর্ধাংশ এই বিশেষ গোষ্ঠীর কোন অর্জনই নির্বিঘেœ, কোন প্রতিবন্ধকতা ছাড়া হওয়া ছিল এক দুঃসহ অভিযাত্রা। আর সে কারণে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর পরই অর্থাৎ ১৯৪৬ সালে ‘নারীর মর্যাদা বিষয়ক কমিশন’ নামে এক সাংগঠনিক কার্যক্রমের যাত্রা শুরু হলেও তা আলোর মুখ দেখতে আর অনেক সময় নিয়েছিল। এই কমিশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নিজস্ব সীমায় নারী সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে তা জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানে পেশ করা। মানুষ হিসেবে সমস্ত মানবিক অধিকার ভোগ করতে নারীরা নিজ দেশে কতখানি পিছিয়ে থাকছে কিংবা নির্যাতন আর অত্যাচারের শিকার হচ্ছে সে সবও সরেজমিনে তদন্তসাপেক্ষে বের করে আনা নবগঠিত এই কমিশনের অন্তর্ভুক্তি থাকে। ফলে নারীর প্রতি সব প্রকার বৈষম্য বিলোপ-সনদ ‘সিডও’ বার্তা সেই সম্ভাবনারই দিকনির্দেশক। তবে নারী বিষয়ক এমন সমতাভিত্তিক সনদ জাতিসংঘের অনুমোদন পেতে অনেকটা সময় পার করতে হয়েছে। ১৯৬৭-৮১ প্রায় ২ যুগের সংগ্রামী অভিযাত্রায় ‘সিডও’ সনদ তার আপন মর্যাদায় জাতিসংঘের স্বীকৃতি পায়। সুইডেন সর্বপ্রথম এই সনদকে তার রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে অনুমোদন দিয়ে নারী অধিকারের এই বিশেষ বার্তাকে সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করে।

১৯৮১ সালে জাতিসংঘের অনুমোদন পাওয়া সিডও সনদ বাংলাদেশের সরকারী বিধিবিধানে অধিভুক্ত হয় ১৯৮৪ সালে। তবে সনদের সব ক’টি ধারা বিভিন্ন দেশে নানামাত্রিকে নারীদের অধিকার অর্জনে অনেকটা বিচ্ছিন্নভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। ‘সিডও’ নারীদের মানবাধিকার বিষয়ক একমাত্র দলিল যেখানে বৈষম্যপীড়িত এ গোষ্ঠীর বিশেষ সংজ্ঞা স্পষ্ট করা হয়। সমাজ ও ব্যক্তি জীবনে নারীর মৌলিক ও মানবিক অধিকার সুরক্ষা এই সনদের বিশেষ ধারা, সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে নারী-পুরুষের অভিন্নতার ওপর এই সনদ বিশেষ কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বৈশ্বিক অঙ্গনে নারীর মূল্যবান যথার্থ স্বাধীনতাকে সমান গুরুত্বের সঙ্গে এই সনদ বিবেচনায় এনেছে। নারীর সন্তান ধারণের ক্ষমতা এবং ভূমিষ্ঠ করার কৃতিত্বকে সিডও সনদ বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে স্বীকার করে। শুধু তাই নয় সন্তান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মায়ের অনবদ্য ভূমিকাকে এই সনদ যথাযর্থভাবে মূল্যায়নও করে। সমাজ সভ্যতার ক্রমবিকাশে নারীর বৈপ্লবিক পথযাত্রাকে সিডও সনদের মূল বার্তা বিশেষ গুরুত্বারোপ করে। সঙ্গত কারণে নারী-পুরুষের বৈষম্যকে এই সনদ অস্বীকার করে। সামাজিক পটভূমিতে অর্ধাংশ এই গোষ্ঠী তাদের অবিস্মরণীয় অবদানে একটি জাতিসত্তাকে সুসংহত করতে প্রয়োজনীয় কার্যকলাপ অব্যাহত রেখে ভিত্তি মজবুত করে, নতুন সমাজ গঠন প্রক্রিয়ায় দিকনির্দেশকের ভূমিকাও রাখে। আর সেই কারণে প্রতিটি রাষ্ট্র তাদের আইনী বিধিবিধানে নারীর নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতা লাভে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা সংরক্ষিত রাখবে।

তবে সিডও সনদ যা যা অনুমোদন করে নারীদের আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার দাবিতে সবটাই কি সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় স্বীকৃত অবস্থায় বিরাজ করে? করলেও তা সঠিকভাবে অনুসরণ কিংবা মানা হয় কিনা তাও পর্যলোচনাসাপেক্ষ। এমন বার্তা সিডও সনদে উল্লেখ আছে। ফলে প্রতি চার বছর অন্তর এই সনদের কার্যক্রম ও বাস্তবায়ন বিভিন্ন রাষ্ট্র থেক জাতিসংঘে জমা দেয়ার পরামর্শও আছে।