২৫ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লালবাগ কেল্লা

  • রিফাত কান্তি সেন

যান্ত্রিক এ শহরে আমাদের বসবাস। কর্পোরেট দুনিয়া আর যন্ত্র মানবের মতো বেড়ে উঠছি প্রতিনিয়ত। সকাল থেকে সন্ধ্যা, আবার রাত গড়িয়ে ভোর, ছুটে চলেছি আমরা স্বার্থপরের মতো। গ্রামে মানুষ মানুষের খবর নিলেও শহরে যেন কেউ কারও খবর নেয় না। ইচ্ছা হলেই বিকেলে মাঠে খেলতে যাওয়া যায় না। ইচ্ছে হলেই প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে ছুঁয়ে দেখা ও যায় না। তবু ইট-পাথরের দেয়ালে আমাদের জীবন প্রতিনিয়ত কৃত্রিম শ^াস-প্রশ্বাস গ্রহণ করেই বেঁচে থাকছি জীবিকার টানে। তবু মনে চায় সুন্দরের পানে ছুটতে। দেখতে ইচ্ছে করে পুরনো দিনের স্থাপত্য শৈলিগুলো। দুপুরে ভাত খেয়েই রওনা দিলাম লালবাগ কেল্লার উদ্দেশে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাই সেখানে। গিয়ে দেখি প্রচুর মানুষ সেখানে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। থকন আর বুঝতে বাকি রইল না যে এখানে প্রবেশ করতে অবশ্যই টিকেটের প্রয়োজন। আমি গেটের বাইরে থেকে মুঘলদের দুর্গ দেখছিলাম আর ভাবছিলাম কখন সেখানে ঢুকতে পারব। ইতোমধ্যে টিকেট কেটে বন্ধু হাজির। বলল চল এবার ভেতরে প্রবেশ করি। ততক্ষণে দীর্ঘ এক সারি মানুষের পেছনে আমরা। যখন ঢুকলাম দেখলাম ফুলে ফুলে যেন চারিপাশ শোভিত। হাজারো মানুষের মিলনমেলা ঘটেছে সেখানে। শুধু আমদের দেশের পর্যটকই নয়, বিদেশী পর্যটকদেরও সেখানে দেখা গেছে। আমি বেশ আনন্দবোধ করছিলাম যে এই বুঝি শান্তির পরশ পাওয়ার মতো একটা জায়গা রয়েছে ঢাকাবাসীর জন্য। ভেতরে ঢুকেই মুঘলদের স্থাপত্যশৈলি দেখে আমার প্রাণ ভরে উঠল। কারুকার্য খচিত স্থাপত্যশৈলি দেখে নজর আর সরাতে ইচ্ছে করছিল না। দুই বন্ধু মিলে ছবি তোলার ফাঁকে লালবাগ কেল্লার ইতিহাসটা একটু জেনে নিলাম। ঢাকার দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত মুঘল আমলের অসমাপ্ত একটি দুর্গ এটি। যার নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল ১৬৭৮ সালে। মুঘল স¤্রাট আজম শাহ কর্তৃক এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। যাকে আমরা চিনি স¤্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র।

১৫ মাস বাংলায় থেকে তিনি কাজ না শেষ করেই পাড়ি জমান দিল্লীতে পিতা আওরঙ্গজেবের ডাকে। ওই সময়টাতে একটি মসজিদ ও দরবার হল নির্মাণের পর দুর্গ নির্মাণের কাজ থেমে যায়। ১৬৮০ সালে শায়েস্তা খাঁ পুনরায় বাংলার সুবেদার হিসেবে ঢাকায় এসে দুর্গের কাজ আবার শুরু করেন। ১৬৮৪ সালে শায়েস্তা খাঁর কন্যা ‘পরীবিবি’র মৃত্যু ঘটে এখানে। সব যেন আবার থমকে যায়। পুনরায় আবারো দুর্গ নির্মাণের কাজ বন্ধ করে দেন শায়েস্তা খাঁ । তিনি মনে করেন এ দুর্গটি অপয়া। ১৬৮৪ সালে এর নির্মাণ কাজ আবারও বন্ধ হয়ে যায়। লালবাগের কেল্লার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার একটি হলো পরীবিবির সমাধি। যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন শায়েস্তা খাঁ এ কন্যা ‘ইরান দুখত রাহমাত বানু’ বা ‘পরীবিবি’। লালবাগ কেল্লার তিনটি বিশাল দরজার মধ্যে বর্তমানে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত মাত্র একটি দরজা। এই দরজা দিয়ে ঢুকলে বরাবর সোজা চোখে পড়ে পরীবিবির সমাধি। ১৬৬৮ সালের ৩ মে পরীবিবির বিয়ে হয় আওরঙ্গজেবের পুত্র শাহজাদা আজমের সঙ্গে। অকাল মৃত্যুর পর তাকে সমাহিত করা হয় লালবাগ কেল্লার অভ্যন্তরে। মাজারটির স্থাপনা চতুষ্কোন। মার্বেল পাথর, কষ্টিপাথর আর বিভিন্ন রঙের ফুলপাতা সুশোভিত চাকচিক্যময় টালির সাহায্যে অভ্যন্তরীণ নয়টি কক্ষ অলংকৃত করা হয়েছে।

শায়েস্তা খাঁ ঢাকা ত্যাগ করার পর এটি তাঁর জনপ্রিয়তা হারায়। রাজকীয় মুঘল আমল সমাপ্ত হওয়ার পর দুর্গটি পরিত্যাক্ত অবস্থায় রয়ে যায়। বর্তমানে লালবাগ কেল্লা চমকপ্রদ এক স্থাপত্যশৈলির নিদর্শন। শুধু দেশীয় পর্যটকই এখানে ভিড় জমান না। বিশে^র বিভিন্ন দেশ থেকে ঘুরতে আসা পর্যটকদের মিলনমেলা ঘটে স্থানটিতে। ঢাকার কাছে, বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে হওয়ায় বেশ পরিচিতিও পেয়েছে স্থানটি।

নির্বাচিত সংবাদ