১৯ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শতবর্ষে বোস কেবিন

  • সুমন্ত গুপ্ত

হয়ত ভোর পাঁচটা হবে! আমি নিদ্রারত। ঈশান কোন থেকে পবিত্র ফজরের আজানের ধ্বনি কানে ভেসে এলো। সুমধুর সেই আজানের ধ্বনিতে ঘুম ভেঙ্গে গেল। সময়টা খুব ভাল লাগছিল। আমি জানালা খুলে দিলাম। পুবের বাতাস জানালা দিয়ে প্রবেশ করতে লাগল। কখন যে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম টেরই পেলাম না। ঘুমের ভেতর সেই ছোটবেলার মতো স্বপ্ন দেখছিলাম, বাসায় ডাকাত পড়েছে সবাইকে বেঁধে রেখেছে। ইয়া বড় গোঁফ, আমার সবাইকে বাঁচানোর চেষ্টা... এসব হাবিজাবি এর মাঝে কে যেন ধাক্কা দিল। এই ওঠো বেলা হয়ে যাচ্ছে আমি স্বপ্নের ঘোর থেকে বাস্তব জগতে এলাম। আমার নতুন ভ্রমণসঙ্গী সানন্দা গুপ্ত ডাকছেন আমায়। তাড়াতাড়ি ওঠো মামা বাড়ি যাবে না। আমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সকাল নয়টা হতে চলল। দ্রুত ঘুম থেকে উঠে পড়লাম, প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলাম মামা বাড়ি যাব বলে। বলে রাখা ভাল আমার মামা বাড়ি প্রাচ্যের ডা-ি নামে সমাধিক পরিচিত নারায়ণগঞ্জ শহরে। মামা বাড়ি যাব বলে কথা মনের মাঝে আনন্দ সীমাহীন। আমরা বের হলাম ওয়ারি থেকে গন্তব্য নারায়ণগঞ্জ শহর পানে। গুলিস্তান থেকে আমরা শীতল বাস এ উঠলাম। প্রায় পঞ্চাশ মিনিটের মাথায় আমরা নারায়ণগঞ্জ শহরে এসে পৌঁছালাম। গাড়ি থেকে নামতেই দেখি আনন্দ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আমরা মামা বাড়ির পথে এগিয়ে চললাম, অনেক দিন পর মামা বাড়িতে এলাম। সেই চিরচেনা শহরের অনেক পরিবর্তন দেখতে পেলাম। মামা বাড়ি আসার পর মামিদের খাবারের আয়োজন। পেট পূজা শেষ করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম ভ্রমণ গন্তব্যের জন্য। কিন্তু কোথায় যাওয়া যায়। মনে মনে ভাবতে লাগলাম, ভ্রমণসঙ্গী আনন্দ বলল দাদা বোস কেবিনে যেতে পার শত বর্ষে পা দিতে চলছে ঐতিহ্যবাহী বোস কেবিন। আমি বললাম যাওয়া যায় সেই ছোট বেলায় গিয়েছিলাম আর ওখানকার মাংসের চপ, ডিমের চপ, কাটলেটের নাম ডাক অনেক আগে থেকেই। এক কথায় হ্যাঁ বলে দিলাম খাবারের লোভ সামলানো যায় না। ঘড়ির কাঁটাতে দুপুর প্রায় একটা। এগিয়ে চললাম বোস কেবিনের দিকে। নারায়ণগঞ্জ ১ ও ২ নম্বর রেল গেটের মাঝামাঝি, ফলপট্টির কাছাকাছি আসতেই দেখা পেলাম বোস কেবিনের। ১৯২১ সালে একটি টং ঘরে এই বোস কেবিনের যাত্রা শুরু। আমরা এগিয়ে চললাম বোস কেবিনের দিকে। সামনের দিকে বেঞ্চপাতা বসার জন্য। বেশ কয়েকজনকে দেখলাম এক পেয়ালা চা নিয়ে গল্প করছে, কেউ আবার পেপার পড়ায় ব্যস্ত। আমরা বোস কেবিনে গিয়ে বসলাম। এখনকার রেস্তরাঁগুলো আগের মত নেই। আমরা বসতেই একজন এলেন হাসি মুখে কি খাবেন। বিশাল এক ফিরিস্তি দিলেন মেন্যুর। মাংসের চপ, ডিমের চপ, কাটলেট, ভাজা মুরগি, মাংসের সঙ্গে সাদা পোলাও, বাটার টোস্ট আরও কত কি। আমরা মাংসের চপ, ডিমের চপ, কাটলেট, দই দিতে বললাম। আমাদের ভ্রমণসঙ্গী সুজন মামা এই বোস কেবিনের ইতিহাস বলতে গিয়ে বললেন বোস কেবিনের প্রতিষ্ঠাতা নৃপেন্দ্র চন্দ্র বসু ওরফে ভুলু বোস বিক্রমপুরে জন্মগ্রহণ করেন। যিনি ১৯২০ সালে এন্ট্রাস পাস করেন। সে সময় তিনি দারোগার চাকরি পেয়েও তা করেননি। তার চিন্তায় তখন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর বাঙালীদের মধ্যে এক গোপন সশস্ত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। ওই স্বদেশী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন ২১ বছরের যুবক ভুলু বোস। কলকাতা থেকে সিদ্ধান্ত হওয়া ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের চিঠি আদান-প্রদানের বাহক ছিলেন তিনি। কিন্তু এ চিঠি আদান-প্রদান নিয়ে একটি সমস্যা দেখা দেয়। কীভাবে কলকাতার সেই চিঠি তিনি নির্দিষ্ট ঠিকানায় পাবেন তা নির্ধারিত ছিল না। এ সমস্যার সমাধানের জন্য ১৯২১ সালে নারায়ণগঞ্জ শহরের ১নং রেলস্টেশন ও স্টিমার ঘাটের কাছে বোস কেবিন প্রতিষ্ঠিত হয়। এই কেবিনের ঠিকানায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের চিঠি আসত। ১৯৩৭ সালে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু নারায়ণগঞ্জ এলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়। খবর পেয়ে দাদা ভুলুবাবু, কড়া ও হালকা লিকারের দুই কেতলি চা বানিয়ে ছোটেন নেতাজীর কাছে। সেই চা খেয়ে খুবই খুশি হয়েছিলেন নেতাজী। আশীর্বাদ করে বলেছিলেন, ‘তুমি একদিন ভাল করবে, বড় হবে।’ এক সময় বোস কেবিনে বিখ্যাত সব ব্যক্তির পায়ের ধুলা পড়েছে। এই বোস কেবিনে চা খেয়েছেন নেতাজী সুভাষ বসু, ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু। আরও যাদের পা পড়েছে এই বোস কেবিনে তাদের মধ্যে অন্যতম জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং জাতীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এর মধ্যেই আমাদের মাঝে মাংসের চপ, ডিমের চপ, কাটলেট, দই পরিবেশন করা হলো। আমি কালক্ষেপণ না করেই খাওয়া শুরু করলাম। স্বাদের ব্যাপারে কোন কথা হবে না এক কথায় অসাধারণ। আমরা প্রতিটি আইটেম চেখে দেখলাম, আমার সহধর্মিণী সানন্দা গুপ্ত ও খুব খুশি। আমি একের পর এক ছবি তুলতে লাগলাম। আমাদের মতো অনেকেই এসেছেন ঐতিহ্য বাহী বোস কেবিনে। নগর জীবনে ব্যস্ততার মাঝে শান্তি খুঁজে পেতে সময় পেলেই ছুটে যান বোস কেবিনে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে। অফিসে কাজের ফাঁকে সহকর্মীর সঙ্গে লাঞ্চ ব্রেক কিংবা টি ব্রেকে গল্পের আসরটা জমে ওঠে মধুর মগ্নতায়। আড্ডাটা মূলত একটা শিল্পের রূপ পায় কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিককর্মী, রাজনীতিক, খেলোয়াড়, কলেজ-ইউভিার্সিটির বন্ধুদের মধ্যে। নাওয়া-খাওয়া ভুলে চলে তুমুল ম্যারাথন আড্ডা। তবে এক্ষেত্রে প্রবল আড্ডাবাজ বলে প্রধানত এগিয়ে আছেন লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মীরাই। আর সব লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মীর আড্ডার স্থল হলো এই বোস কেবিন। এদিকে আমাদের বিদায়ের পালা চলে এলো নতুন গন্তব্যে আমরা পথ ধরলাম নতুন গন্তব্য পথে।

খাবারের মেন্যু

বোস কেবিনে সকালের নাস্তায় পাওয়া যায় পরোটা, দাম ৫ টাকা। ডাল ও হালুয়া ১০ টাকা। ডিমের ৬ রকমের পদ ছাড়াও খাসি ও মুরগির মাংস। দুপুর ১২টা থেকে পাওয়া যায় আলুরচপ ১৫ টাকা। পোলাও ৫০ টাকা। মোরগ পোলাও ৮০ টাকা। কারি ৯০ টাকা। মাটন কাটলেট ৫৫ টাকা। চিকেন ফ্রাই ৭৫ টাকা এখানে দুপুরে ভাত বিক্রি হয় না। নেতাজী যে চা খেয়ে প্রশংসা করেছিলেন, কড়া লিকারের সেই চা বড় কাপে পান করতে পারবেন মাত্র ১৫ টাকায়। সবসময় এখানে চা পাওয়া যায়। অনেকে এখানে আসে কেবল কাটলেটের স্বাদ নিতে। বোস কেবিনের কাটলেট এক কথায় অসাধারণ। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকে বোস কেবিন, শুরু থেকেই এই নিয়মে চলছে। ছুটির দিনগুলোতে এখানে তিল ধারণেও জায়গা থাকে না।

ঢাকা থেকে যেভাবে বোস কেবিনে আসবেন

গুলিস্তান থেকে উৎসব, বন্ধন, বিআরটিসি বা শীতল বাসে সরাসরি নারায়ণগঞ্জের কালীরবাজার নেমে রিক্সায় বা হেঁটে চেম্বার রোডে গেলেই পেয়ে যাবেন বোস কেবিন। আপনার বাসে ভাড়া লাগবে ৩৬ থেকে ৫৫ টাকা। আপনি চাইলে ট্রেনে কমলাপুর থেকে সরাসরি নারায়ণগঞ্জে আসতে পারেন জনপ্রতি ১৫ টাকা খরচ করতে হবে অথবা আপনি চাইলে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়েও আসতে পারেন।