১৮ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পরীক্ষা নয়

শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। আবার এই শিক্ষাই জাতিকে সমৃদ্ধ করে, মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখায় সর্বোপরি জীবনের গতি নির্ণয়েও এই শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। সুতরাং শিশুকাল থেকেই এ শিক্ষা কার্যক্রম ছেলেমেয়েদের প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও অতি বাল্যকাল থেকে কচিকাঁচা সোনামণিদের পবিত্র শিক্ষাঙ্গনে জীবন চলার প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি হয়। ফলে শিক্ষা কার্যক্রমও যেমন এক দেশ হতে অন্য দেশের তারতম্য দৃশ্যমান হয়, একইভাবে সময়ের মিছিলে এর গতিবিধিও পরিবর্তিত হয়। শিক্ষা আসলে প্রতিদিনের কর্মযোগের একটি অপরিহার্য অঙ্গ, যা মানুষের পাঠাভ্যাস গড়ে তোলে, মেধা ও মননের বিকাশ ঘটায়; সর্বোপরি বিশ্বজনীনতার অপার সম্ভাবনার সঙ্গে সেতুবন্ধন তৈরি করে। তাই শিক্ষা যেমন ব্যক্তিক একইভাবে সামাজিকই শুধু নয়, বৈশ্বিক পরিসীমায়ও এর ক্ষেত্র সম্প্রসারিত। তবে এই শিক্ষা গ্রহণের শুভ সূচনা শুরু হয়ে যায় অতি অল্প বয়সে বিদ্যালয় গমনের মধ্য দিয়ে। আমাদের দেশে পাঠ্য কার্যক্রমের নিয়মনীতিতে শিক্ষার যে প্রাথমিক পর্যায় নির্ণীত আছে সেখান প্রথম শ্রেণী থেকে তার যাত্রা শুরু হয়।

শিক্ষা যখন শুধু পারিবারিক কিংবা প্রতিষ্ঠান বলতে শুধু বিদ্যালয় সম্পর্কিত ছিল তখন অবধি শিশুরা আনন্দের সঙ্গে জ্ঞানচর্চায় মনোনিবেশ করে নিজেকে পরবর্তী শ্রেণীর জন্য তৈরি করত। আর এটাই ছিল শিক্ষার যথার্থ যাত্রা শুরু। বইয়ের ভারে অবোধ বালক-বালিকারা নুয়ে পড়ত না, পরীক্ষাভীতিও কখনও গ্রাস করত না। পরিবার থেকেই শিক্ষার হাতে খড়ি হতো। বিদ্যালয়ে শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকের স্নেহছায়ায় অবাধ ও শুক্ত মননে জ্ঞানের জগতে প্রবেশ করাও ছিল এক ধরনের চমকপ্রদ ও বিস্ময়কর অনুভাব। কোন ধরনের ভীতিকর কিংবা কঠিন অস্বস্তিদায়ক অনুভূতি হৃদয়ের ওপর চেপে বসেনি। কিন্তু সময় যতই এগিয়ে যাচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রমের পরিধিও সেভাবে বিস্তৃত ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে শিক্ষার্থীদের জীবনে চেপে বসেছে। এক সময় শিক্ষা ছিল নিজেকে সাবলীলভাবে তৈরি করে সমৃদ্ধ করা। অন্যের প্রতি প্রতিযোগিতা কিংবা বেশি নম্বর পাওয়ার কোন ব্যাপারই ছিল না। ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল কম তাই বিদ্যালয়ের ঘাটতিও কখনও অনুভূত হয়নি। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা তার সঙ্গে সময়ের যৌক্তিক দাবি এবং শীর্ষস্থান অর্জন করার অসম প্রতিযোগিতায় শুধু শিক্ষার্থীই নয়, অভিভাবকরাও এর সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়লেন। ফলে শিক্ষা কার্যক্রম মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে শিশুদের ওপর তার অস্বাভাবিক চাপ দিতে শুরু করে। এক সময় যা কল্পনাও করা যেত না-প্রথম শ্রেণীতে ভর্তির জন্য শুধু পরীক্ষা নয়, কোচিং করে কোমলমতি শিশুদের সময়, শ্রম সবকিছুকেই সমর্পিত করা হলো। পরীক্ষা দিতে দিতে ক্লান্ত, অবসন্ন শিক্ষার্থীরা নিজেদের সুষম বিকাশকে কোনভাবে এগিয়ে নিতে ব্যর্থ হলো। তা ছাড়া গত শতাব্দীর শেষ অবধি প্রথম বোর্ড পরীক্ষা ছিল মাধ্যমিক। আর একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকেই অতি বাল্যকাল হতে শিশুরা বোর্ড পরীক্ষাকে মোকাবেলা করতে থাকে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার মধ্য দিয়ে পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা প্রথম বোর্ড পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। এরপর অষ্টম শ্রেণীতে জুনিয়র সমাপনী তারপরে মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসা হয় বোর্ডের অধীনে।

তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরও উন্নত বাংলাদেশ গড়তে শিশুদের শিক্ষাকার্যক্রমকে তাদের উপযোগী করে পৌঁছে দিতে চান। তাই ঘোষণা আসে সরকার প্রধান থেকে- প্রথম শ্রেণীর ভর্তিতে কোন নির্বাচনী পরীক্ষা নয়। এমনকি ১ম, ২য় ও ৩য় শ্রেণীতেও কচিকাঁচা শিশুরা পরীক্ষার সঙ্গে সেভাবে পরিচিত না হয়ে বিভিন্ন ক্যাটাগরি মূল্যায়ন করে তাদের মান নির্ধারণ করা হবে। প্রতিটি ক্লাসে মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর মেধা ও মনন যাচাই করা হবে। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন কর্মশালা বালিকা-বালকের সামনে উপস্থাপন করে তাদের শিক্ষা এবং বিচক্ষণতাকে মাপতে হবে, যাতে প্রথম শ্রেণী থেকে যখন সে ২য় শ্রেণীতে যাবে সেখানে তার যথার্থ ভিত্তি যেন মজবুত হয়। এসব মূল্যায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে ছোট ছোট বাচ্চার ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। আর এভাবেই প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বজনীন ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হবে।