২৬ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এবার সার্কুলার নৌপথ ॥ রাজধানীর যানজট নিরসনে

  • চীনের সহায়তা চাইল বাংলাদেশ

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ঢাকায় বৃত্তাকার নৌপথ স্থাপনে চীনের সহায়তা চাইল সরকার। চীন যেভাবে নদী শাসন করে নৌপথ তৈরি করেছে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। রাজধানীর চারপাশে বৃত্তাকার নৌপথ সৃষ্টি করার পরিকল্পনা দীর্ঘ দিনের। কিন্তু দখল আর দূষণের কবল থেকে মুক্তি না পাওয়ায় সেই স্বপ্ন আলোর মুখ দেখেনি এখনও। রাজধানীর যানজট কমাতে ঢাকার চারপাশের নৌপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের বৃত্তাকার নৌপথ খননের প্রকল্প নেয়া হয় ২০০০ সালে। এ লক্ষ্যে দুই দফা খনন কাজ শেষে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয় এই প্রকল্পের কাজ। ৯০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ১১০ কিলোমিটার নৌপথ খনন করে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। কিন্তু রাজধানীর চারপাশের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ নদীর অবৈধ দখল ও দূষণের কারণে আবার ভরাট হয়ে যাচ্ছে এই নৌপথটি। এছাড়া নদীর উপরে নির্মিত সড়ক ও রেলপথে ১০টি সেতুর উচ্চতা কম থাকায় এর নিচ দিয়ে পণ্য ও যাত্রীবাহী কোন নৌযান চলাচল করতে পারে না। বৃত্তাকার এই নৌপথের মধ্যে ডেমরা-নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ-সদরঘাট পর্যন্ত ৬০ কিলোমিটার হলো দ্বিতীয় শ্রেণীর নৌপথ। এছাড়া সদরঘাট-মিরপুর-টঙ্গী-ডেমরা পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটার হলো তৃতীয় শ্রেণীর নৌপথ। এই তৃতীয় শ্রেণীর নৌপথের ওপর বিদ্যমান সড়ক ও রেলপথে মোট ১৫টি সেতু রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি সেতুর উচ্চতা নদীর পানির স্তর থেকে খুবই কম। এই সেতুগুলোর মধ্যে সড়ক ও জনপথ অধিদফতর (সওজ)’র ৪টি, স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী অধিদফতর (এলজিইডি) ৪টি ও রেলওয়ে ২টি সেতু রয়েছে বলে অভ্যন্তরীণ নৌ-কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্র জানায়।

বিশ্বে অন্যতম দূষণের শিকার ঢাকার চারপাশের নদীগুলো। বর্তমানে এত পরিমাণে দূষিত যে দূষণ রোধে এবং দখল উচ্ছেদে আদালত পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে হস্তক্ষেপ করেছে। আদালতের নির্দেশের পর একাধিকবার নদী রক্ষায় অভিযান চালানো হলেও কাজ হয়নি। এই সরকার নতুন করে ক্ষমতায় এসে এবার ঢাকার চার নদী রক্ষায় ব্যাপক পদক্ষেপ নিয়েছে। ইতোমধ্যে দখল রোধে উচ্ছেদের ক্র্যাশ অভিযান শুরু হয়েছে। বিআইডব্লিউটি-এর যুগ্ম পরিচালক জানান, নদী ঘিরে সরকারের মহা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নদী রক্ষায় উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে। উচ্ছেদ অভিযান শেষে সরকারের নেয়া প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে। নদীর চারদিকে ৫০ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে।

কিন্তু দখল উচ্ছেদ হলেও এখন পর্যন্ত দূষণের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। শুষ্ক মৌসুমে ঢাকার চার নদীর পানির দুর্গন্ধের কারণে পার্শ্ববর্তী এলাকায় বসবাস করা দায় হয়ে পড়েছে। বর্তমানে নদীতে অক্সিজেনের পরিমাণ দশমিকের নিচে নেমে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন নদীর পানি ব্যবহারের জন্য প্রতি লিটার পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ ৪ মিলিলিটার এর উপরে থাকার আবশ্যক। এছাড়া অক্সিজেনের পরিমাণ ২ এর নিচে নেমে গেলে নদীতে কোন জলজ প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে না। বুড়িগঙ্গায় দীর্ঘদিন ধরে মাছসহ অন্য কোন জলজ প্রাণীর সন্ধান পাওয়া দুষ্কর হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাষট্টি রকমের রাসায়নিক বর্জ্যে বিষাক্ত হয়ে গেছে বুড়িগঙ্গার পানি। বাতাসে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। নদীর তলদেশে জমাট বেঁধেছে পলিথিনের স্তর। এর পানিতে এ্যান্টিবায়োটিকসহ হাসপাতালের বর্জ্যও মিশছে। বুড়িগঙ্গার দুই তীরের মানুষ জানিয়েছে, আগের যে কোন সময়ের তুলনায় বুড়িগঙ্গার পানির রং এখন সবচেয়ে কালো। এই কালো পানির উৎকট গন্ধে নদীর পাড়ে দু’দ- দাঁড়ানোও দায়। রাজধানী ঢাকার প্রাণরূপী বুড়িগঙ্গা এখন নগরবাসীর আবর্জনা ফেলার ভাগাড় মাত্র।

কিন্তু এর বিপরীত চিত্র রয়েছে চীনে। এক সময় চীনের দুঃখ বলা হতো হোয়াং হোকে। এখন হোয়াং হোর সৌন্দর্য বিমোহিত করে পর্যটকদের। নদীর দুধারের অবকাঠোমো নজর কাড়ে যে কারো। ঠিক একই রকম জলের উৎস থাকলেও আমাদের বুড়িগঙ্গা সেই রূপ পাচ্ছে না। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় চীন থেকে পাঠানো এক খবরে জানায়, চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট এ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশন (সিএমসি) এর সঙ্গে শুক্রবার তাদের কার্যালয়ে বৈঠক করেছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ। সিএসমির ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্যাঙ্গ হুবাইও এর সঙ্গে বৈঠকে ঢাকার চারপাশে নৌপথ তৈরি করতে তিনি চীনের সহায়তা চান। এ সময় ক্যাঙ্গ হুবাইও তার দেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। অন্যদিকে খালিদ মাহমুদ বলেন, তারা অনেক দিন থেকেই চেষ্টা করছেন ঢাকার চারপাশে একটি বৃত্তাকার নৌপথ সৃষ্টি করতে। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।

নৌপথের পাশাপাশি সার্কুলার সড়ক, মেরিন একাডেমিতে বিশ্বমানের নাবিক গড়ে তুলতে চীনের সহযোগিতা প্রদানের বিষয়ে আলোচনা হয়। এছাড়া চীন থেকে বিএসসি’র জন্য আরও ৬টি জাহাজ সংগ্রহের বিষয়েও আলোচনা হয়।

জানা গেছে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনকে (বিএসসি) একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার লক্ষ্যে এক হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ে চীন থেকে ছয়টি জাহাজ সংগ্রহের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে চীন আর্থিক সহায়তা দিয়েছে এক হাজার কোটি টাকা, বাকি টাকা বাংলাদেশ সরকারের। এ পর্যন্ত পাঁচটি জাহাজ বিএসসি’র বহরে যুক্ত হয়েছে। অবশিষ্ট একটি জাহাজ ‘এমটি বাংলার অগ্রগতি’ এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে প্রতিমন্ত্রী ২১ মার্চ রাতে চীনে যান। বলা হচ্ছে বিএসসি’র বহরে আরও ছয়টি জাহাজ সংগ্রহ করা হবে। এজন্য প্রাথমিকভাবে এর ব্যয় ধরা হয়েছে ২ দশমিক ৫০ কোটি মার্কিন ডলার। একনেক প্রকল্পটি অনুমোদন করেছে। এর আগে এম.ভি বাংলার জয়যাত্রা, এম.ভি বাংলার সমৃদ্ধি, এম.ভি বাংলার অর্জন, এম.ভি বাংলার অগ্রযাত্রা এবং এম.ভি বাংলার অগ্রদূত বিএএসসির বহরে যোগ হয়েছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মহানগরীর চারদিকে নদীর তীরে ওয়াকওয়ে নির্মাণের পদক্ষেপ নেয়ার জন্য ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়। পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে ২০১৫ সালের ৯ এপ্রিল একটি সভাও হয়। ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয় ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর দু’পাশ অবৈধ দখলমুক্ত রাখতে তীরভূমিতে ওয়াকওয়ে নির্মাণ কাজ চলমান রাখতে হবে। পাশাপাশি তীরের জায়গায় জনগণের জন্য বসার বেঞ্চ, ইকো পার্ক, বৃক্ষরোপণ ইত্যাদি কাজ হাতে নেয়া যেতে পারে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা শহরের চারদিকে বৃত্তাকার নৌপথের মোট ১২০ কিলোমিটার তীরভূমির মধ্যে ১ম পর্যায়ে ২০ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। ২য় পর্যায়ে ৫২ কিলোমিটার অংশ অন্তর্ভুক্ত করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এ প্রকল্পটি প্রস্তাব করেছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য অংশেও ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে। ৮৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুন মাসে শেষ করার লক্ষ্যে প্রকল্পটির প্রস্তাব করা হলে ২০১৭ সালের ৫ আগস্ট প্রস্তাবটির ওপর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৭ সলের ৫ ডিসেম্বর পুনর্গঠিত ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে গৃহীত হয়। পুনর্গঠিত ডিপিপিতে কিছু অসঙ্গতি থাকায় তা সংশোধন করে গত বছর ১৩ মার্চ পুনর্গঠিত ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে গৃহীত হয়। বর্তমান পুনর্গঠিত ডিপিপি অনুসারে প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৪৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত।

বিআইডব্লিউটিএর ঢাকা নদীবন্দরের যুগ্ম-পরিচালক একেএম আরিফউদ্দিন বলেন, ঢাকার চারপাশের বৃত্তাকার নৌপথ উদ্ধারে নদী দখলদারদের বিরুদ্ধে এই অভিযান করা হচ্ছে। যত বড় প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির অবৈধ স্থাপনা হোক, গুঁড়িয়ে দেয়া হবে। অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে আমাদের নীতি ‘জিরো টলারেন্স’। অভিযানে কাউকে কোন ছাড় দেয়া হচ্ছে না। জানা গেছে দখল উচ্ছেদের পর ঢাকার চার নদী ঘিরে ব্যাপক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনার মধ্যে চারদিকে ওয়াকওয়ে নির্মাণ ও নৌপথ চালুর বিষয়টি রয়েছে।