২৫ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হাইড্রোজ ও ইউরিয়া মিশিয়ে ভাজা হচ্ছে মুড়ি

  • স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর

শাহীন রহমান ॥ বাঙালীর একটি প্রিয় খাবারের নাম মুড়ি। এই খাবারটির জনপ্রিয়তা এতই বেশি যে বাংলা সাহিত্যেও ব্যাপক স্থান করে নিয়েছে। এক সময় গ্রাম বাংলায় অতিথি আপ্যায়নে বহুল ব্যবহৃত হতো। বাঙালী শহরে জীবনেও মুড়ি ব্যবহারের ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। এ কারণে দেশে বিশেষ করে শহরে এর বাণিজ্যিক উৎপাদন রয়েছে। আর বাণিজ্যিক উৎপাদন করতে গিয়ে মুড়িতে মেশানো হচ্ছে সোডিয়াম হাইড্রো সালফাইড। যার বাণিজ্যিক নাম হাইড্রোজ। সংশ্লিষ্টদের মতে হাইড্রোজ মেশানোর কারণে মুড়ি বেশি পরিমাণ ফুলে ফেঁপে ওঠে। সাদা চকচকে হয়। ক্রেতা আকর্ষণ করে বেশি। ফলে বেশি দামে বিক্রি করা সম্ভব হয়।

আসছে রমজান মাস। আর এই মাসেই দেশে মুড়ির চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে রমজানে ইফতারে অবশ্যকীয় একটি উপাদান হলো মুড়ি। সন্ধ্যায় ইফতারের সময় ছোলা মুড়ি ছাড়া ইফতার হয় না। রমজানকে টার্গেট করেই মুড়ি কারবারিদের এখন রমরমা ব্যবসা। এছাড়া সারাবছরই মুড়ির ব্যবহার রয়েছে। শহরের জীবনে সাধারণ মানুষ এই বাণিজ্যিক মুড়ির ওপর বেশি নির্ভর করে থাকে। বিএসটিআই জানিয়েছে, মুড়ি ভাজতে সাধারণত লবণ ও পানির মিশ্রণের প্রয়োজন হয়। এই লবণ মিশ্রিত পানি মুড়িতে মেশানোর সময় হাইড্রোজ মিশিয়ে দেয়া হয়। মুড়ি ভাজার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, হাইড্রোজ মেশানোর কারণে মুড়ি বেশি পরিমাণ ফুলে ফাপা হয়ে ওঠে। ভাজা মুড়ি সাদা চকচকে হয়ে পড়ে। এতে ক্রেতা আকর্ষণ করে বেশি। ফলে বেশি দামে বিক্রি করা সম্ভব হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে মুড়িতে এভাবে হাইড্রোজ মেশানো মানব স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। আবার খাদ্যে এভাবে হাইড্রোজ মেশানও নিষিদ্ধ। কিন্তু বেশি মুনাফার লোভে এভাবে মুড়ি ভেজে বিক্রি করা হচ্ছে। বিএসটিআই সূত্রে জানা গেছে পুরান ঢাকা, বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে, শনির আখড়া, গোবিন্দপুর, বাগানবাড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে মুড়ি ভাজার কারখানা। রমজান শুরু হওয়ার আগে প্রয়োজনীয় মুড়ি ভেজে বাজারে সাপ্লাই দেয়া হয়ে থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মুড়ি ধান থেকে তৈরি এক ধরনের স্ফীত খাবার বা ভাজা চাল। সাধারণত প্রাতরাশ বা জলখাবারে খাওয়া হয়। বাংলাদেশ ও ভারতে জনপ্রিয় খাবার হিসেবে পরিচিত। এটা সাধারণ বাষ্প উপস্থিতিতে উচ্চ চাপের সাহায্যে তৈরি করা হয়। এটি স্বাস্থ্যের পক্ষেও ব্যাপক উপকারী। শরীরের এসিডিটি নিয়ন্ত্রণ করে ওজন কমাতে সাহায্য করে। মুড়িতে সোডিয়ামের পরিমাণ কম। তাই এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে। পেট ভরে থাকে দীর্ঘক্ষণ। পেটে গোলমাল অবস্থায় শুকনো মুড়ি কিংবা ভেজা মুড়ি খেলে তাৎক্ষণিক উপকার পাওয়া যায়। মুড়িতে ভিটামিন বি ও প্রচুর পরিমাণে মিনারেল থাকায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। পাশাপাশি হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।

ইফতারে ছোলা-মুড়ির চাহিদা থাকে সবচেয়ে বেশি। শুধু কি ছোলা, মুড়ির সঙ্গে পেঁয়াজু, বেগুনি, চপ, শসা, টমেটো, জিলাপি মিশিয়ে তৈরি করা হয় আরও সুস্বাদু খাবার। তাদের মতে মুড়িতে রয়েছে ব্যাপক পুষ্টিগুণ। মুড়িতে রয়েছে উচ্চ পরিমাণে শর্করা। এটি আমাদের শক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। দৈনন্দিন কাজে সক্রিয় থাকতে জ্বালানি হিসেবে কাজ করে মুড়ি।

কিন্তু মুড়িতে ভেজাল বা রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে দেয়ার কারণে এর পুষ্টিগুণ আর বজায় থাকে না। ভেজাল দেয়া মুড়ি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে ওঠে। এছাড়া হাইড্রোজ দেয়া মুড়ি খেতেও বিস্বাদ লাগে। বিশেষ করে মুখে দিলেই এক ধরনের তিতা স্বাদ অনুভুত হয়ে। সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে খোলা অবস্থায় বড় প্লাস্টিকে বস্তা ভর্তি মুড়ি বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। রমজান এলই রাজধানীর বিভিন্ন বাজার, অলিগলির দোকান ও পাড়া মহল্লায় ফেরি করে মুড়ি বিক্রি শুরু হয়। ইফতারের আত্যাবশ্যকীয় সামগ্রী হওয়ায় আগে থেকেই অনেকে মুড়ি সংরক্ষণ করে থাকেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুরান ঢাকা ভিত্তিক একাধিক মুড়ি বিক্রেতা রাজধানীতে মুড়ি সাপ্লাই দিয়ে থাকেন। নিজস্ব কারখানায় মুড়ি ভেজে বিক্রি করা হয়। কিন্তু এসব মুড়ি তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে সোডিয়াম হাইড্রো সালফাইড। যার বাণিজ্যিক নাম হাইড্রোজ। পাশাপাশি ইউরিয়া সার ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

মুড়ি ভাজার কারখানায় বিএসটিআইয়ের অভিযানে হাইড্রোজ দেয়ার বিষয়টি হাতেনাতে ধরা পড়েছে। জরিমানার পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু ভেজাল মুড়ি তৈরির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন অভিযান না চালানোর কারণে আবার এই রমরমা ব্যবসা শুরু হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে রমজানকে সামনে রেখে এসব কারখানা এখন সক্রিয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাইড্রোজ একটি শক্তিশালী ক্ষারীয় পদার্থ। এটি পেটে গেলে মানব দেহে রক্তের শ্বেতকনিকা, হিমোগ্লোবিনের কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়। কিন্তু মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর হলেও ইউরিয়া ও হাইড্রোজ মেশানো মুড়ি দেদার বিক্রি হচ্ছে। রমজানে বেশি লাভের আশায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ক্ষতিকারক উপাদান মিশিয়ে মুড়ি উৎপাদন করছে। জানা গেছে ৫০ কেজি চাল থেকে ৪৪ কেজি মুড়ি উৎপাদন করা যায়। এ ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য ক্রেতাদের কাছে আকর্ষণীয় করতে ইউরিয়া আর হাইড্রোজ মেশানো হচ্ছে। এতে মুড়ি দেখতে চকচকে সাদা ও ফাঁপা হয়। আবার আকারেও বড় দেখা যায়। কিন্তু আসল মুড়ি বাদামি বর্ণের ও দেখতে আকারে ছোট হয়। ক্রেতাদের তেমন আকর্ষণ করে না। বেশি দাম আর ক্রেতা আকর্ষণ করতে মুড়িতে ক্ষতিকর উপাদান মিশিয়ে দেয়া হচ্ছে বলে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

নির্বাচিত সংবাদ