১৮ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

একাত্তরে ২০ জেলায় পাঁচ হাজার ১২১ গণহত্যা

বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার ॥ মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের ২০ জেলায় ৫ হাজার ১২১ গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে। একেকটি গণহত্যায় সর্বনিম্ন ৫ থেকে ১ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়। বধ্যভূমির সংখ্যা ৪০৪, গণকবর ৫০২ এবং নির্যাতন কেন্দ্র ছিল ৫৪৭। গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্রের জরিপে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের এমন চিত্র।

শুক্রবার দুপুরে বাংলা একাডেমির শামসুর রাহমান মিলনায়তনে এই জরিপের তথ্য তুলে ধরেন ‘গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্রের’ ট্রাস্টি সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন। ‘গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ’ শীর্ষক সেমিনারে এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোঃ আবু হেনা মোস্তফা কামাল প্রমুখ।

দেশের ২০টি জেলায় এই গবেষণা জরিপ চালানো হয়। জেলাগুলো হলো- জামালপুর, নারায়ণগঞ্জ, নাটোর, কক্সবাজার, পঞ্চগড়, বগুড়া, পাবনা, যশোর, গাইবান্ধা, মৌলভীবাজার, কুড়িগ্রাম, রাজশাহী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সাতক্ষীরা, বরিশাল, নীলফামারী, ভোলা, খুলনা, নড়াইল ও লালমনিরহাট।

সভাপতির বক্তব্যে মুনতাসীর মামুন বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে এমন কোন পরিবার ছিল না যারা নির্যাতন, হত্যাকান্ড ও ধর্ষণের শিকার হয়নি। পরিবারের একজনকে ধর্ষণ করে একটা পরিবারকে ধ্বংস করা হয়েছে। গণহত্যার বিষয়য়ে আমরা বিস্মৃত হয়েছি। এই সুযোগে অপরাজনীতি করেছে বিএনপি-জামায়াত। মুক্তিযুদ্ধের কথা উঠলে আমরা শুধু বিজয় দেখি। কিন্তু এ বিজয়ের পেছনে কত যে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, তা আমরা দেখেও যেন দেখি না। এসব গণহত্যার বিচার করতে হবে। বাংলাদেশসহ অন্যান্য জায়গার গণহত্যার বিচার হলে আজ মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা হতো না।

তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ বা ১৪ দল বা আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক, তারা গণহত্যার বিষয়টি তুলে ধরতে চেয়েছি। এটাও রাজনীতির একটি দিক, কেননা মুক্তিযুদ্ধ তো একটি রাজনীতির বিষয়। আমরা এই রাজনৈতিক সত্যটি তুলে ধরতে চেয়েছি। আজকে গণহত্যার দিনটি জাতীয় দিবস হিসেবে পালন করছি। এখন সবাই গণহত্যার কথা মনে রাখতে পারছেন।

মুনতাসীর মামুন বলেন, গণহত্যার পেছনে একটা রাজনীতি থাকে। ১৯৭৫ সালের পর জেনারেল জিয়া, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, খালেদা জিয়া ও নিজামী গণহত্যা নিয়ে রাজনীতি করেছেন। তারা গণহত্যার বিষয়টিকে মুছে দিতে চেয়েছেন। কারণ, গণহত্যার বিষয়টি থাকলে তাদের রাজনীতি থাকে না। তারা পাকিস্তানের হয়ে রাজনীতি করে ছিলেন। এই রাজনীতি করার জন্য তারা বারবার বিজয়ের কথা বলছে। কারণ, বিজয়ের কথা বললে তারা জেনারেল জিয়াকে উপস্থাপিত করতে পারছে। সুতরাং বিজয়টাকে তারা প্রাধান্য দেয়।

জিপিএস সার্ভের মাধ্যমে এই জরিপ করা হয়েছে বলে জানান মুনতাসীর মামুন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, এসব গণহত্যা, গণকবর, বধ্যভূমি এবং নির্যাতন কেন্দ্র নিয়ে যে শুধু গতানুগতিক জরিপ করেছি তা নয় বরং জিপিএস সার্ভে করেছি। এটা বাংলাদেশে প্রথম। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জার্মানিতে ইহুদী গণহত্যা পর দ্বিতীয়। আপনারা যদি ম্যাপ দেখেন তাহলে পুরো বাংলাদেশে গণহত্যা, গণকবর, বধ্যভূমি আর নির্যাতন কেন্দ্র ছাড়া কিছু পাবেন না। এ সময় তিনি এই জিপিএস সার্ভেটি সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় গুগলে অন্তর্ভুক্তি করানোর দাবি জানান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমি গণহত্যা দেখেছি পরোক্ষভাবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্কুল ছাত্র ছিলাম। আমার দুই ভাই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। সে সময়ের প্রেক্ষাপট যে কতটা ভয়াবহ তা নিজে না দেখলে বুঝা যাবে না। গণকবর থেকে একজনের লাশ নিজের স্বজনের মনে করে মানুষরা নিয়ে যাচ্ছে। লাশ তো না, হাড়গোড় শুধু। এখানে ২০ জেলা নিয়ে জরিপ করায় এসব সংখ্যা ওঠে এসেছে। ৬৪ জেলা নিয়ে হিসাব করলে ভাবুন পরিস্থিতি আরও কত ভয়াবহ।

গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপের ফলাফল সংক্রান্ত প্রকাশিত ১০ গ্রন্থ নিয়ে দিনব্যাপী দুটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। অধিবেশন দুটিতে সভাপতিত্ব করেন গণহত্যা জাদুঘরের ট্রাস্টি ড. মোঃ মাহবুবর রহমান ও কাজী সাজ্জাদ আলী জহির (বীর প্রতীক)।