১৮ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রযুক্তি কি আমাদের সুখ কেড়ে নিচ্ছে?

  • রেজা সেলিম

আজ থেকে ৭২ বছর আগে ১৯৪৭ সালে বিনয় মুখোপাধ্যায় যিনি ‘যাযাবর’ নামে সুপরিচিত, তার বিখ্যাত ‘দৃষ্টিপাত’ বইয়ে লিখেছিলেন ‘আধুনিক বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে বেগ, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আবেগ। তাতে আছে গতির আনন্দ, নেই যতির আয়েস।’ আসলেই কি তাই? আজকের দিনে জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে অগ্রগতি হয়েছে তা নিয়ে যদি যাযাবর লিখতেন তাহলে কি লিখতেন জানি না, তবে অনুমেয়, ডিজিটাল সমাজের এই সময়ে আমাদের আবেগ আর সুখের সন্ধান নিয়ে তার অভিমান একটুও কমত না।

অতি সম্প্রতি মানুষের সুখ নিয়ে একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন তৈরি করেছে Sustainable Development Solutions Network নামের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। অনেকেরই হয়ত জানা ২০১২ সাল থেকে এই সংস্থাটি জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় দেশে দেশে উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাগুলোর বাস্তবায়নের ফলশ্রুতি সব মানুষের জন্য আদৌ কোন কল্যাণ অর্জনে সহায়ক হচ্ছে কি-না প্রতিবছর জরিপের মাধ্যমে তা যাচাই করে থাকে। বিশেষ করে ২০১৫ সালে ১৭টি এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো গ্রহণ করার পর লক্ষ্যমাত্রা ৩-এ বর্ণিত ‘সকল বয়সী সকল মানুষের জন্য সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ নিশ্চিতকরণ’ এই সুখ নিয়ে গবেষণার অন্যতম প্রেক্ষাপট। আদৌ মানুষ নিজেদের জীবনে সুখ অর্জন করেছে বা সুখ অনুভব করতে পেরেছে বা পারেনি সেসব সূচক একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করে তোলার কাজটিই এবারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পৃথিবীর ১৫৬টি দেশের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে ও নানারকম উন্নয়ন সূচক বিবেচনায় এনে প্রতিবেদনটি এই মার্চ মাসেই প্রকাশ করা হয়েছে। সেই বিবেচনায় ফিনল্যান্ড সুখের দেশ হিসেবে এক নম্বরে আছে আর সবচেয়ে কম সুখের দেশ হিসেবে গণ্য হয়েছে দক্ষিণ সুদান। বাংলাদেশের অবস্থান ওপরের দিক থেকে ১২৫, ভারতের ১৪০। বাংলাদেশের মানুষের সুখের অবস্থান ভারতের চেয়ে ভাল।

জাতিসংঘসহ বিশ্বের উন্নয়ন অর্থনীতি নিয়ে যারা কাজ করেন এখন তারা এই সুখ গবেষণার ফলের সূচকের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখবেন আর কী কী পদক্ষেপ নিলে মানুষের আরও কল্যাণ সাধিত হবে ও মানুষের সুখ নিশ্চিত হবে বা কোন পদক্ষেপ ভুল ছিল কি-না, যা পরিহার করে সামনের সময়ে নতুন নতুন উদ্যোগ নিয়ে সব মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর একটি বিষয় জ্ঞানী সমাজের আলোচনায় সামনে চলে এসেছে তা হলো ডিজিটাল যুগে মানুষের সুখ কি দ্বন্দ্বময় হয়ে উঠেছে? বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নিত্য অগ্রগতির সঙ্গে কি মানুষের মূল্যবোধ, আবেগ, চেতনা আর অন্তর্গত সাংস্কৃতিক বিবেচনা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে? বার্ট্রান্ড রাসেল যিনি ১৯৫০ সালে তার সাহিত্যকর্মের জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন, তিনি চেয়েছিলেন মানুষের জীবনে ‘মানবতার আদর্শ ও চিন্তার মুক্তি’ আসুক। যে ব্রিটিশ আদর্শবাদিতার বিরুদ্ধে তিনি লড়াই করেছিলেন তার বিপরীতে তার দর্শন ছিল অনেক বাস্তবমুখী, ‘মানব প্রকৃতির যে আদর্শ সে অনুযায়ী হতে হবে তার শিক্ষা’ আর তাতেই রাসেল মনে করতেন মানুষের মঙ্গল সাধিত হবে। বিজ্ঞান যতই আধুনিক মারণাস্ত্র তৈরি করুক তা মানবতার বিরুদ্ধে মানুষকে প্রকারান্তরে যুদ্ধবাজ করে, হিংসাত্মক করে আর তা কখনই মানুষের সুখের জন্য সহায়ক হতে পারে না।

এরকম মানবিক আদর্শের চিন্তা মানুষকে নতুন করে নির্দেশনা দিলেও রাসেলের কয়েক দশক পরে ডিজিটাল প্রযুক্তি যখন সর্বগ্রাসী হয়ে উঠল তার সদাচরণ নিয়ে মানবসমাজ খুব বেশি চিন্তিত হলো না। ফলে দেশে দেশে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারিক বৈষম্য নিরসনে জোর দাবি উঠল। বিশ্ব নেতারা তাতে চিন্তিত হলেন বটে; কিন্তু তা দখল করেই রাখল বাণিজ্য চিন্তা। যার ফলে প্রযুক্তির বাজার বড় হতে হতে আকাশে যেয়ে ঠেকল; কিন্তু আমাদের কেউ ডিজিটাল জগতের সদাচরণ শিখে নেয়ার সুযোগই দিল না। তাহমিমা আনাম যখন আদর্শবাদিতা, ধর্মবিশ্বাস, পারিবারিক বন্ধন ও ভাইবোনের দ্বন্দ্বমুখর ভালবাসার এক অনন্য কাহিনী ‘দ্য গুড মুসলিম’ লিখলেন তখনও আমরা পারিবারিক মূল্যবোধ ক্ষয়ে যেতে দেখে আত্মদ্বন্দ্বে বিপর্যস্ত হয়েছি; কিন্তু এসবের ফাঁকে কখন ডিজিটাল প্রযুক্তি এসে সব আদর্শ কেড়ে নিয়ে আমাদের ভিন্ন এক জগতে ছেড়ে দিল ভাল করে তা টেরও পেলাম না কেউ। এখন দেখতে পাচ্ছি দুনিয়াটা শাসন করছে ডিজিটাল প্রযুক্তির যে আদর্শ সেই আদর্শের নিয়ম আর তা আমাকে সুখ দিক বা না দিক তা নিয়ে ভাবনা নেই। এমনকি সুখের সংজ্ঞা আমরা বদলে নিয়েছি, যাতে আমি প্রযুক্তির বশে না যেয়ে নিজেই তাকে বশ করে নিতে পারি। কিন্তু সে কঠিনেরে ভালবাসার সংগ্রামে মানুষের জয়ী হওয়ার চিন্তা খুব জটিল আবর্তে ঘুরপাকই খাচ্ছে।

প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ২০১৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৯৫% কিশোর-কিশোরীর হাতে স্মার্ট ফোন আছে, যাদের ৪৫% প্রায় সারাক্ষণই অনলাইনে থাকে। এরা সোশ্যাল মিডিয়া, টেক্সটিং, গেমিং ও ব্রাউজিং-এ ব্যস্ত থাকে এবং সেসব সেবা সুযোগের ক্রমপরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে অভ্যস্ত হয়েই আছে। এখন সে দেশে যাদের বয়স ৭০ ও অবসরে গেছেন তাদের হাতে ৫০-৫৫ বছর আগের ওই কিশোর জীবনে ডিজিটাল প্রযুক্তি বলে কিছু ছিল না। ফলে তাঁরা বলছেন তাঁদের সময় কাটানো এখন একটি বড় অসুখের কারণ। আমরা কিছুটা হলেও বুঝে নিতে পারি আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যে যে শাখায় সময় কাটাবার সুযোগ আছে সেসব কাজে তাঁরা অভ্যস্ত নন বা গত এক দশকে সেসবের সঙ্গে পরিচিত হলেও তাঁদের সাংস্কৃতিক মানসে সে অভ্যাস গড়ে তুলে নিতে পারেননি।

আমরা সে কথাও জানি বেশি বয়সে যেসব অসুখ হয় সেসব এড়াতে কায়িক কাজের ব্যবহার বাড়াতে হয়। অবসরে গেলে তা এসে কেবল ব্যায়াম পর্যন্ত গড়ায়। সে হার উন্নত দেশের তুলনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোয় অনেক কম বা নেই বললেই চলে। অপরদিকে কিশোর বয়স থেকে ক্রমাগত ফোনের পর্দায় বা ল্যাপটপ বা আর কোন ডিভাইসের মধ্যে সকল কাজ আর চিন্তা রেখে দিয়ে আমরা যে অকায়িক জীবনে এখন প্রবেশ করেছি তা আমাদের স্বাস্থ্য সমস্যার নতুন মাত্রা যোগ করছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। ইতোমধ্যে মনোজগতের নানা মানসিক পীড়ন আমাদের সংস্কৃতিতে বিকৃতির প্রবেশ করেছে বলে আহাজারি শুরু হয়েছে। প্রতিদিন সংবাদ মাধ্যমে উৎপীড়নের খবর প্রকাশিত হচ্ছে আর তাতে আমরা ডিজিটাল প্রযুক্তিকেই দায়ী করে চলেছি।

একই সঙ্গে আমরা ডিজিটাল যুগের ভয়াবহ আসক্তির মধ্যে ঢুকে পড়েছি, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের ‘ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদের’ বাইরের এক অচিন্তনীয় সামাজিক ও পারিবারিক বিচ্ছিন্ন-সংস্কৃতির মধ্যে মানবসমাজকে ফেলে দিয়েছে। মানুষের সঙ্গে মানুষের অনাদিকালের যে আন্তঃসম্পর্ক তা বৃন্তচ্যুত হয়ে রক্তচক্ষুর পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছে। পিতা-মাতার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক হয়েছে আলগা বাঁধনের, এমনকি স্বার্থের, যা হিসাবের খাতায় ‘ইজা’ রেখে প্রতিটি দিন শুরু করতে হচ্ছে। এই সুখ কি মানুষ চেয়েছিল?

ডিজিটাল জগতে ভালবাসার সম্পর্ক হয়েছে বিভূতিকেন্দ্রিক, ‘তোমার মনে কি আছে তা আমার জানা দরকার নেই, আমার শুধু জানতে হবে তুমি কতক্ষণ আছ’। আর সেভাবে জগত সংসারের অধিকার পরিকল্পনা হচ্ছে। দহন বলে এখন কোন শব্দ প্রেমের জগতে নেই। সেখানে ঠাঁই নিয়েছে সম্পদের অহঙ্কার, ধাতব সৌকর্য যা নির্ধারণ করে দেয় প্রযুক্তির বেঁধে দেয়া সময়। মানুষের পেশা এখন পুরোপুরিই ডিভাইসনির্ভর। ফলে ভাবতে হচ্ছে আমাদের গন্তব্য কতটা সঠিক!

কেউ কেউ মনে করেন ডিজিটাল বৈষম্য দূর হবে কেবল আমাদের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে। তখন সেবা সুবিধা সর্বত্রগামী হবে সে কথা আমরাও মানি; কিন্তু আমার-আপনার ব্যবহারিক বা আচরণগত সংস্কৃতি যদি সমান্তরালে বিকশিত না হয় তাহলে আপনি কি অর্থমূল্যে মানবিক আদর্শ বাজারে কিনতে পাবেন?

ফলে কেবল সুখচিন্তা নয়, উন্নয়ন সূচকের কোথায় মানবিক হতে বাধা তা বের করে নিয়ে আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে হবে। প্রযুক্তি আমাদের পরিবর্তন করছে, আমাদের কাজের ধারা বদলে দিচ্ছে, পরিবেশ ভিন্ন হয়ে উঠছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এই বিকশিত হওয়ার মাধ্যমেই এগিয়েছে; কিন্তু ডিজিটাল প্রযুক্তির মতো অল্প সময়ে আধুনিক সভ্যতার ইতিহাসে প্রভাব আর কোন পরিবর্তনেরকালে ঘটেনি। তাই আমাদের এই বিষয়ে ভাবতে হবে যেন পরের প্রজন্ম আমাদের আজকের ভুল ভূমিকায় বড় কোন মূল্যবোধের দ্বন্দ্বে পড়ে পিছিয়ে না যায়।

লেখক : পরিচালক, আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্প

reyasalimag@gmail.com