২৩ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গণহত্যা ১৯৭১ ॥ চট্টগ্রামের পাহাড়তলী

  • এলিজা খান

গণহত্যা ও বধ্যভূমির ইতিহাস তুলে ধরে মানবতাবিরোধী কর্মকা-ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় অতীতের। একই সঙ্গে এটি মানুষকে তাঁর স্বাধীনতার আনন্দ যেমন দেয়, তেমনি মনে করিয়ে দেয় ত্যাগ ও মর্মস্পর্শী যন্ত্রণার কথা। এরই ধারাবাহিকতায় একাত্তর সালে ঘটে যাওয়া অগণিত গণহত্যার প্রকাশিত প্রমাণচিত্রের একটি হলো ‘পাহাড়তলী গণহত্যা’। মাস্টারদা সূর্যসেন ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের স্মৃতি বিজড়িত পাহাড়তলীতে মাত্র একদিনে প্রায় চারশ নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়। পাহাড়তলী বধ্যভূমিটি চট্টগ্রাম শহরের খুলশীতে অবস্থিত। যা পাহাড় টিলা ও সমতল খোলামেলা জায়গার একটি সমন্বিত রূপ। স্থানীয়ভাবে এই বধ্যভূমিটিকে ‘জল্লাদখানা’ বলা হয়।

মার্চের শুরু থেকেই পাহাড়তলীতে রাজনৈতিক অস্থিরতার সূত্রপাত। তিন মার্চ অসহযোগ আন্দোলনের শুরুতেই বাঙালীর ওপর বিহারিরা হামলা করে। এই আন্দোলনের সমর্থনে সেদিন পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়ে খ- খ- মিছিল। পঁচিশ মার্চ রাতে যখন সেনাবাহিনী থেকে বাঙালী সৈন্যদের নিরস্ত্র করা হচ্ছিল, তখন অনেকেই পালিয়ে পাহাড়তলীতে আশ্রয় নেন। পালিয়ে আসা এসব সৈন্যের বেশিরভাগ ছিলেন চাকরিতে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত এবং তাদের কাছে তেমন কোন অস্ত্রও ছিল না। ছাব্বিশ মার্চ সকালে ক্যাপ্টেন সুবিদ আলী ভুঁইয়া পাহাড়তলীতে এসে পৌঁছলে জোয়ানদের মনোবল বেড়ে যায়। তাঁর নেতৃত্বে প্রায় আশি জন সৈন্য ময়নামতি থেকে আগত পাকিস্তান রেজিমেন্টকে প্রতিহত করতে কুমিল্লার দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এরপর সাতাশ থেকে ঊনত্রিশ মার্চ ভিন্ন ভিন্ন তিনটি ঘটনায় পুরো শহরেই একপ্রকার যুদ্ধ-প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়।

সাতাশ মার্চ পাহাড়তলীসহ পুরো চট্টগ্রামই একটি গুজবের শহরে পরিণত হয়, সীতাকু-ের কুমিরায় বাঙালী সৈন্য ও স্থানীয়দের সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রতিরোধ যুদ্ধের বেশ কিছু সংবাদ প্রতিনিয়তই এলাকাবাসীর কাছে পৌঁছে যাচ্ছিল। আটাশ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ময়নামতি রেজিমেন্ট চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ করে ইস্পাহানি পাহাড়ের ওপর তাদের ঘাঁটি স্থাপন করে এবং ঊনত্রিশ মার্চ ইস্পাহানি মিলের পাহাড় ও পতেঙ্গার যুদ্ধ জাহাজ থেকে হালিশহর আর্টিলারী সেন্টারে গোলা বর্ষণ করা হয়। এভাবে, মার্চ মাস জুড়েই বিহারি-বাঙালীদের মধ্যে বেশ কয়েক দফায় উত্তেজনা দেখা দেয়, যদিও স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সমঝোতার কারণে বড় ধরনের কোন সংঘর্ষ হয়নি। অবশেষে এপ্রিলের শুরুতেই ওয়্যারলেস কলোনির উত্তরে অবস্থিত পুরনো মসজিদটির পাশে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ক্যাম্প স্থাপন করে।

দশ নবেম্বর পাহাড়তলীর সর্ববৃহৎ গণহত্যাটি সংঘটিত হয় এইদিন। পাঞ্জাবী লেন ও মাস্টার লেনের বারো বছর বয়সের বেশি সকল বয়স্ক পুরুষকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় জল্লাদখানায়। অনেকে আবার সেদিন ধোঁকায় পড়ে সহজ সরলভাবেই জল্লাদখানার দিকে এগিয়ে গিয়েছিল। জল্লাদখানায় ধরে আনা সবাইকে দিয়ে প্রথমে পাহাড়ের পাদদেশে গর্ত খোঁড়ানো হয় এবং পরে তাদেরই হত্যা করে এই গর্তে ফেলে রাখা হয়। অবাঙালীরা পাঞ্জাবী লেন, মাস্টার লেন এবং ঝাউতলা স্টেশনে ট্রেন থামিয়ে প্রায় ৪০০ যাত্রীকে জোরপূর্বক ক্যাম্প হাউসের সামনে থাকা বধ্যভূমিতে নিয়ে হত্যা করে পাকিস্তান আর্মি ও তাদের দোসর বিহারীরা। সকাল ৭টা থেকে বিকেল প্রায় তিনটা পর্যন্ত গণহারে বাঙালী নিধন চলে।

‘...বাবার লাশ দেখতে গেলাম (বর্তমান টিভি অফিসের সম্মুখে), ওপরে সাদা হাফ শার্ট দিয়ে পিছ মোড়া করে হাত বাঁধা। ছুরি চালিয়ে জবাই করেছে। গরু যেভাবে কোরবানি দেয়। পেট আড়াআড়িভাবে ফাড়া। ভারি চশমাটা পাশে পড়ে রয়েছে। জিব বের হয়ে রয়েছে। খোলা চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন যেন অনেক প্রত্যাশা একটি নিরাপদ স্বাধীন ভূ-খ-ের।’ ড. গাজী সালেহ উদ্দিনের বর্ণনায় উঠে আসে তাঁর বাবার লাশ দেখার সেই করুণ স্মৃতি।

পাহাড়তলীর এমন অসংখ্য গণহত্যার কোন একটি থেকে বেঁচে ফিরে আসা আব্দুল গোফরানের ভাষায় মধ্যযুগীয় এই লোমহর্ষক গণহত্যার বর্ণনাটি এমন- “ওয়্যারলেস কলোনির রাস্তায় বিহারিরা জড়ো হয়ে উল্লাস করছিল; বিভিন্ন স্থান থেকে যেসব বাঙালিকে ধরে আনা হচ্ছিল তারা তাদের হাত বেঁধে জল্লাদের সামনে ঠেলে দিচ্ছে। এই জল্লাদরা ঝিলের পাশে সমতল নিচু জমিতে বড় বড় তলোয়ার, ছোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একেক ভাগে আট-দশ জনকে হাত-পা বেঁধে প্রথমে কিল-ঘুষি তারপর জল্লাদের সামনে ঠেলে দিচ্ছে। কয়েকজন সাথে সাথে শুইয়ে দিচ্ছে। জল্লাদের তলোয়ার তৎক্ষণাৎ মাথা আলাদা করে ফেলে দিচ্ছে।”

পাহাড়তলী গণহত্যার সাথে মূলত সম্পৃক্ত ছিলো বিহারীরাই। যাদের সবাই দেশ বিভাগের পর এখানে চলে আসে। বিহারী-বাঙালী পূর্বে পাহাড়তলীতে দীর্ঘদিন সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস করলেও, মার্চ মাস থেকে এই সম্প্রীতির সম্পর্কটি ভাঙতে শুরু করে। এই গণহত্যার মূল নকশাকারী পাকিস্তান রেলওয়ের সিগন্যাল ইঞ্জিনিয়ার বিহারি ইউসুফ।

‘পাহাড়তলী গণহত্যা’ সম্পর্কে আরও বিশদভাবে জানতে আগ্রহী পাঠকদের গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট’ কর্তৃক প্রকাশিত ‘গণহত্যা-নির্যাতন নির্ঘণ্ট’ গ্রন্থমালার ‘পাহাড়তলী গণহত্যা’ গ্রন্থটি পড়ার আহ্বান জানাচ্ছি। গ্রন্থটির লেখক চৌধুরী শহীদ কাদের।

লেখক : গবেষণা কর্মকর্তা, গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণাকেন্দ্র