২৩ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুক্তিযুদ্ধ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • ইমাদুল হক প্রিন্স

বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান সন্দেহাতীতভাবে সর্বাগ্রে। এখানকার অকুতোভয় ছাত্র-শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। প্রাণপণে রুখেছেন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে। জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন অকাতরে। শহীদ হয়েছেন হাসতে হাসতে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত থেকে শুরু করে স্বাধীনতা প্রাপ্তির আগ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক ও বিভিন্ন পদমর্যাদার অসংখ্য কর্মকতা-কর্মচারী পাকবাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন। এদের মধ্যে যাদের নাম পরিচয় পাওয়া গেছে তাদের মধ্যে শিক্ষক রয়েছে ১৯ জন, ছাত্র ১০১ জন, কর্মকর্তা একজন ও কর্মচারী ২৮ জন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর হাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুসংখ্যক ছাত্র-শিক্ষক শহীদ হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে নেমে আসে মৃত্যুর হিমশীতল নীরবতা। এ দুর্দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক এগিয়ে আসেন। যেসব শিক্ষক তাদের মনোবল না হারিয়ে শহীদ পরিবারের জন্য এগিয়ে আসেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন অধ্যাপক গিয়াসউদ্দীন আহম্মেদ, মোঃ আবুল খায়ের, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম খান, অধ্যাপক ফজলুর রহমান খান প্রমুখ। অসহায় ও বিপন্ন পরিবারের জন্য অর্থ, খাদ্য, বস্ত্র, ওষুধ সরবরাহের ও সংগ্রহের কাজে তারা নিজেদের আত্মনিয়োগ করেন। যুদ্ধের সময় ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য আশ্রয় নেন পুরনো ঢাকায়। কিন্তু পাকিস্তানী সামরিক জান্তার নির্দেশ মানতে গিয়ে ২১ এপ্রিল ১৯৭১ তার বিভাগে পুনরায় যোগদান করতে বাধ্য হন। তারপর তিনি তার পরিবারের সকল সদস্যকে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইশা খাঁ রোডের ৩১ নং বাসায় চলে আসেন। এ সময় বাধ্যতামূলকভাবে তিনি পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেছিলেন। রাস্তাঘাটে চলতে মাঝে মধ্যেই সেনাবাহিনীকে দেখাতে হতো এ পরিচয়পত্র। পরিচয়পত্রে লেখা থাকত পরিচয়পত্রধারী পাকিস্তানের অনুগত নাগরিক। কিন্তু এসব করেও শহীদ ভট্টাচার্যসহ অনেক শিক্ষকের শেষ রক্ষা হয়নি। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর সকাল ৯টায় একদল রাজাকার-আলবদর বাহিনী অধ্যাপক ভট্টাচার্যকে টেনেহিঁচড়ে বাসার ওপর থেকে নিচে নামিয়ে আনেন। নিচে নেমে অপেক্ষমাণ গাড়িতে চোখ বাঁধা অবস্থায় দেখতে পান অধ্যাপক গিয়াসউদ্দীন ও আবুল খায়েরকে। অধ্যাপক সন্তোষ চন্দ্রকেও চোখ বেঁধে গাড়িতে ওঠানো হলো। এর পরের ঘটনা সবারই অজানা। শোনা যায়, নির্মম অত্যাচারের মাধ্যমে ১৪ ডিসেম্বর বহুসংখ্যক বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে তাকেও হত্যা করা হয়।

(সূত্র : ইতিহাস বিভাগ ঢা.বি.) মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান সম্পর্কে প্রফেসর ড. মোঃ শামসুদ্দীন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ ভূমিকা ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সে জন্য এখানে পাকিস্তানী আক্রমণ হয় মারাত্মক। ছাত্রদের ছাত্রাবাস ও শিক্ষকদের আবাসিক এলাকায় গণহত্যা চালানো হয়। নয় মাসজুড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল হুমকির মুখে। মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থার বর্ণনা করতে গিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ হারুন অর রশিদ বলেন, ‘হানাদারবাহিনীর প্রকৃতি দেখে স্বাভাবিকভাবে যা দেখা যায় তা হলো তাদের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রথম রাতে (২৫ মার্চ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন ছাত্র-শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তারা হত্যা করে। এর পরেও তারা অনেককে হত্যা করার প্রচেষ্টা চালায় কিন্তু ব্যর্থ হয়। তারা প্রথমে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ইকবাল হল (সূর্য সেন হল) ও জগন্নাথ হলে আক্রমণ চালায় এবং বেশ কয়েকজন ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে হত্যা করে। তারা কলা ভবনের সামনের বটগাছটি উপড়ে ফেলে। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে আগুন লাগিয়ে দিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র পুড়িয়ে নষ্ট করে দেয়। সেদিনের ভয়াবহ অবস্থা অঁাঁচ করতে পেরে যদি ছাত্র-শিক্ষকরা সরে না যেত, তবে আরও অনেকে হত্যাকা-ের শিকার হতো।’ মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা সম্পর্কে ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক এএইচ আহমেদ কামাল বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। প্রফেসর ড. মোঃ শাহিনুর রহমান মুক্তিযুদ্ধে ঢাবির ভূমিকা সম্পর্কে বলেন, সামরিক বাহিনী জুন মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দিয়েছিল কিন্তু ছাত্রছাত্রী ক্লাসে আসেনি। ঢাকায় অবস্থানরত শিক্ষকরা ক্লাস নিতে আসত কিন্তু তাদের সবারই সক্রিয় সমর্থন ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। যে কারণে ১৪ ডিসেম্বর দ্বিতীয় হত্যাকা- ঘটেছিল ফলে আবার বেশকিছু শিক্ষক তাদের হাতে নিহত হন। তিনি আরও জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদদের স্মৃতিকে ধরে রাখতে স্থাপন করা হয়েছে নামফলক ও স্মৃতিস্তম্ভ। এসব নামফলক ও স্মৃতিস্তম্ভ তৈরিতে সময় লেগেছে ২৪ বছর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের মূল ফটকের সামনে যে সবুজ চত্বরটি রয়েছে তার একেবারে মূল রাস্তার দিকের অংশে রয়েছে শহীদ ছাত্র, শিক্ষক, কর্মচারীদের একটি নামফলক। মধুর ক্যান্টিনের সামনেই রয়েছে মধুদার স্মৃতি ভাস্কর্য। উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অর্থাৎ ফুলার রোডের সংযোগস্থলে রয়েছে শহীদ স্মৃতিসৌধ বেদি। মধুর ক্যান্টিনের একটু পূর্বদিকে রয়েছে কালো টিনের ওপর সাদা অক্ষরে লেখা শহীদদের নামফলক। জগন্নাথ হলের মন্দিরের কিছু দূরেই আছে শহীদদের নামফলক। শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের গেটে আছে একটি শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ। এসব স্মৃতিস্তম্ভ ও নামফলক চিরদিন দাঁড়িয়ে থাকবে। আর বাঙালী জাতি এদের স্মরণ করবে চিরকাল। শিক্ষার্থীরা মনে রাখবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান। শুধু তাই নয়, শহীদদের স্মৃতিকে অমর করে রাখতে গঠন করা হয়েছে শহীদ গিয়াসউদ্দীনের নামে একটি ট্রাস্ট ও ১টি শহীদ স্মৃতি পাঠাগার, গবেষণাগার, বিভিন্ন স্মারক বৃত্তি ইত্যাদি।