১৮ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সিলেটের লালমাটিয়া

  • মাসুদ রানা

২৬ মার্চ ভোর থেকেই সিলেটে পাকিস্তানী বাহিনী হত্যা, নির্যাতন, লুণ্ঠন ও ধর্ষণ শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় এপ্রিল মাসে তারা সিলেট শহর থেকে ৯ কি. মি. দূরে সুরমা উপজেলার লালমাটিয়াতে ক্যাম্প স্থাপন করে। শিববাড়ি বাজার থেকে ফেঞ্চুগঞ্জ রোড ধরে কিছুদূর গেলেই লালমাটিয়া বধ্যভূমি। স্থানীয়দের ভাষ্য, ‘মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে এতলোককে এখানে হত্যা করা হয়েছে যে- তাদের রক্তে সেখানকার মাটি লাল হয়ে গিয়েছিল। এরপর থেকে এই স্থানটি লালমাটিয়া নামে পরিচিত।’

মোগলবাজারের জোয়াদ মিয়া নামে এক ব্যক্তি একটি নতুন বাস কিনেন। যুদ্ধ শুরু হলে তিনি তার বাসটি কদমতলী থেকে মোগলাবাজারে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য রওয়ানা দিলে, খালি বাস দেখে মানুষ সেটাতি চড়ে বসে। কিছুক্ষণের মধ্যে বাসটি ভরে গেলে যাত্রী নিয়ে কদমতলী ফেঞ্চুগঞ্জ রোডে রওয়ানা দিয়ে শিববাড়ি পার হয়ে লালমাটিয়াতে এসে পৌঁছালে পাকিস্তানী দুটি ফাইটার বিমান দুই দিক থেকে দুটি শেল নিক্ষেপ করে। এ অবস্থায় যাত্রীরা বাস থেকে নেমে রাস্তার পাশে ব্রিজের নিচে আশ্রয় নেয়।

পাকিস্তানী সেনারা পরে এই বাসটিকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তার ডানপাশে রেললাইন ও মাটির সড়কের মাঝামাঝি স্থানে ফেলে ক্যাম্প স্থাপন করে। রাস্তার দুই পাশেই তাদের ক্যাম্প ছিল। এখানে পাকিস্তানী সেনারা যাদের ধরে এনে হত্যা করতো তাদের রাস্তার পশ্চিম পাশে মাটিচাপা দিয়ে রাখতো।

পাকিস্তানী সেনারা প্রায় প্রতিদিন ফিশারির জীপে করে ৫-৬ জন লোককে চোখ ও হাত পিছনে বেঁধে নিয়ে আসতো। এরপর তাদেরকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তা থেকে নিচে নামিয়ে গুলি করে হত্যা করে লাথি মেরে গর্তে ফেলে দিত। এরপর পাকিস্তানী সেনারা মাঠে কাজ করতে আসা স্থানীয় লোকদের ধরে এনে তাদের দিয়ে গর্ত ভরাট করে পরের দিনের জন্য নতুন গর্ত করে রাখত। দিনে দুই তিনবারও জীপ আসতো। প্রতিটি গর্তে ৬-৭ জন এমনকি ১০-১২ জনকেও মাটিচাপা দেয়া হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শী লাল মিয়া জানান।

লাল মিয়া গণহত্যার বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, ‘আমরা গুলির শব্দ শুনে বুঝতে পারতাম যে কতজনকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা বাড়ির পিছনে লুকিয়ে থেকে দেখতাম। অনেক সময় পাকিস্তানী সেনারা যাদের ধরে নিয়ে আসতো তাদের হাতের বাঁধন খুলে দিয়ে দৌড়াতে বলতো এবং দৌড় দিলে পিছন থেকে গুলি করে তাদের হত্যা করা হতো।’

ক্যাম্পে থাকা সৈন্যরা আশপাশের বাড়িতে লুটপাট করতো। লুটপাটে তাদের সহায়তা করেন শাটঘরের বাসিন্দা আব্দুল্লাহ। পাকিস্তনি সৈন্যরা লালমাটিয়াতে ক্যাম্প করার পর আব্দুল্লাহ তাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলে। আব্দুল্লাহ গ্রামের সবাইকে বলে দেয় যাতে কেউ ঘরে বাতি না জ¦ালায়। বাতি দেখলেই সৈন্যরা সে বাড়িতে চলে আসতো। জানা যায়, কয়েকজন স্থানীয় লোককেও এখানে হত্যা করা হয়েছে। যেহেতু পাকিস্তানী সৈন্যদের ভয়ে কেউ সেখানে যেত না তাই তাদের পক্ষে কারও নাম ঠিকানা জানা সম্ভব হয়নি। এমনও হয়েছে যে- গুলির পরে মারা যায়নি কিন্তু তাকে জোর করে মাটিচাপা দেয়া হয়েছে।

তেমন একটি ঘটনার কথা লাল মিয়া বলেনÑ ‘সেই দিন একজন জীবন্ত মানুষকে আমি মাটিচাপা দিয়েছি। সেই লোকটি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও মরেনি। যখন আমি গুলিবিদ্ধ লোকটিকে মাটিচাপা দিচ্ছিলাম তখন তিনি আমাকে কাতর কণ্ঠে বলে,‘ভাই আমি মরিনি, আমাকে মাটিচাপা দিবেন না।’ যেহেতু আমার পিছনে পাকিস্তানী সৈন্যরা অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে ছিল তাই বাধ্য হয়ে আমি তাকে মাটিচাপা দেই।’

লালমাটিয়াতে প্রায় এক মাইল জায়গাজুড়ে রাস্তার পাশ ঘেঁষে গর্ত করে মানুষকে হত্যা করে মাটিচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। স্বাধীনতার পরে লালমাটিয়ায় অনেক মানুষের কঙ্কাল ও অস্থি পাওয়া যায়। লালমাটিয়া নির্যাতন কেন্দ্র ও বধ্যভূমিতে পাকিস্তানী সেনাদের সাথে সাহায্য করে রাজাকার আব্দুল্লাহ, রইদ খাঁ প্রমুখ।

লালমাটিয়া গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী গোটাটিকর ষাটঘরের বাসিন্দা জামাল মিয়া গণহত্যার স্থানটিকে চিহ্নিত করে রাখার জন্য একটি বট গাছ রোপণ করেন। প্রতিবছর জাতীয় দিবসে সেই গাছটিতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন।

এই গণহত্যা সম্পর্কে বিস্তারিত রয়েছে ১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ জাদুঘর ট্রাস্ট প্রকাশিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারি অধ্যাপক তপন পালিতের গবেষণা গ্রন্থ ‘লালমাটিয়া, জৈনপুর ও খাজাঞ্জি বাড়ি গণহত্যা’ নির্ঘণ্ট গ্রন্থমালায়। এই গ্রন্থমালার সম্পাদক ‘মুনতাসীর মামুন’ ও সহযোগী সম্পাদক ‘মামুন সিদ্দিকী’। এ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানের গণহত্যা নিয়ে ‘১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ জাদুঘর ট্রাস্ট’ ৭০টি নির্ঘন্ট গ্রন্থমালা প্রকাশ করেছে।

লেখক : কর্মকর্তা, গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র, খুলনা