১৯ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যাপিত জীবনে স্বাধীনতা

  • সাবিহা রহমান

সবুজ ঘাসের চাদরে ঢেকে আছে মাঠ। আর সেই সবুজ খোলা মাঠে গোল হয়ে বসে আছে একদল তরুণ-তরুণী। দু’একজনের হাতে গিটার। গিটারের টুংটাং বাজনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সবাই গলা ছেড়ে গান গাইছে। দেশের গান, জাগরণের গান। এ দৃশ্য এখন আমাদের কারও কাছে অচেনা নয়। সময়টাই যেন এখন জাগরণের। আর এই জাগরণের জয়গানে তরুণরা তো সবার সামনে। শুধুই তারাই নয়, গোটা দেশ যেন মেতেছে আজ নতুন গানে। আর নতুন সুরের তালে। আবালবৃদ্ধবনিতা আজ স্বাধীনতাযুদ্ধের চেতনায় উদ্দীপ্ত। তারই বহির্প্রকাশ আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও আজ স্পষ্ট। চলনে বলনে, পোশাকে-আশাকে দেশপ্রেমের প্রকাশ চোখে পড়ার মতো।

শত বছরের পুরনো ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি ধরে রেখেছে বাঙালী। যে কোন উৎসবকে কেন্দ্র করে আনন্দে মেতে ওঠে এদেশের মানুষেরা। জাতীয় দিবসগুলোকে ঘিরে এখন আয়োজন করা হয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানের। এসব দিবসই আজ পরিণত হয়েছে উৎসবে। আর এসব উৎসবকে কেন্দ্র করে ঘরে বাইরে সব জায়গায় দেখা যায় বাহারি সাজসজ্জা। ঘরে বাইরে নিজেকে সাজাতে অনেকে বেছে নেন বিশেষ বিশেষ রং এবং বিশেষ কিছু পোশাক। দিবসের তাৎপর্য কিংবা মাহাত্ম্যকে গুরুত্ব দিয়ে এসব নির্বাচন করা হয়।

একুশে ফেব্রুয়ারিতে সাদা-কালো রঙের পোশাক যেনো হয়ে ওঠে ভাষা শহীদদের প্রতি নীরব সম্মান জানানোর মাধ্যম। ২৬ মার্চে লাল-সবুজ-হলুদ, পহেলা বৈশাখে সাদা-লাল আবার ১৬ ডিসেম্বরে লাল-সবুজ যেন এরই ধারাবাহিকতায় চলে আসে। আর ফাল্গুনে বাসন্তী-লাল তো বসন্তের প্রকৃতিরই রূপ। এ রকম ঐতিহ্য আর ইতিহাসের কথা মনে রেখে পোশাক পরেন অনেকেই।

দেশপ্রেম প্রকাশের আয়োজন নানা মাধ্যমে হতে পারে। একজন বাঙালী হিসেবে হৃদয়ে ধারণ করা দেশপ্রেমের চেতনার কিছুটা হলেও তুলে ধরা যায় পোশাকে, মননে তথা গোটা সংস্কৃতিতে। সে ভাবনা থেকেই বিশেষ দিবসগুলোর থিম নিয়ে তৈরি হয় পোশাক, গহনা, গৃহসজ্জার উপকরণ। আমাদের ফ্যাশন হাউসগুলো বিভিন্ন জাতীয় দিবসকে ঘিরে প্রতি বছর নিয়ে হাজির হয় লাল-সবুজের নানা ডিজাইনের পোশাক, যা এ প্রজন্মকে পোশাকের দিক থেকে করছে স্বদেশমুখী। ফলে তাদের ডিজাইনের একটা বড় অংশজুড়ে থাকে দেশাত্মবোধের চেতনা।

বাঙালীর স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলা ভাষার প্রতি সশ্রদ্ধ মমতা এবং এক রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের প্রবল অনুরণন। যে অনুরণনের প্রতিটি মুহূর্তে রয়েছে স্বাধীনচেতা বাঙালীর হাজার বছরের ঐতিহ্যের মহিমান্বিত গৌরব গাথা। দীর্ঘ আন্দোলন, সংগ্রাম, যুদ্ধ এবং পরিণতিতে স্বাধীনতা অর্জন। আর এই অর্জনের ভেতর দিয়েই অন্ধকার সরিয়ে-সরিয়ে বাঙালীর পথচলা হচ্ছে সেই ৪৪ বছর আগে পাওয়া রক্তোজ্জ্বল বিজয়ের আলোয়।

১৯৭১-এর ২৬ মার্চের স্বাধীনতা দিবস এখন ফ্যাশন স্টাইলের অনুষঙ্গ হিসেবে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। এ ফ্যাশন-স্টাইলে উৎসবী আমেজ থাকলেও তার থেকে বেশি থাকে দেশাত্মবোধ তথা দেশপ্রেম। আর সে কারণেই স্বাধীনতা, বিজয় কিংবা ভাষা দিবসের ফ্যাশনের প্রথম চিত্রকল্প হিসেবে পোশাকে, শোপিসে, পটে ওঠে আসে মুক্তিযুদ্ধের স্থিরচিত্রের চিত্রকর্ম, বঙ্গবন্ধু, রবীন্দ্রনাথের মুখচ্ছবি। ’৭১-এর আত্মত্যাগের বাঙালী ধরনটা যেমন হৃদয় ছোঁয়া, মর্মস্পর্শী, আবেগঘন; তেমনি আনন্দময়তার রেশটাও কম নয়। ফলে দুটি রূপেরই প্রতিফলনে বিম্বিত হয় ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর এবং ২১ ফেব্রুয়ারির ফ্যাশন ধারণায়। আর এই ফ্যাশন বোধের মর্মকথাটা চিত্রে ও কবিতার পঙ্ক্তির মাধ্যমে পোশাকে উৎকীর্ণ করার সফল প্রয়াসটা প্রতি বছরের এই বিশেষ দিনগুলোতে করে থাকেন প্রতিষ্ঠিত আউটলেটগুলোর পক্ষে স্ব-স্ব ডিজাইনাররা। ফলে ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সবই ওঠে আসছে তরুণ প্রজন্মের জীবনে-যাপনে, বেশভূষায়।

স্বাধীনতা দিবসের অনুভূতি পোশাকের মধ্যে তুলে ধরতে আমাদের জাতীয় পতাকার রং লাল-সবুজের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে আনন্দের রং সৃষ্টি করা হয়েছে। এভাবেই স্বাধীনতা দিবসের পোশাকের রং হিসেবে ব্যবহার করা হয় আমাদের দেশের সবুজ প্রকৃতির রং আর স্বাধীনতার লাল সূর্যের রং। স্বাধীনতা দিবসের পোশাকগুলো ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়, দায়িত্ব ও মূল্যবোধ থেকেই করা হয়। এই পোশাক যেমন আমাদের স্বাধীনতার চেতনা, তেমনি নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতা সম্পর্কে আগ্রহী করে তোলে।

স্বাধীনতার রং শুধু পোশাকেই নয় ছুঁয়ে যায় অন্যান্য পরিধেও অনুষঙ্গে। ব্যান্ড থেকে ব্যান্ডানা পর্যন্ত ছুঁয়ে থাকে স্বাধীনতার চেতনা। অবশ্য বুদ্ধিজীবীরাও মনে করেন, দিবসভিত্তিক পোশাকের ধারাটা চালু থাকা জরুরী। এতে করে ফ্যাশনের সঙ্গে মানুষের সরাসরি সংযোগ ঘটার পাশাপাশি স্বাধীনতার লাল-সবুজ বসন অঙ্গে জড়ানো হবে। একটা সময় ছিল যখন মানুষ মাথায় গামছা বেঁধে কাজ করত। কিংবা মুক্তিযুদ্ধের অনেক সময়ই দেখা যায় মুক্তিযোদ্ধাদের কপালে পতাকা বেঁধে রাখার দৃশ্য। সময় বদলেছে, এখন জাতীয় পতাকার আদলে তৈরি হয়েছে মাথার ব্যান্ডানা, হাতের ব্যান্ড, ব্রেসলেট, চুড়ি ইত্যাদি। এ ছাড়াও মানচিত্রের ব্যবহারও হচ্ছে এসবে। লাল-সবুজ রঙের মাধ্যমে ওঠে আসে দেশীয় ভাবনার পাশাপাশি দেশীয় সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান ডিজাইনের অনুষঙ্গ হিসেবে। স্বাধীনতা দিবস, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাতীয় জীবনেরই বড় প্রাপ্তির ইতিহাস। এমন একটি দিনে লাল-সবুজের পোশাক কোনভাবেই উপেক্ষা করার উপায় নেই।

ভাষা আন্দোলনের মাসে কিংবা স্বাধীনতার মাসে অথবা বিজয়ের মাসে অনেকে মোবাইল ফোনের রিংটোনে ব্যবহার করেন দেশের গান। ওয়েলকাম টিউনেও সেট করেন দেশাত্মবোধক গান। ফেসবুকের প্রোফাইলেও ব্যবহার করতে দেখা যায় জাতীয় পতাকার ছবি। মাসব্যাপী অনেকেই পরেন ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের থিমভিত্তিক পোশাক। শুধু তাই নয়, পোশাকে থাকে দেশিয় ঐতিহ্যের নানা প্রতিকৃতি। অনেকে আবার দেশপ্রেমের ছোঁয়ায় সাজিয়ে রাখেন আপন ঘরটাকেও। গৃহসজ্জায় ব্যবহৃত উপকরণগুলোয় থাকে নিজস্ব ইতিহাসে আর ঐতিহ্যের ছাপ। ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেন শতভাগ বাঙালিয়ানা। সেখানে হয়ত ঘরের কোণ সাজাতে ঠাঁই পায় একতারা, দোতারা, সুদৃশ্য ডাইনিং টেবিলে দেখা যায় মাটির তৈরি থানা-বাসন, গ্লাস-মগ ইত্যাদি। জানালার পর্দায় ঝুলে থাকে লাল-সবুজের বাহারি পর্দা। ঘরের দেয়ালে থেকে স্মৃতিসৌধ কিংবা রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিও যেন বাদ না পড়ে। সে খেয়ালও থাকে।

ইতিহাস আর ঐতিহ্য নয়। আমাদের সংস্কৃতিও বাদ যায় না এসব থেকে। উৎসবের আমেজকে আরও প্রাণবন্ত করতে বেজে ওঠে দেশীয় গান, দেশের গান। জারি-সারি, ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালী ছাড়াও তরুণ প্রজন্মের শিল্পীর গাওয়া দেশাত্মবোধক গান শুনতে পাওয়া যায় ঘরে-বাইরে। শিল্পীরা বের করেন স্বাধীন বাংলার গান নিয়ে সঙ্কলিত সিডি। এসব গানও শোনা যায় বিভিন্ন শপিংমলে এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। স্বাধীনতার চেতনায় জাগ্রত আজ গোটা দেশ, সমগ্র জাতি, ঘরে বাইরে, কর্মস্থলে সবখানে সবাই সজাগ নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে।

’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ সবই ছিল আমাদের অস্তিত্বের লড়াই। আর এ লড়াইয়ের ইতিহাস আমাদের গৌরবের ইতিহাস। গৌরবময় এ ইতিহাসকে অমলিন রাখতে গোটা দেশ আজ জেগেছে নতুন করে। জাগরণী মন্ত্রে দীক্ষিত সমগ্র বাঙালী জাতি, যাদের চেতনায় আছে মুক্তিযুদ্ধ। আর অনুভূতিতে আছে স্বাধীনতার আনন্দ। তারই প্রকাশে তরুণ কণ্ঠে ধ্বনিত হয় স্বাধীনতার গান। এ ছাড়া মাত্র কয়েক প্রজন্ম আগেও আমাদের পোশাকে যে স্বাধীনতার চেতনাটুকু ছিল অনেকটাই অনুজ্জ্বল। সময়ের বিবর্তনে আজ সেই পোশাক সম্ভারেই লাল-সবুজের দৃপ্ত পদচারণা। উৎসবের যে রং মানুষ এতকাল ধরে তার পরিধেয়র মাঝে ধারণ করত এখন সেই উৎসবের ধারায় যুক্ত হয়েছে দেশপ্রেমের আবহও। আর তাই যে কোন জাতীয় দিবসের মতো স্বাধীনতা দিবসেও এখন সর্বত্রই চোখে পড়ে পোশাকের মাঝে এক টুকরো স্বদেশ।

মডেল-পূর্বা, মেকাপ-জারা’স বিউটি লাউন্স, পোশাক-কে ক্র্যাফট, ছবি-রাকিবুল ইসলাম