১৯ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পুরো প্রজন্ম নিশ্চিহ্নের চক্রান্ত ॥ ২৫ মার্চের কালরাতের সেই অপারেশন সার্চলাইট

পুরো প্রজন্ম নিশ্চিহ্নের চক্রান্ত ॥ ২৫ মার্চের কালরাতের সেই  অপারেশন সার্চলাইট
  • ১৮ মার্চ জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা ও রাও ফরমান আলী মূল পরিকল্পনাকারী;###; ২৫ মার্চ ইয়াহিয়া নির্দেশ দেন মানুষ নয়, মাটি চাই

কাওসার রহমান ॥ অপারেশন সার্চলাইট- বাঙালীদের কমপক্ষে এক প্রজন্মকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার এক নারকীয় পরিকল্পনার নাম। চেঙ্গিস খান ও হালাকু খানের বর্বরতাকেও ছাড়িয়ে যাওয়া ২৫ মার্চের কালরাতের নিষ্ঠুরতার প্রস্তাব করা হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। ওইদিন পশ্চিম পাকিস্তানে পাকি সশস্ত্র বাহিনীর এক বৈঠকে এই অপারেশনের প্রস্তাব করা হয়। আর মার্চের ১৭ তারিখে জেনারেল হামিদ টেলিফোন করে আরেক জেনারেল খাদিম হোসেন রাজাকে এই ভয়াবহ অপারেশনের পরিকল্পনা করার দায়িত্ব দেয়। ১৮ মার্চ সকালে ঢাকা সেনানিবাসের জিওসি কার্যালয়ে বসে জেনারেল রাজা ও কুখ্যাত মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী অপারেশনের মূল পরিকল্পনা তৈরি করেন। পরিকল্পনাটি জেনারেল ফরমান নিজ হাতে হালকা নীল রঙের একটি অফিস প্যাডের ৫ পাতা জুড়ে লিড পেন্সিল দিয়ে লেখেন বলে বিভিন্ন গবেষণা দলিলে উঠে এসেছে।

মূলত রাজনৈতিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নেতৃত্ব প্রদানকারী বাঙালীদের একটি প্রজন্মকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার পরিকল্পনা করা হয় অপারেশন সার্চলাইটে। ওই পরিকল্পনার ছয়টি লক্ষ্য ছিল। ১. সারা পূর্ব পাকিস্তানে একযোগে অপারেশন শুরু করতে হবে। ২. সর্বোচ্চ সংখ্যক রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠনের নেতা, সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গ এবং শিক্ষকদের গ্রেফতার করতে হবে। ৩. ঢাকায় অপারেশন ১০০ ভাগ সফল হতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দখল এবং তল্লাশি করতে হবে। ৪. সেনানিবাসকে সুরক্ষিত রাখার প্রয়োজনে যতো অস্ত্র দরকার ব্যবহার করা হবে। ৫. টেলিফোন, টেলিভিশন, রেডিও ও টেলিগ্রাফসহ সকল অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে এবং ৬. অস্ত্র ও গোলাবারুদ কেড়ে নিয়ে সকল পূর্ব পাকিস্তানী (বাঙালী) সৈন্যদলকে নিষ্ক্রিয় করে দিতে হবে।

১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে এদেশের মানুষ তাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর তার দল আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়। তাদের স্বপ্ন ছিল অত্যাচারী পাকিস্তানী সেনাশাসনের বদলে এদেশে আওয়ামী লীগ ৬ দফা অনুসারে সরকার গঠন করবে। কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনী মনে করে, বাঙালীদের হাতে ক্ষমতা দেয়া মানে পূর্ব পাকিস্তান হাতছাড়া হয়ে যাওয়া। তাই যে কোন মূল্যে পূর্ব পাকিস্তানকে দখলে রাখার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। তারা বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা দেয়ার বদলে তাদের হত্যা করার নীল নক্সাই চূড়ান্ত করে।

বাঙালীদের হত্যার এই নীল নক্সার প্রমাণ পাওয়া যায় পরাজিত পাকিস্তানী বাহিনীর অধিনায়ক নিয়াজির ‘বিট্রায়াল অব ইস্ট পাকিস্তান’ গ্রন্থে। নিয়াজি তার পূর্বসূরী জেনারেল টিক্কা খান প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তার বাইতে উল্লেখ করেছেন টিক্কা তার অধীন পাকিস্তানী সেনাদের বলেছিলেন, ‘আমি মাটি চাই, মানুষ চাই না।’

পাকিস্তানী শাসকচক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টোও। তবে এই ষড়যন্ত্রের আঁচ পেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও। তিনি বুঝতে পারছিলেন, পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী কোনভাবেই বাঙালীদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। তাইতো বিষয়টি তিনি বাঙালী জাতির কাছে স্পষ্ট করার জন্য ২৪ মার্চ সংবাদ সম্মেলন ডাকেন। জনাকীর্ণ ওই সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘জনসাধারণের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে প্রক্রিয়া বানচালের চেষ্টা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের জাগ্রত জনতা, কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র ও জানগণকে আমাদের বিজয় বানচালের ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ করতে প্রস্তুত হতে হবে।’ তিনি পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, ‘জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসনতন্ত্র প্রণয়ন ও তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর বানচালের উদ্দেশ্যে ইচ্ছেকৃতভাবে কৃত্তিম সঙ্কট সৃষ্টি করা হচ্ছে।’

বঙ্গবন্ধুর আশঙ্কাই সত্যি হলো। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ দুপুর ১টা ৫ মিনিটে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আকস্মিক এক বেতার ভাষণে ৩ মার্চ ঢাকায় আহূত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। অধিবেশন স্থগিতের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ঢাকায় বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকা বিমানবন্দর এবং পিআইএর মতিঝিল অফিসের কর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অফিস ছেড়ে চলে যান। ফলে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে প্রদেশের বিভিন্ন রুটে এবং আন্তঃদেশীয় রুটে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বেতারে ইয়াহিয়ার বিবৃতি প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব বাংলার মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বাঙালী জাতি অপেক্ষা করতে থাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাদের কী নির্দেশ দেন। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার মধ্য দিয়ে ভুট্টো এবং জেনারেলদের মধ্যকার ঐকমত্যের বিষয়টি সামনে এলো।

সেদিন হোটেল পূর্বাণীতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি বোর্ডের সভায় ৬ দফাভিত্তিক শাসনতন্ত্র প্রণয়নের কাজ চলছিল। পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক শেষে হোটেল পূর্বাণীতে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রেসিডেন্ট কর্তৃক জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার কঠোর প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, বাংলার জনগণ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার এই সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তিনি এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সর্বাত্মক আন্দোলনের কর্মসূচী হিসেবে ২ মার্চ ঢাকা শহরে ও ৩ মার্চ সারা বাংলায় হরতাল পালন এবং ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জনসভা অনুষ্ঠানের কথা ঘোষণা করেন। ৭ মার্চের জনসভায় বঙ্গবন্ধু সর্বাত্মক আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ কর্মপন্থা ঘোষণা করবেন বলে জানান।

জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণায় বিক্ষুব্ধ মানুষ হোটেল পূর্বাণীর সামনে এসে সমবেত হয়ে স্লোগানে স্লোগানে ঢাকার রাজপথ প্রকম্পিত করে তোলেন। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে এমন গণবিদ্রোহের নজির স্মরণকালের ইতিহাসে নেই।

রাতে প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল এ.এম. ইয়াহিয়া খান ‘খ’ অঞ্চলের সামরিক শাসনকর্তা লে. জেনারেল সাহেবজাদা এম. ইয়াকুব খানকে প্রদেশের বেসামরিক শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। গভীর রাকে ‘খ’ অঞ্চলের সামরিক প্রশাসক এক নতুন আদেশ জারি করে সংবাদপত্রে দেশের অখ-তা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কোন খবর বা ছবি প্রকাশ না করার নির্দেশ দেন। এর মাধ্যমে মূলত ২৫ মার্চ কালরাতের হত্যাযজ্ঞের নীল নক্সা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়। অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে বাঙালীর জাতির একটি প্রজন্মকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করা দরকার। এই শক্তি বৃদ্ধি করতে হবে যাতে বাঙালীরা তা টের না পায়। এজন্য আলোচনার এক নতুন ফন্দি আঁটেন ইয়াহিয়া খান।

মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী তখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের অসামরিক বিষয়গুলো দেখভাল করতেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আলোচনায় রাজি আছে কিনা তা জানার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান দায়িত্ব দেন রাও ফরমান আলীকে। বঙ্গবন্ধুর মতামত জেনে তাকে রাওয়ালপিন্ডির সেনাসদরে যেতে বলেন ইয়াহিয়া খান। সেনাসদরে যাওয়ার আগে ৩ মার্চ রাত ১১টায় তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানম-ির বাসায় যান মুজিবের মন বোঝার জন্য। ফরমান আলী সরাসরি বঙ্গবন্ধুর কাছে জানতে চান, পাকিস্তানকে বাঁচানো যায় কি না। শেখ মুজিবের জবাব ছিল, ‘যায়, যদি আমাদের কথা কেউ শোনে। সেনাবাহিনীর হাতে অনেক মানুষ মারা গেছে। অথচ তারা শুনছে ভুট্টোর কথা। তারা আজ অবধি আমার সঙ্গে কথা বলেনি। এত কিছু ঘটে যাওয়ার পরও আমরা আলোচনা করতে ইচ্ছুক।’

তাঁদের কথাবার্তার একপর্যায়ে ঘরে ঢোকেন তাজউদ্দীন আহমদ। এ ব্যাপারে তাজউদ্দীনের মতামত জানতে চান শেখ মুজিব। তাজউদ্দীন বললেন, ‘হ্যাঁ, রক্ষা পেতে পারে, তবে নতুন এক ফর্মুলায়। এত নৃশংসতার পর ভুট্টোর সঙ্গে এক ছাদের নিচে আমরা আর বসতে পারি না। কারণ বাঙালীদের চোখে সে হলো এক নম্বর খুনী। ইয়াহিয়ার সঙ্গে কথা বলা যায়, যদিও সে দুই নম্বর খুনী। পরিষদের অধিবেশন বসার তারিখ নিয়ে ভেটো দেয়ার কারণে ভুট্টোর সঙ্গে কোন আলোচনায় যাওয়া আর সম্ভব নয়। সবকিছুর জন্য সে দায়ী। এক্ষেত্রে জাতীয় পরিষদ দুই ভাগ হয়ে যাক। একটি পূর্ব, আরেকটি পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য। প্রতিটি পরিষদ তার নিজ অংশের জন্য একটি সংবিধান লিখতে পারে।’ তাজউদ্দীনের কথা শুনে রাও ফরমান আলীর মনে হলো, এটি একটি কনফেডারেশনের ফর্মুলা, ফেডারেশনের নয়। (সূত্র: রাও ফরমান আলী, হাউ পাকিস্তান গট ডিভাইডেড)।

আলোচনার পরিবেশ তৈরির জন্য পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক সামরিক আইন প্রশাসক সাহেবজাদা ইয়াকুব খান ৪ মার্চ ঢাকার রাস্তা থেকে সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরিয়ে নেন। সেনাবাহিনী ব্যারাকে নেয়ার পরবর্তী অবস্থা প্রসঙ্গে রাও ফরমান আলী তার বইতে লিখেন, ‘কার্যত ওই দিনই সাহেবজাদা ইয়াকুব বাংলাদেশে ‘পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব’ ছেড়ে দেন। অবশ্য ৫ মার্চ তিনি সামরিক আইন প্রশাসকের পদের ইস্তফাপত্রও পাঠিয়ে দেন। চিঠিতে তিনি লেখেন, ‘সামরিক ব্যবস্থা মীমাংসার কোন পথ নয়।’

’৭১-এর ১ মার্চের পর পূর্ব পাকিস্তানের চালচিত্র দ্রুত পাল্টাতে থাকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চ বিকালে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে দশ লক্ষাধিক লোকের অভূতপূর্ব সমাবেশে ভাষণ দেন। ২৬ মিনিটের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু আহ্বান জানালেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল, তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।’ তিনি ঘোষণা করেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই। আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়, আমি যদি হুকুম দিতে নাও পারি- তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করো। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশা আল্লাহ।’ এছাড়া শেখ মুজিবের এই ভাষণে পাকিস্তানের সামরিক জান্তার প্রতিও হুমকি ছিল খোলাখুলি, ‘আমরা তোমাদের ভাতে মারব, আমরা তোমাদের পানিতে মারব।’

ঢাকা বেতারে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ রিলে না করার প্রতিবাদে বেতারে কর্মরত বাঙালী কর্মচারীরা কাজ বর্জন করেন এবং বিকেল থেকে ঢাকা বেতার কেন্দ্রের সকল অনুষ্ঠান প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ রিলে করা হবে- এ ঘোষণার পর সারা বাংলায় শ্রোতারা অধীর আগ্রহে রেডিও সেট নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন। গভীর রাতে সামরিক কর্তৃপক্ষ ঢাকা বেতারে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পূর্ণ বিবরণ প্রচারের অনুমতি দিলে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ দিয়ে ঢাকা বেতার কেন্দ্র পুনরায় চালু হয়।

৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ছিল মূলত বাঙালীদের স্বাধীনতা সংগ্রামের শাশ্বত প্রেরণার উৎস। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা সংগ্রামের আহ্বান জানিয়েই ক্ষান্ত হননি। তিনি অহিংস, অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচী দেন, যা বাংলাদেশের সর্বত্র স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হতে থাকে। তিনি বেসামরিক প্রশাসন চালু করার জন্য ৩৫টি বিধি জারির ঘোষণা দেন। ফলে ৭ মার্চ থেকে পূর্ব বাংলা মূলত তার নির্দেশেই চলতে থাকে।

শেখ মুজিবের ‘অহিংস-অসহযোগ’ আন্দোলনের শক্তি এমনই ছিল যে, ঢাকা সেনানিবাস তখন থেকেই পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এমনকি ঠিকাদারেরাও তাদের খাবার সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অধ্যাপক হেনরি কিসিঞ্জার। ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সঙ্গে এ ব্যাপারে তাঁর কথা হয় ১০ মার্চ। নিক্সনকে তিনি বলেছিলেন, ইয়াহিয়া ও পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও পাকিস্তানের অখ-তা রক্ষা করবে। তবে সামরিক অভিযান সফল না-ও হতে পারে। শেখ মুজিব গান্ধীর মতো অহিংস অসহযোগ আন্দোলন করছেন। এই আন্দোলন দমন করার জন্য যুক্তি খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে। তাছাড়া একটি দীর্ঘমেয়াদী বিদ্রোহ শুরু হলে তা দমন করার সামর্থ্য পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর নেই। এ ব্যাপারে প্রেসিডেন্টকে চুপচাপ থাকার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে ভাল হবে নিষ্ক্রিয় থাকা এবং কিছুই না করা, যাতে ইয়াহিয়া আপত্তিকর কিছু মনে না করেন। গৃহযুদ্ধ এড়ানোর বল এখন ইয়াহিয়ার কোর্টে। এ সময় কিছু বলা উচিত হবে না। কেননা পরিস্থিতির ওপর আমাদের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। আমরা কিছু বললে পশ্চিম পাকিস্তানিরা তাকে অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ মনে করতে পারে এবং এর ফলে ভবিষ্যতে আমাদের সম্পর্কে চিড় ধরতে পারে। পাকিস্তান এক আছে, এটা মনে করাই হবে সুবিধাজনক। আমাদের কোন পদক্ষেপ যেন বিচ্ছিন্নতাকে উসকে না দেয়।’ (সূত্র: গ্যারি জে বাস, দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম)।

পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবের সঙ্গে কথাবার্তা বলার জন্য ঢাকা আসতে চাইলেন। তবে তিনি সম্ভাব্য ‘বিরূপ সংবর্ধনা’র মুখোমুখি হতে চাচ্ছিলেন না। তাই ১২ মার্চ রাওয়ালপিন্ডি থেকে একজন সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তাকে ঢাকায় পাঠালেন। ঢাকায় এসে ওই কর্মকর্তা তাজউদ্দীনের সঙ্গে দেখা করতে চান। কামাল হোসেন বিষয়টি শেখ মুজিবকে জানালে তিনি কামালকে ওই কর্মকর্তার সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলতে বলেন। কর্মকর্তাটি বলেন, ইয়াহিয়া যদি ঢাকায় আসেন, তাহলে মুজিব তার সঙ্গে প্রেসিডেন্ট হাউসে দেখা করবেন কি না। এ প্রশ্ন তিনি করছেন, কারণ এর আগে মুজিব গবর্নর হাউসে গিয়ে টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকার করেছিলেন। মুজিব বলেছিলেন, টিক্কা খানকে তাঁর বাসায় এসে দেখা করতে হবে। এটি পরিষ্কার হওয়া দরকার। মুজিব ইয়াহিয়াকে তাঁর বাসায় আসতে বলবেন কি না। কামাল হোসেন বিষয়টি শেখ মুজিবকে জানালে মুজিব বলেন, তিনি ইয়াহিয়ার সঙ্গে তার পছন্দমতো জায়গায় দেখা করবেন। সেটি প্রেসিডেন্ট হাউসও হতে পারে। তবে তিনি যদি তার বাসায় আসেন, তাকে স্বাগত জানানো হবে। (সূত্র: কামাল হোসেন, বাংলাদেশ: কোয়েস্ট ফর ফ্রিডম এ্যান্ড জাস্টিস)।

ইতোমধ্যে ভুট্টো সংবিধান প্রশ্নে একটি ফর্মুলা ঠিক করে ফেলেছেন। এতে ৩ মার্চ রাতে রাও ফরমান আলীকে দেয়া তাজউদ্দীনের প্রস্তাবের মিল আছে। ১৪ মার্চ লারকানায় এক জনসভায় জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, ‘সংবিধান তৈরির আগেই যদি ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হয়, তাহলে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের কাছে এবং পশ্চিম পাকিস্তানে পিপলস পার্টির কাছে তা করতে হবে। তারপর সংখ্যাগরিষ্ঠ এ দুটি দলকে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান তৈরি করতে হবে। (ডন, ১৫ মার্চ ১৯৭১)।

অর্থাৎ ভুট্টোর কথার অর্থ দাঁড়ায়, পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশ আবার ‘এক ইউনিট’ হয়ে যাবে এবং কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যে ক্ষমতার বিন্যাস ঠিক হওয়ার আগেই দেশে দুটি ‘সার্বভৌম অঞ্চল’ তৈরি হবে। বোঝা যাচ্ছিল, শেখ মুজিব যা চাচ্ছিলেন, ভুট্টোও একই পথে পা বাড়াচ্ছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানের প্রশাসন মুজিবকেই খলনায়ক বানানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল এবং একটি ‘সামরিক সমাধানের’ যুক্তি খুঁজছিল।

ওদিকে আওয়ামী লীগের মনে ভুল ধারণা সৃষ্টি করে তাদের ব্যস্ত রাখার জন্য ইয়াহিয়া খান আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অভিনয় করবেন। এমনকি ভুট্টো যদি আওয়ামী লীগের প্রস্তাবে রাজি হয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন, তবুও ইয়াহিয়া আলোচনা চালিয়ে যাবেন।

ফলে ১৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান কড়া নিরাপত্তার মধ্যে করাচী থেকে ঢাকায় আসেন। তার সঙ্গে ছিলেন আইন উপদেষ্টা বিচারপতি এ আর কর্নেলিয়াস, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের চিফ অব স্টাফ জেনারেল পীরজাদা, আইএসআইয়ের প্রধান জেনারেল আকবর, গোয়েন্দা ব্যুরোর পরিচালক এন এ রিজভী এবং পরিকল্পনা কমিশনের উপপ্রধান এম এম আহমদ। বিমানবন্দরে সামরিক গবর্নর লে. জেনারেল টিক্কা খান তাকে স্বাগত জানান। কোন সাংবাদিক ও বাঙালীকে এ সময় বিমানবন্দরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি।

প্রশাসন যাতে সুষ্ঠুভাবে চলে, সে জন্য ১৫ মার্চ শেখ মুজিব ৩৫টি বিধি জারি করেন। প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তাজউদ্দীন আহমদ এটি দেশবাসীকে জানিয়ে দেন। ইয়াহিয়ার ঢাকায় আসা এবং একই সময় এ ধরনের প্রশাসনিক বিধি জারি করার মধ্যে ইঙ্গিতবহ তাৎপর্য আছে। বিষয়টি মোটেও কাকতালীয় নয়। এই বিধিমালার মাধ্যমে শেখ মুজিব মূলত বাংলাদেশের প্রশাসন নিজের হাতে তুলে নেন। ইয়াহিয়া তখন সত্যিকার অর্থে আর প্রেসিডেন্ট নন। তিনি একজন অতিথি।

১৬ মার্চ বেলা ১১টায় প্রেসিডেন্ট হাউসে শেখ মুজিব আসেন গাড়িতে কালো পতাকা লাগিয়ে। শুরু হয় তাদের ‘আলোচনা পর্ব’। ওই দিনই টিক্কা খান, খাদিম হোসেন রাজা ও রাও ফরমান আলীকে সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার নির্দেশ দেন। এ পরিকল্পনারই নাম দেয়া হয় ‘অপারেশন সার্চলাইট’। (সূত্র : মহিউদ্দিন আহমদ, আওয়ামী লীগ, যুদ্ধদিনের কথা ১৯৭১)।

মুজিবের সঙ্গে ইয়াহিয়ার আলোচনা ছিল লোক দেখানো। এই আলোচনার আড়ালে সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য রণ প্রস্তুতি শুরু করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। ওই সময় সেনাবাহিনীর কট্টরপন্থীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন জেনারেল আবু বকর ওসমান মিঠা, খুদাদাদ খান, ইফতেখার জানজুয়া ও গোলাম উমর। তারা পূর্ব পাকিস্তানে বিদ্রোহ দমনের জন্য সামরিক হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। কঠোর সামরিক পদক্ষেপের জন্য তাদের ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। সামরিক জান্তার ধারণা ছিল, ঢাকায় অবস্থানরত ভারপ্রাপ্ত আঞ্চলিক সামরিক আইন প্রশাসক খাদিম হোসেন রাজা এবং রাও ফরমান আলী অতটা কঠোর হতে পারবেন না। (সূত্র: লে. জেনারেল কামাল মতিনউদ্দিন, ট্র্যাজেডি অব এররস)।

এই হামলার জন্য চারটি ব্রিগেডে মোট ১২টি পদাতিক ব্যাটালিয়ন আসে আমাদের দেশে। আর সব দলেই ছিল শুধু পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্য, বিশেষ করে পাঞ্জাবি, বেলুচ, পাঠান এবং সিন্ধি সৈন্যরা। তাদের ২৫ মার্চের আগেই পূর্ব পাকিস্তানে নিয়ে আসা হয়। তাদের সঙ্গে আরও ছিল ৫টি ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্ট, একটি হালকা এন্টি এয়ারক্রাফট রেজিমেন্ট আর একটি কমান্ডো ব্যাটালিয়ন।

ঢাকার বিমানঘাঁটিতে পাকিস্তানি বিমান বাহিনীর ২০টি এফ-৮৬ স্যাবর জেট ও ৩টি টি-৩৩ প্রশিক্ষণ বিমান ছিল। এগুলোর সঙ্গে সে রাতের জন্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আরও আনা হয় ৪টি এমআই-৮ এবং ৪টি এলট-ওওও হেলিকপ্টার আর সি-১৩০ হারকিউলিস বিমান। আর এগুলো রাখা হয় চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, লালমনিরহাট, সিলেট, যশোর আর ঠাকুরগাঁওয়ের বিমান ঘাঁটিগুলোতে।

জলপথের জন্য পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান নৌবাহিনীর চারটি গানবোট, একটি পেট্রোল বোট আর ‘পিএনএস জাহাঙ্গীর’ নামের একটি ডেস্ট্রয়ার ছিল। আর অপারেশন শুরুর পর পূর্ব পাকিস্তানে আনা হয় ‘পিএনএস বাবুর’ নামের পাকিস্তানি নৌবাহিনীর পতাকাবাহী একটি জাহাজ। নৌঘাঁটিগুলোর বেশিরভাগই ছিল ঢাকা, চট্টগ্রাম ও মংলায়।

ঠিক হয়, ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটে নেতৃত্ব দেবেন মেজর জেনারেল ফরমান আলী খান। তার নেতৃত্বে ঢাকায় পাকিস্তানী বাহিনী এ দেশের ঘুমন্ত মানুষদের হত্যা করার জন্য সেনা ছাউনী ছেড়ে বেরিয়ে যাবে লোকালয়ে। তাদের লক্ষ্যগুলো হলো- ১. রাত ১১টায় সারা ঢাকা শহরে কারফিউ দেয়া হবে। পাশাপাশি টেলিফোন, টেলিগ্রাফ, রেডিও স্টেশন এবং সকল প্রকার পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়া হবে। ২. ঢাকা শহরের সড়ক, রেল ও নৌ-পথের দখল নিয়ে পুরো শহরকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হবে এবং নদীগুলোতে টহল জারি থাকবে। ৩. অপারেশন চলার সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের আরও ১৫ জন প্রধান নেতাকে গ্রেফতার করা হবে। ৪. ধানম-ি এলাকায় এবং হিন্দু এলাকাগুলোতে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করা হবে। ৫. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইপিআর সদর দফতর এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইন ধ্বংস করা এবং ২য় ও ১০ম ইপিআরকে (যেগুলো বাঙালীদের নিয়ে গঠিত) নিরস্ত্র করা হবে এবং ৬. গাজীপুর অস্ত্র কারখানা এবং রাজেন্দ্রপুরের অস্ত্রগুদাম দখল ও সেগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।

পরিকল্পনায় পূর্ব নির্ধারিত আক্রমণাত্মক অপারেশন পরিচালনার জন্য চিহ্নিত স্থানগুলো ছিল- ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, রাজশাহী, রংপুর, সৈয়দপুর এবং সিলেট। এজন্য এসব স্থানে পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যও বেশি বেশি করে জমা করা হলো। পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য স্থানে অবস্থিত সৈন্যদল এবং প্যারা মিলিটারি বাহিনী তাদের নিজ নিজ এলাকা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে থেকে যাবে এবং প্রয়োজন হলে অন্যান্য স্থানে প্রাথমিক অপারেশনের সময় শক্তি বৃদ্ধির উদ্দেশে যোগ দেবে। ঢাকা সম্পূর্ণ নিরাপদ হলে পাকিস্তানের ৯ম এবং ১৬তম ডিভিশনের সৈন্যরা শক্তিবৃদ্ধির জন্য বিমান যোগে ঢাকা চলে আসবে।

আলোচনার আড়ালে ইয়াহিয়া খান সামরিক অভিযানের প্রস্তুতির খবর নেন। অভিযানের প্রস্তুতি হিসাবে মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলির নির্দেশে ২৫ মার্চ সকালে পিলখানার নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়ে নেয় পাকিস্তানি সেনারা। তখন বাঙালী ইপিআর অফিসারদের পাকিস্তানী অফিসাররা পিলখানায় নানাভাবে ব্যস্ত রাখে এবং সৈন্যদের প্রায় সবাইকেই কাজ বন্ধ রেখে বিশ্রামে পাঠানো হয়। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে গ্রীন সিগনাল পাওয়ার পর ২৫ মার্চ বিকেলে ইচ্ছে করেই ইয়াহিয়া খান রাজনৈতিক সমাধানের পথ বন্ধ করে দিয়ে আলোচনা ব্যর্থ করে দেন। কারণ আলোচনার টেবিলে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকটের সমাধান করতে হলে নির্বাচনে দলের নেতা বঙ্গবন্ধুর কাছে পাকিস্তানের ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। যেহেতু আওয়ামী লীগ তথা পূর্ব পাকিস্তানের কোন রাজনৈতিক দলের কাছে সামরিক জান্তারা ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। তাই তারা পরিকল্পনা মোতাবেক আলোচনা ব্যর্থ করে দেন।

আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ইয়াহিয়া খান আর ঢাকায় অবস্থান করেননি। তিনি সন্ধ্যা পৌনে ছয়টায় প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে সরাসরি এয়ারপোর্টে চলে যান। রাত পৌনে আটটায় তিনি গোপনে বিমান যোগে ঢাকা ত্যাগ করেন। ইয়াহিয়া খান ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে পূর্ব বাংলায় নিরপরাধ বাঙালীদের ওপর কাপুরুষোচিত সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি শুধু বাংলার মাটি চাই, মানুষ নয়।’

সন্ধ্যার পরপরই সারা শহরে গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয় ‘ইয়াহিয়া খান ঢাকা ছেড়ে চলে গেছে’। তখন আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাসেবকরা রাস্তায় রাস্তায় হালকা ব্যারিকেড বসানো শুরু করে। কিন্তু এই সব প্রতিবন্ধকতা পাকিস্তানী সৈন্যদের ভারি ভারি অস্ত্রশস্ত্র ও সাঁজোয়া যানের কাছে পাত্তাই পায় না। যেসব স্বেচ্ছাসেবকরা রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা স্থাপন করছিল উল্টো তারাই প্রথম সৈন্যদের আক্রমণের শিকার হয় এবং পাকিস্তানী জান্তারা তাদের হত্যা করে।

যদিও অপারেশন রাত ১১টায় শুরু হবার কথা, পাকিস্তানী সৈন্যরা সাড়ে ১১টায় ঢাকা সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে আসে। কারণ পাকিস্তানী ফিল্ড কমান্ডার চাইছিলেন যে বাঙালী সৈন্যরা যাতে কোন বাধা দিতে না পারে। সেনাবাহিনীকে পুরো অপারেশনের জন্য ৬ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেয়া হয়েছিল। পাকিস্তানী সৈনরা আক্রমণ শুরু করার আগে আগেই দ্রুততার সঙ্গে ঢাকা শহরের সকল যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

১০ম বেঙ্গল রেজিমেন্টকে সেনানিবাসে পাকিস্তানীরা সহজেই নিরস্ত্র করে দেয় এবং তাদের হত্যা করে। ৩১তম ফিল্ড রেজিমেন্টকে ঢাকার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এবং শহরের উত্তরাংশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেয়া হয়। মেজর বেলাল এবং লে. কর্নেল জেড এ খানের সঙ্গে নিযুক্ত কমান্ডো বাহিনী অপারেশনের শুরুতেই শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে। বঙ্গবন্ধুকে রাত দেড়টায় তার বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পাকিস্তানী সৈন্যরা। কিন্তু আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ বড় নেতাই পাকবাহিনীর চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

বালুচ রেজিমেন্টটি ইপিআর সদর দফতরে অবস্থিত নিরস্ত্র আর অসংগঠিত ইপিআর সৈন্যদের আক্রমণ করে। সেখানে বাঙালী অসীম সাহসী যোদ্ধারা সারা রাত যুদ্ধ করে সুসজ্জিত পাকবাহিনীকে আটকে রাখে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সকালের দিকে তারা হেরে যায়। তাদের বেশিরভাগই সেখানে মারা যান এবং বাকিরা পালিয়ে যান। পাকিস্তানী বাহিনী এক রকম কোনো বাধা ছাড়াই মিরপুরে অবস্থানরত ইপিআর বাহিনীকে গ্রেফতার এবং রাষ্ট্রপতি ভবন ও গবর্নর হাউস দখল করে নেয়। এখানেও অনেক বাঙালী পালাতে পারলেও বেশিরভাগই মারা যান।

পাঞ্জাব রেজিমেন্টের দুটি অনিয়মিত বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা আক্রমণ করে। ছাত্ররা আর আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাসেবীরা তাদের বাধা দেয়ার চেষ্টা করলেও তারা পাকবাহিনীর হাতে মারা যান। প্রত্যেকটি হলে ঢুকে নিরস্ত্র ছাত্রদের খুঁজে বের করে হত্যা করে সেনা সদস্যরা। একই সঙ্গে হত্যা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু অগ্রগণ্য শিক্ষককেও।

রাজারবাগে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যরা স্বেচ্ছাসেবী ও স্থানীয় মানুষের সহায়তায় পাক জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু পাকিস্তানীদের ভারি অস্ত্রশস্ত্রের কাছে তারাও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়। যারা বেঁচে যায় তাদের বেশিরভাগই ধরা পড়েন অথবা এদিক সেদিক পালিয়ে যান। ২৬ মার্চ সকালে সেনা সদস্যরা হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা এবং পুরান ঢাকা আক্রমণ করে।

ভোরের মধ্যে ঢাকা শহর আক্রমণকারীদের দখলে চলে যায়। এরপর খুনীরা শহরজুড়ে কারফিউ জারি করে। বেঁচে যাওয়া পুলিশ এবং ইপিআর সেনারা শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়, কেউ কেউ বুড়িগঙ্গা নদী পার হয়ে জিঞ্জিরায় গিয়ে সংগঠিত হতে থাকেন।

শুধু হত্যা আর গ্রেফতারই নয়, হায়েনারা শহীদ মিনার, দৈনিক ইত্তেফাকের কার্যালয়, ডেইলি পিপলসের কার্যালয় আর রমনার কালী মন্দিরও ধ্বংস করে দেয়। ধরা পড়া বাঙালী সৈন্য এবং ইপিআর ও পুলিশ কর্মকর্তাদের হয় মেরে ফেলা হয় নয়তো কোন বিচার ছাড়াই জেলখানায় বন্দী করা হয়। এই অপারেশন চলতে থাকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত।

অপারেশন সার্চলাইটে ঠিক কত লোক মারা পড়েন তার সঠিক কোন হিসাব নেই। তবে বিভিন্ন গবেষণায় ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞের কালরাতে কয়েক লাখ বাঙালীকে বর্বর কায়দায় হত্যা করা হয়েছিল বলে জানা যায়।

ঐতিহাসিকভাবে এটা ছিল বৈধ দাবির সপক্ষে বাঙালীর কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য সেনা অভিযান। জেনারেল এ এ কে নিয়াজি নিজেই স্বীকার করেছেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতের নিষ্ঠুরতা চেঙ্গিস খান ও হালাকু খানের বর্বরতাকেও ছাড়িয়ে গেছে। পরাজিত পাকিস্তানী বাহিনীর অধিনায়ক তার ‘বিট্রায়াল অব ইস্ট পাকিস্তান’ গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন, ‘২৫ মার্চের সামরিক অভিযান বুখারা ও বাগদাদে চেঙ্গিস খান ও হালাকু খানের গণহত্যার চেয়েও বেশি নিষ্ঠুর ছিল।’

নিয়াজি অবশ্য তার লেখা বইয়ে এ বর্বরতার জন্য পূর্বসূরী জেনারেল টিক্কা খানকে দায়ী করেছেন। টিক্কা খানই নাকি তার অধীন পাকিস্তানী সেনাদের বলেছিলেন, ‘আমি জমি চাই, মানুষ চাই না।’ আসলে এ নির্দেশটি ছিল ইয়াহিয়া খানের। ইয়াহিয়া খানই ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে পূর্ব বাংলায় নিরপরাধ বাঙালীদের ওপর কাপুরুষোচিত সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি শুধু বাংলার মাটি চাই, মানুষ নয়।’

নিয়াজি পরে ঢাকায় পাকিস্তানী বাহিনীর অধিনায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করেন বলে তিনি ওই বর্বরতা প্রত্যক্ষ করেননি বলে দাবি করেন। তবে সে সময় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর তৎকালীন জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ওই কালরাতের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি এটাকে ‘হলোকাস্ট’ বলে অভিহিত করেছেন।

সিদ্দিক সালিক লিখেছেন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান এবং তার স্টাফ ওই রাতে (২৫ মার্চ) দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে পরিচিত বর্তমান শেরেবাংলানগরে অতিবাহিত করেন। ঢাকায় এবং বাইরে অভিযানের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্যই তারা যেখানে অবস্থান করেন। তিনি স্মরণ করেন, ‘ঢাকায় সেই রাত ছিল বসন্তের রাতের মতোই আনন্দময়। একটি রক্তাক্ত ‘হলোকাস্ট’-এর জন্য সবকিছু প্রস্তুত ছিল।’

সিদ্দিক সালিক তার ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ বইতে আরও লিখেছেন ‘সামরিক অভিযান শুরু হওয়ায় নরকের দরজা খুলে গিয়েছিল।’ বারান্দা থেকে তিনি চার ঘন্টা ধরে সেসব ভয়াবহ দৃশ্য দেখেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘সেই রক্তাক্ত রাতের দৃশ্যই ছিল এ রকম ধোঁয়ার কালো মেঘ ও উর্ধমুখী অগ্নিশিখা আকাশের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। এ সময় উজ্জ্বল আগুন তার ঝলকানিকে ছাড়িয়ে আকাশের তারাগুলোকে স্পর্শ করতে চাচ্ছিল।’ ‘পরের দিন ভুট্টো যখন মন্তব্য করলেন সামরিক অভিযানের কারণে পাকিস্তান রক্ষা পেয়েছে, তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গণকবরের খোঁজ করছিলাম। সেখানে অমি পাঁচ থেকে পনেরো মিটার দীর্ঘ তিনটি গর্ত দেখতে পাই। সেগুলো ছিল মৃতদেহে পরিপূর্ণ।’

গণহত্যা সম্পর্কে অনুসন্ধান শেষে সিদ্দিক সালিক ২৬ মার্চ দুপুরে সেনানিবাসে ফিরে আসেন দুপুরের খাবারের জন্য। সেখানে তিনি দেখতে পান যথেষ্ট অন্যরকম পরিস্থিতি। যেন নগরীতে এই শোকাবহ ঘটনা সামরিক বাহিনীতে কর্মরত এবং তাদের ওপর নির্ভরশীলদের স্নায়ুবিক চাপ দূর করে দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘অফিসার্স মেসে ফূর্তিরত কর্মকর্তারা মুক্ত বায়ুতে শ্বাস নেয়ার মতো করে বিশ্রাম নিচ্ছিল। কমলার খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে জনৈক ক্যাপ্টেন চৌধুরী বলেন, বাঙালীদের ভালভাবে বাছাই করা হয়েছে, কমপক্ষে এক প্রজন্মের জন্য।’ আরেকজন কর্মকর্তা মেজর মালিক বলেন, ‘হ্যাঁ, তারা শুধুমাত্র বলপ্রয়োগের ভাষাই বোঝে। ইতিহাস তাই বলে।’

কিন্তু এটা তাদের জানা ছিল না যে, কিভাবে তারা মাত্র নয় মাস পরে ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালে ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। বাংলার কসাই নামে পরিচিত খুনী টিক্কা খানের ধারণা ছিল ১০-১৫ দিনের মধ্যেই এসব হামলায় ভয় পেয়ে বাঙালীরা লেজ গুটিয়ে বলবে, ‘ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি।’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাঙালীরা ওদের কেমন ‘বাংলার ক্যাদোর মইদ্যে শুয়াইয়া গাব্বুর মাইর দিলো’, সে গল্প কে না জানে!