২৪ মার্চ ২০১৯

অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রত্যয়ে স্বাধীনতা উৎসব শুরু

 অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের  প্রত্যয়ে স্বাধীনতা উৎসব শুরু

স্টাফ রিপোর্টার ॥ তপ্ত দুপুর পেরিয়ে নেমে আসে স্নিগ্ধ বিকেল। শোনা যায় নূপুরের নিক্বনধ্বনি। ভেসে বেড়ায় দেশাত্মবোধক গানের সুর। স্বাধীন স্বাধীন দিকে জাগছে বাঙালিরা/রুখবে তাদের কারা, আজ রুখবে তাদের কারা ...। এই গানের তালে মুদ্রার সঙ্গে অভিব্যক্তির মেলবন্ধনে নেচে যায় এক ঝাঁক নৃত্যশিল্পী। তার আগে সম্মেলক কণ্ঠে গীত হয় বাঙালীর প্রাণের সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি। নাচ-গানের সমান্তরালে এগিয়ে যায় স্বদেশপ্রেমের কবিতার শিল্পিত উচ্চারণ। এভাবেই নৃত্য-গীত, কবিতা ও পথনাটকের সম্মিলনে অপশক্তির বিরুদ্ধে আপোসহীন সংগ্রামের প্রত্যয়ে শুরু হয় স্বাধীনতা উৎসব। শনিবার থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট আয়োজিত স্বাধীনতা উৎসবের সূচনা হয়। অশুভের সঙ্গে আপোসবিহীন দ্বন্দ্ব চাই প্রতিপাদ্যে তিন দিনব্যাপী উৎসবের উদ্বোধন করেন চলচ্চিত্র ও নাট্য নির্মাতা বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দীন ইউসুফ। একই দিনে ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরেও এ উৎসবের সূচনা হয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই সকল শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মিনারের মূল বেদিতে অর্পণ করা হয় পুষ্পাঞ্জলি। এরপর নীরবতা পালন শেষে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদের শিল্পীরা। সোনার বাংলার সুরটি থামতেই লাল-সবুজ পোশাকে আবৃত শিল্পীরা গেয়ে শোনায় দেশের গান ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’। গানের পর নাচ করে নৃত্য সংগঠন স্পন্দনের নৃত্যশিল্পীবৃন্দ। প্রথম পর্বের উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা শেষে ছিল বর্ণিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।

উৎসব উদ্বোধন করেন নাসির উদ্দীন ইউসুফ। জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি মুহাম্মদ সামাদ, পথনাটক পরিষদের সভাপতি মান্নান হীরা, জোটের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ঝুনা চৌধুরী, পথনাটক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আহমদ গিয়াস প্রমুখ। স্বাগত বক্তব্য দেন জোটের সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ।

উদ্বোধনী বক্তব্যে বাহাত্তরের সংবিধানের পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ-এই চারটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করেই সংঘটিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ। সেই চার স্তম্ভের ওপরই নির্মিত হয়েছিল এদেশের সংবিধান। কিন্তু পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর সেই সংবিধানকে নানাভাবে কাটাছেঁড়া করা হয়। বদলে যায় মানব মুক্তির সেই সনদ। যুক্ত হয় মুক্তিযুদ্ধ পরিপন্থী অনাকাক্সিক্ষত বিষয়বস্তু। সম্প্রীতির এই বাংলাদেশে বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, নইলে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের জীবনদান বৃথা যাবে। আর বাহাত্তরের মূল নীতিতে ফিরে যেতে না পারায় আওয়ামী লীগ সরকারকেও নানা সময়ে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। তাই অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই এখনও অব্যাহত আছে। এই লড়াইয়ে আমরা বলছি মুক্তির কথা আর অপর শক্তিটি অবরুদ্ধ থাকার কথা বলছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র তৈরি হচ্ছে মাত্র। স্বশাসিত হওয়ার সংস্কৃতি শুরু হয়েছে কেবল। তাই মানবতাবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে গোলাম কুদ্দুছ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিস্তারে কেবল মুখে মুখে ‘সংস্কৃতিবান্ধব সরকার’ এর কথা বললে হবে না। শুধুমাত্র একটি পতাকা আর মানচিত্রের জন্য মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার পাশাপাশি শোষণমুক্ত সমাজ বিনির্মাণ ও বাঙালিত্বের মূল্যবোধ জাগ্রত রেখে সেই কাক্সিক্ষত সমাজ ও রাষ্ট্র গড়তে হবে। তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির যে প্রস্তাব উঠেছে সেটা কোনভাবেই বাস্তবায়ন করা উচিত হবে না। কারণ, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির চাপ সরাসরি এসে পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। একইভাবেই রেলের টিকেটের মূল্যবৃদ্ধি করা হলেও সেই চাপটি এসে পড়বে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর। তাই গ্যাস ও রেলের টিকেটের মূল্যবৃদ্ধি না করার বিষয়ে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

হাসান আরিফ বলেন, মাদক ও সন্ত্রাসের মতো সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে কোন আপোস চলবে না। একইভাবে বর্তমান সরকার নদী দখলদারদের বিরুদ্ধেও শুদ্ধি অভিযান চালাচ্ছে। এটা অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু প্রণীত বাহাত্তরের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ নিতে হবে। আর প্রতিটি উপজেলায় শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম বিস্তারের মাধ্যমে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে সংস্কৃতির আলো। কারণ, সংস্কৃতির শক্তি দিয়েই লড়তে হবে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে।

২৬ মার্চ পর্যন্ত কেন্দ্র কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চে একযোগে চলবে এ উৎসব। প্রতিদিনের অনুষ্ঠান শুরু হবে বিকেল ৫টায়।