২০ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অগ্নিঝরা মার্চ

অগ্নিঝরা মার্চ

শাহাব উদ্দিন মাহমুদ ॥ ১৯৭১ সালের ছাব্বিশে মার্চ ছিল শুক্রবার। সংগ্রামী জনতা রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়েছে। রাত ১২টায় মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী পূর্ব পরিকল্পিত ‘অপারেশন সার্চলাইট’ অনুযায়ী শুরু করেছে ইতিহাসের পৈশাচিকতম হত্যাকা-, বাঙালী নিধনে গণহত্যা। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত বাঙালীর জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের লড়াইকে সশস্ত্রপন্থায় নিশ্চিহ্ন করতেই এই হীন চক্রান্ত। চারদিকে প্রচ- বিস্ফোরণের শব্দ ছাপিয়ে বাঙালীর হৃদয়ে অনুরণিত হচ্ছিল বঙ্গবন্ধুর সেই নির্দেশ, আমার আবেদন ও আদেশ দেশকে স্বাধীন করার জন্য শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান।’ কোন আপোস নাই, জয় আমাদের হবেই। আমি যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছি আমার স্বপ্নের সেই বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই হবে। ওরা অত্যাচার করবে, নির্যাতন করবে। কিন্তু ‘আমার বাংলাদেশের মানুষকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না।’ বর্বর পাকিস্তানী বাহিনী বাংলার মানুষকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। মাত্র নয় মাসের মধ্যে ৩০ লক্ষাধিক প্রাণ আর ৪ লক্ষাধিক মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা অর্জন করি প্রিয় মাতৃভূমির সুমহান স্বাধীনতা। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাক হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র নিরপরাধ বাঙালীর বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ শুরু করলে-মুক্তি সংগ্রামের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন: ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিতে পিলখানায় ইপিআর ঘাঁটি, রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণ করেছে এবং শহরের লোকদের হত্যা করছে। ঢাকা, চট্টগ্রামের রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ চলছে। আমি বিশ্বের জাতিসমূহের কাছে সাহায্যের আবেদন করছি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সঙ্গে মাতৃভূমি মুক্ত করার জন্য শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। সর্ব শক্তিমান আল্লাহর নামে আপনাদের কাছে আমার আবেদন ও আদেশ দেশকে স্বাধীন করার জন্য শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান।’ কোন আপোস নাই, জয় আমাদের হবেই। আমাদের পবিত্র মাতৃভূমি থেকে শেষ শত্রুকে বিতাড়িত করুন। সকল দেশপ্রেমিক ও স্বাধীনতা প্রিয় লোকদের এই সংবাদ পৌঁছে দিন। আল্লাহ আপনাদের মঙ্গল করুন। জয় বাংলা। স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক বাহিনীর প্রধান লে. জেনারেল নিয়াজীর জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক তার ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘যখন প্রথম গুলিটি বর্ষিত হলো, ঠিক সেই মুহূর্তে পাকিস্তান রেডিওর সরকারী তরঙ্গের কাছাকাছি একটি তরঙ্গ থেকে ক্ষীণস্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। ওই কণ্ঠের বাণী মনে হলো পূর্বেই রেকর্ড করে রাখা হয়েছিল। তাতে শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।’ স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে তিনি আরও লিখেছেন, ঘোষণায় বলা হয়, ‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে আছেন, আপনাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর মোকাবেলা করার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আপনাদের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।’ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাক হানাদার বাহিনী বিভীষিকাময় অবস্থার সৃষ্টি করে মেশিনগান মর্টারের গোলায় আর অগুনের লেলিহান শিখায়। অপরদিকে এই রাতে উদ্ভব হয় নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের। নব সূর্যোদয়ের মধ্যদিয়ে সূচীত হয় নতুন প্রতিজ্ঞার ইতিহাস। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীন বাংলার অবরুদ্ধ রাজধানী ঢাকা ছাড়া সমগ্র বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা দিনে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলিত হয়। সকালে ঢাকা সেনানিবাসের অভ্যন্তরের আদমজী কলেজ থেকে বন্দী অবস্থায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্টাফ হাউসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁকে সারাদিন আটকে রেখে সন্ধ্যায় অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। পাক হানাদার বাহিনী ঢাকায় দিনরাত কারফিউ দিয়ে দলে দলে রাস্তায় নেমে ভবন, বস্তি ও আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের বাসভবনের ওপর ভারি মেশিনগান ও কামানের গোলা নিক্ষেপ করতে থাকে। এলাকার পর এলাকা আগুন লাগিয়ে ভয়ার্ত নর-নারী-শিশুকে অগ্নিদগ্ধ করে এবং গুলি করে হত্যা করে। বিদেশী সাংবাদিকদের হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে আটক রাখা হয়। অবাঙালী নাগরিকদের সহযোগিতায় পাক সেনারা দুপুরে পুরান ঢাকা আক্রমণ করে এবং মধ্যরাত পর্যন্ত ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। পাক হানাদার বাহিনী দ্য পিপল, সংবাদ, ইত্তেফাক, বাংলার বাণী অফিসে এবং কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ট্যাঙ্কের গোলায় ধ্বংস করে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একাধিক গণকবর খুঁড়ে সেখানে শত শত লাশ মাটি চাপা দিয়ে তার ওপর বুলডোজার চালায়। নগরীর বিভিন্ন স্থানে সারারাত ধরে হাজার হাজার লাশ মাটি চাপা দেয়া হয়। পুরান ঢাকায় নিহতদের লাশ বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেয়া হয়। বন্দর নগরী চট্টগ্রামকে সশস্ত্র যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে দেশের সর্বত্র চলে সশস্ত্র প্রতিরোধ। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হ্যান্ডবিল আকারে ইংরেজী ও বাংলায় ছাপিয়ে চট্টগ্রামে বিলি করা হয়। বিলি করা হয় রাজশাহী, খুলনা, সিলেটসহ বড় বড় শহরগুলোতে। আওয়ামী লীগের শ্রম সম্পাদক জহুর আহমেদ চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা চট্টগ্রাম’ ইপিআর সদর দফতর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ওয়্যারলেস মারফত প্রেরণের ব্যবস্থা করেন। চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এমএ হান্নান দুপুর ২টা ১০ মিনিটে এবং ২টা ৩০ মিনিটে চট্টগ্রাম বেতার থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। স্বাধীন বাংলাদেশকে সাহায্যের জন্য বিশ্বের মুক্তিকামী জনগণ ও রাষ্ট্রসমূহের প্রতি আহ্বান জানান। এরপর রাত ৭টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রামের’ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। ২৬ মার্চ হলো মুক্তিযুদ্ধ শুরুর দিন তথা মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিন। এদিন ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল-গাজীপুর থেকে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, কুমিল্লা-মৌলভীবাজার-ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে চতুর্থ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট, কাপ্তাই-চট্টগ্রাম-চুয়াডাঙ্গা ইত্যাদি এলাকা থেকে তৎকালীন ইপিআর-এর বাঙালীরা বিদ্রোহ করেন। এ সময় চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপর্ণ স্থানগুলোতে ছাত্র-যুবক-কৃষক-শ্রমিক-পুলিশ-ইপিআর বাঙালী সেনাদের নিয়ে গঠিত বিপ্লবী বাহিনী স্থানীয় পাকসেনাদের প্রতিহত করার প্রয়াস পায় এবং অধিকাংশ স্থানেই প্রাথমিকভাবে সফলতা লাভ করে। কুমিরার প্রতিরোধ যুদ্ধে মৃত্যুকাতর আর্তনাদ আর দিশেহারা ছুটাছুটিতে হকচকিত পাকিস্তান আর্মি। দু’পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ। বহু চেষ্টা করেও শত্রুরা মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যুহ ভেদ করতে পারল না। তাদের সৈন্য বোঝাই তিন ট্রাকে আগুন ধরে গেল। প্রাণপণ লড়াই শেষে পাক আর্মিরা দুই ট্রাক অস্ত্রশস্ত্র ফেলে রণে ভঙ্গ দিয়ে পালিয়ে যায়। ২৬ মার্চের এই খ-যুদ্ধে হানাদার বাহিনীর কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল শাহপুর খান বখতিয়ার ও একজন লেফটেন্যান্টসহ ১৫২ জন সাধারণ সৈনিক প্রাণ হারায়। সঙ্গে দু’ট্রাক এ্যামুনিশন মুক্তিযোদ্ধাদের কব্জায় আসে। স্বাধীনতা সংগ্রামে চৌদ্দজন বীরযোদ্ধা শাহাদাত বরণ করেন। সকালে পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো কড়া সামরিক প্রহরায় ঢাকা ত্যাগ করেন। করাচী বিমান বন্দরে পৌঁছে তিনি ঢাকায় ২৫ মার্চের সেনাবাহিনীর অপারেশনের প্রশংসা করে বলেন, আল্লাহকে অশেষ ধন্যবাদ। সেনাবাহিনী পাকিস্তানকে রক্ষা করেছে। রাত আটটায় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান করাচী থেকে এক বেতার ভাষণে বলেন, পূর্ব পাকিস্তান সরকারের ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সেনাবাহিনীকে আদেশ দেয়া হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমান অসহযোগ আন্দোলন করে রাষ্ট্রদ্রোহিতার কাজ করেছেন। শেখ মুজিবুর রহমান সবসময়ই গঠনমূলক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ব্যাপারে সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। জেনারেল ইয়াহিয়া খান বলেন, ‘আমি শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে আগেই ব্যবস্থা নিতে পারতাম। কিন্তু ‘আমি শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষপাতী বলেই ন্যায়সঙ্গত উপায়ে উদ্ভূত পরিস্থিতির সমাধান চেয়েছি। তিনি বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের একগুঁয়েমি, অনড় মনোভাব থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, লোকটি এবং তাঁর দল পাকিস্তানের শত্রু। শেখ মুজিবুর রহমান দেশের সংহতি ও সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হেনেছেন। এ অপরাধের জন্য তাঁকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।