১৯ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সিনেমা হলে ধর্মঘট

পরিবার-পরিজন নিয়ে আয়েশ করে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে আলুভাজা-কোক খেতে খেতে সিনেমা দেখার দিন গত হয়েছে আগেই। সিনেমা হল সম্পর্কে সর্বশেষ খবর হলো, আগামী ১২ এপ্রিল থেকে অনির্দিষ্টকাল সারাদেশের প্রেক্ষাগৃহগুলো বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির নেতৃবৃন্দ। গত তিন মাসে নতুন কোন চলচ্চিত্র মুক্তি পায়নি দেশে। সেরা সিনেমা হল মধুমিতার কর্ণধারের ভাষ্যমতে, গত রমজানের ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি সুপারহিট চলচ্চিত্র হলটিতে পুনরায় প্রদর্শিত হলে প্রথম শোতে টিকেট বিক্রি হয় মাত্র ৯০০ টাকার। দীর্ঘদিন থেকে লোকসান যাচ্ছে হলটিতে। মাস শেষে বিদ্যুত বিল, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ রক্ষণাবেক্ষণের নানা খরচ দিয়ে হল টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে অন্যগুলোর অবস্থা সহজেই অনুমেয়। এক হিসাবে দেখতে পাচ্ছি, সারাদেশে বর্তমানে টিমটিম করে টিকে আছে ১৭৪টি হল। এসবের মধ্যে নিয়মিত সিনেমা প্রদর্শিত হয় ১১০টিতে। ২৮টি জেলায় আদৌ কোন সিনেমা হল নেই। গত ১০ বছরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ৯০ শতাংশ কর্মী পেশা ছেড়েছেন। বছরে ছবি নির্মাণের হার ঠেকেছে ৩৫-৪০টিতে। এফডিসিতে মরচে পড়ছে মেশিনপত্র, ল্যাবে, শূটিং ফ্লোরে জমছে ধুলো। বেসরকারী পর্যায়ে চলছে হল ভাঙ্গার প্রতিযোগিতা। গড়ে তোলা হচ্ছে মাল্টি কমপ্লেক্স, গুদাম, গ্যারেজ, শপিং মল, গার্মেন্টস কারখানা, হাসপাতাল ইত্যাদি।

যে কারণেই হোক না কেন, ফিল্ম বা চলচ্চিত্র তার ঐতিহ্য ও কৌলীন্য হারিয়েছে। এর নানা কারণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পুঁজি ও লগ্নিকারীর অভাব। একটি ভাল মানের ছবি বা সিনেমা বানাতে বিপুল অঙ্কের পুঁজির প্রয়োজন হয়ে থাকে। সেইসঙ্গে বিশাল একটি দল বা টিমওয়ার্ক। বিশাল পুঁজি বিনিয়োগের এই পুরো প্রক্রিয়াটাই ঝুঁকিনির্ভর। কেননা, ছবি দর্শকধন্য অথবা হিট, সুপারহিট, বাম্পারহিট এর কোনটাই নাও হতে পারে। সে অবস্থায় পুরো দলটিরই প্রায় ভেঙ্গে পড়ার অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়, এমনকি হল মালিকদেরও। কেননা, সিনেমা দর্শক ধন্য না হলে তার হলের খরচ ওঠে না। অথচ এই বিপুল অঙ্কের টাকা আপনি অন্য যে কোন ব্যবসায়ই বিনিয়োগ করুন না কেন, তা থেকে দ্বিগুণ-তিনগুণ লাভ উঠে আসতে বাধ্য। তাই বাধ্য হয়ে হল মালিকরা তাদের সিনেমা হলগুলো বন্ধ করে দিয়ে একে একে ভেঙ্গে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রধান কারণ ওই ভাল সিনেমার প্রকট অভাব। সাম্প্রতিককালে আয়নাবাজি, ঢাকা এ্যাটাক, দহন, হালদাসহ কয়েকটি সিনেমা দর্শকধন্য হলেও এর নির্মাণ খরচ উঠে আসেনি বলে পরিবেশক ও প্রযোজকরা জানিয়েছেন। এরও কারণ আছে বৈকি। একটি সিনেমা তৈরি ও মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এর পাইরেটেড কপিতে বাজার ছেয়ে যায়। সর্বাধুনিক বড় পর্দার এলইডি ও স্মার্ট টিভির কল্যাণে মানুষ ঘরে বসেই সে সব সিনেমা দেখে ফেলে। হলে গিয়ে সিনেমা দেখার সময় কোথায়? অতঃপর হল মালিক, প্রযোজক, পরিচালক, পরিবেশক, সর্বোপরি সরকার পক্ষ একে অপরকে দুষছেন সিনেমা না চলার জন্য। সিনেমার দশা এমনই করুণ যে, এর কারণে সরকারী মালিকানাধীন এফডিসির অবস্থা পর্যন্ত বেহাল। সরকার ভাল সিনেমার জন্য অনুদান দিলেও তা অপর্যাপ্ত। এহেন দুরবস্থার অবসান ঘটাতে সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের উদ্যোগে হল মালিক থেকে শুরু করে সিনেমার প্রযোজক, পরিচালক, কলাকুশলী, পরিবেশকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একত্রে বসে সমস্যার সমাধান বের করতে হবে। প্রয়োজনে ভারতসহ বিদেশী ছবি প্রদর্শনের সুযোগ দেয়ার বিষয়টিও বিবেচনার দাবি রাখে।