২২ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বড় পাপে ছোট শাস্তি হয় না

  • আবদুল গাফ্্ফার চৌধুরী

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটা বড় ফাঁড়া কাটিয়ে উঠেছেন। ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভে রাশিয়ানদের সঙ্গে তার যোগসাজশ ছিল এই অভিযোগ স্পেশাল কৌঁসুলি রবার্ট মুয়েলার সত্য বলে কোন প্রমাণ পাননি বলে জানিয়েছেন। ট্রাম্পের ফাঁড়াটা সম্পূর্ণ কাটেনি। মুয়েলারের পূর্ণ রিপোর্ট প্রকাশের দাবি উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, রাশিয়ান কানেকশন সম্পর্কে সত্য ঘটনা উদ্ঘাটনে ট্রাম্প কৌশলে বাধা দিয়েছেন এবং মাত্র মাসখানেক আগে তারই নিযুক্ত এ্যাটর্নি জেনারেল উইলিয়াম বার মুয়েলার রিপোর্টটি যথাযথ প্রকাশ করেননি।

যাহোক, ডোনাল্ড ট্রাম্প আপাতত বেঁচে গেলেও অদূর ভবিষ্যতে এই ‘রাশিয়ান সাপের’ ঝাঁপি থেকে আবার কি বেরিয়ে আসে সে সম্পর্কে জল্পনা কল্পনা শেষ হয়নি। এ যুগের মার্কিন প্রেসিডেন্টদের দুর্ভাগ্য এই যে, তারা কখনও শান্তি ও স্বস্তিতে দেশ পরিচালনা করতে পারেননি। তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের মোকাবেলা করার মধ্যে তাদের হোয়াইট হাউসে থাকার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।

প্রেসিডেন্ট আইসেন হাওয়ার ইউ টু স্পাই প্লেনের কলঙ্ক মাথায় নিয়ে হোয়াইট হাউস ত্যাগ করেছিলেন। পরবর্তী প্রেসিডেন্ট জন কেনেডিকে হত্যা করা হয়। প্রেসিডেন্ট নিক্সন ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারিতে জড়িত হন। প্রথম দিকে এই কেলেঙ্কারি সংক্রান্ত তদন্ত প্রেসিডেন্ট বন্ধ করতে পারবেন বলে মনে হলেও শেষ পর্যন্ত দোষী সাব্যস্ত হয়ে ইমপিচমেন্টের সম্মুখীন হন এবং লজ্জাজনকভাবে পদত্যাগে বাধ্য হন।

আরেক প্রেসিডেন্ট কার্টার ইরানে চোরাগোপ্তা বিমান হামলা চালিয়ে মার্কিন জিম্মিদের উদ্ধার করতে গিয়ে ব্যর্থতার চরম গ্লানি নিয়ে হোয়াইট হাউস ছাড়েন। তার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান ইরানের কাছে গোপনে অস্ত্র বিক্রির ডিলে জড়িত (যা ইরান গেট কেলেঙ্কারি নামে পরিচিত) থাকার অভিযোগে পড়েন। তিনি ছিলেন জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট। তবু তাকেও ইমপিচমেন্টের দাবি ওঠে। তখন বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি ধীরে ধীরে স্মৃতিভ্রষ্ট হচ্ছেন। তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়।

প্রেসিডেন্ট জন কেনেডির পর আমেরিকার সবচাইতে আলোচিত ও জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন। কিন্তু তিনিও হোয়াইট হাউসে সুখে শান্তিতে কাটাতে পারেনি, তরুণী লিউনেস্কি সংক্রান্ত কেলেঙ্কারিতে তাকে নাস্তানাবুদ হতে হয়েছে। তাকেও ইমপিচমেন্টের দাবি উঠেছেন। অনেকের ধারণা, ক্লিনটনের নারী ঘটিত কেলেঙ্কারির জন্যই পরবর্তীকালে তার স্ত্রী হিলারি প্রেসিডেন্ট পদের উপযুক্ত প্রার্থী হওয়া সত্ত্বেও ট্রাম্পের মতো ‘লুনাটিক এবং অযোগ্য’ বলে মার্কিনীদের কাছে পরিচিত এক ব্যক্তির কাছে পরাজিত হয়েছেন।

গণতান্ত্রিক বলে পরিচিত বিশ্বে আমেরিকার নেতৃত্ব ও সুপ্রিমেসির পতন ঘটিয়ে গেছেন জর্জ বুশ জুনিয়র নামের এক প্রেসিডেন্ট। মিথ্যা ও বানোয়াট কথা বলে তার ইরাক-হামলা এবং বিশ্বব্যাপী জনক্রোধের মুখে লন্ডন সফরে এসেও তার রাজপথে বেরুতে না পারা আমেরিকার ইতিহাসেরই এক লজ্জাজনক অধ্যায়। আমেরিকার মানুষই তাকে আখ্যা দিয়েছে ‘মার্কিন ইতিহাসের সবচাইতে নিকৃষ্ট ও অযোগ্য প্রেসিন্ডেট।’ তার যুদ্ধ সহযোগী তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ারকে তার দেশবাসী নাম দিয়েছি বি-লায়ার।

জর্জ বুশ জুনিয়রের পর আমেরিকার প্রথম অশ্বেতাঙ্গ প্রেসিডেন্ট ওবামা, যিনি তার দেশের পতনশীল বিশ্ব নেতৃত্বকে ঠেকাবার চেষ্টা করেছিলেন। ওসামা বিন লাদেনকে তার আদেশেই হত্যা করা হয়। কিন্তু মার্কিন প্রশাসনে ‘নিওকনকদের’ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ওবামার প্রয়াস সফল হয়নি। বরং ত্রিশের ইউরোপের ফ্যাসিবাদ আমেরিকায় বর্ণবাদ ও বহিরাগত বিদ্বেষের (জার্মানির হিটলারের ইহুদি-বিদ্বেষের মতো) সঙ্গে যুক্ত হয়ে ট্রাম্পের মতো প্রেসিডেন্টের আবির্ভাব ঘটিয়েছে।

ট্রাম্পের অনেক পাপ। হিটলার যেমন ইহুদিদের জন্য বন্দী শিবির তৈরি করেছিলেন, ট্রাম্প এ যুগে তৈরি করেছিলেন, মেক্সিকান ইমিগ্র্যান্টদের জন্য তেমনি বন্দী শিবির। এই ক্যাম্পে মায়ের বুক থেকে শিশু কেড়ে নিয়ে আলাদা বন্দী শিবিরে রাখা হচ্ছিল। মার্কিন জনগণেরই প্রতিবাদের মুখে ট্রাম্পকে এই নিষ্ঠুর পলিসি প্রত্যাহার করতে হয়।

বিশ্ব শান্তির জন্যও ট্রাম্প এক হুমকি। ফিলিস্তিনে তিনি শান্তির সালিশী করার পরিবর্তে ইসরাইলী আগ্রাসনের সহযোগী ও পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠেছেন। প্রথমে তিনি জেরুজালেম শহরে ইসরাইলের এক তরফা অধিকার প্রতিষ্ঠায় স্বীকৃতি দেন এবং সাম্প্রতিক খবর হচ্ছে গোলান উপত্যকায় ইসরাইলের অবৈধ অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়ে এক ফরমানে সই করেছেন। তাতে ভয়াবহভাবে যুদ্ধের বিস্তৃতি ঘটছে এবং ইসরাইলী হামলায় আরব ফিলিস্তিনীদের মৃত্যু ঘটছে।

আমি অদৃষ্টবাদী নই। কিন্তু ইতিহাসের বিচারে বিশ্বাসী। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার পাপের ভারা পূর্ণ করতে চলেছেন। মুসোলিনী আবিসিনিয়া (মডার্ন ইথিওপিয়া) দখল করে নির্মম অত্যাচার চালিয়েছিলেন। দলে দলে হাবসির গলায় ও পায়ে দড়ি বেঁধে তাদের দাস হিসেবে বিক্রির জন্য ইউরোপের বাজারে নিয়ে আনা হয়েছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষ দিকে মুসোলিনীর যখন পতন ঘটে এবং তিনি পালাতে গিয়ে নিজের সৈন্য বাহিনী হাতে ধরা পাড়েন, তখন তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। তার গলায় ফাঁসির রজ্জু প্রথম ঝুলিয়ে ছিলেন, তার এক আবিসিনিয়ান দেহরক্ষী।

আমার বিশ্বাস বড় পাপে ছোট শাস্তি হয় না। বড় অপরাধী ছোট পাপ করে রেহাই পেলে ভাবে তার ভাগ্যে কোন শাস্তি নেই। আসলে তার জন্য বড় শাস্তি অপেক্ষা করে। তুরস্কের একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী আদনান মেন্দারেস বিমানযোগে আঙ্কারা থেকে লন্ডনে আসছিলেন। সাইপ্রাসের কাছাকাছি এসে তার বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। বিমানের পাইলট, কেবিন ক্রুসহ সকল যাত্রী নিহত হয়। কিন্তু মেন্দারেস বেঁচে যান। তাকে জীবিত উদ্ধার করার পর ডাক্তারী পরীক্ষায় দেখা যায় তার শরীরের কোন অংশেই কোন আঘাত লাগেনি। এর কিছুদিন পরই তুরস্কে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে এবং মেন্দারেসকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়।

নিজের দেশের একটা ঘটনাবলি। তখন পাকিস্তানী আমল এবং আইয়ুবের পাপেট মোনায়েম খাঁ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গবর্নর। তিনি একটি সী-প্লেনে বরিশাল যাচ্ছিলেন। পথে প্লেনের ইঞ্জিন বিকল হয়। সী-প্লেন হওয়ায় সেটি কীর্তনখোলা নদীতে জরুরী অবতরণ করে। মোনায়েম খাঁ নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পান। তিনি ঢাকায় ফিরে এসে গবর্নর হাউসে (বর্তমানে বঙ্গভবন) সংবাদপত্র সম্পাদকদের এক সভা ডাকেন (আমিও এই সভায় ছিলাম)। আইয়ুবের তাঁবেদার জনবিরোধী গবর্নর হিসেবে মেনোয়াম খাঁ খুবই আনপপুলার গবর্নর ছিলেন। তিনি তা জানতেন। সম্পাদকদের বৈঠকে তিনি জাঁক দেখিয়ে বললেন, ‘আমি জানি, বৈঠকে কেউ কেউ আছেন, বিশেষ করে যারা আওয়ামী লীগপন্থী, তারা আমার মৃত্যু হলে খুশি হতেন। কিন্তু দেখেন আমার জন্য রয়েছে আল্লাহর প্রোটেকশন। আপনারা কি করবেন?’

তারপর তিন বছরও কাটেনি, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো। মোনায়েম খাঁ তখন গবর্নর নন। নিজের বনানীর বাসায় বাস করেন। সেখানেই মুক্তিযোদ্ধারা তার ওপর হামলা চালায়। গুরুতর আহত মোনায়েম খাঁ মৃত্যুবরণ করেন। আমি তখন মুজিবনগরে। মুজিবনগর সরকারের মুখপত্র সাপ্তাহিক জয়বাংলার সম্পাদকীয় বিভাগের সঙ্গে জড়িত। মোনায়েম খাঁর মৃত্যু সংবাদ শুনে সেই প্রবাদটির কথা মনে হয়েছিল, বড় পাপে ছোট শাস্তি হয় না।

বর্তমান আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্প শুধু রাশিয়ান-কানেকশনের জন্য নয়, অনেক গণমৃত্যুর (ফিলিস্তিনে ও মেক্সিকো সীমান্তে) জন্য দায়ী হয়েও অব্যাহতি পাচ্ছেন এবং হিটলারের মতো ভাবছেন, তাকে প্রতিহত করার কেউ নেই। অতীতের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়ার জ্ঞানবুদ্ধি থাকলে এই অহংকার তার মনে জন্মাত না। অতীতের রোমান জেনারেলরা তার চাইতে অনেক শিক্ষিত ও জ্ঞানী ছিলেন। তারা যখন কোন দেশ দখল করে বিজয় গর্বে নিজের দেশে বিশাল মিছিল নিয়ে ফিরে আসতেন তখন নিজের পাশে একজন সাধারণ সৈন্যকে রাখতেন। তার কাজ ছিল জেনারেলের কানের কাছে মাঝে মাঝে বলা, ‘এবহবৎধষ ুড়ঁ ধৎব ধষংড় ধ সড়ৎঃধষ’ (জেনারেল, আপনিও অমর নন।)

ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও কানের কাছে এই কথাটি সতত উচ্চারণ করার জন্য একজন সাহসী মার্কিন নাগরিক দরকার।

লন্ডন, ২৬ মার্চ, মঙ্গলবার ২০১৯।