২২ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইতিহাসের শিক্ষা নিয়ে দেশাত্মবোধে উজ্জীবিত নতুন প্রজন্ম

ওয়াজেদ হীরা ॥ ছোট্ট শিশু ইফাদ। রাজধানীর একটি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র। চাকরিজীবী বাবার ছুটি থাকায় বাবার হাত ধরে স্বাধীনতা দিবসের প্রথম প্রহরেই এসেছে স্বাধীনতা জাদুঘরে। তখনও ভিড় বেশি হয়ে উঠেনি। জাদুঘরে স্থান পাওয়া বিভিন্ন ছবির বিষয়ে বাবা ইমতিয়াজ হামিদকে বার বার প্রশ্ন করছেন। এত প্রশ্নেও বিরক্ত নন বাবা বরং ছেলের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দর্শনার্থীদেরও ভিড় বাড়ে। ইফাদের মতো শিশুদের নিয়ে সকালের প্রথম প্রহরেই এসেছেন অসংখ্য অভিভাবক। ছুটির দিনে কড়া রোদ আর তীব্র গরম উপেক্ষা করেও ইতিহাস জানার আগ্রহ ও দেশাত্মবোধ নগরবাসীকে টেনে আনে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোতে। নতুন প্রজন্ম প্রতিনিয়তই নানাভাবে জানতে পারছে ইতিহাসের নানা কথা। বিভিন্ন আর্কাইভ, গণমাধ্যম ও অভিভাবকদের দায়িত্ববোধ নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের শিক্ষাটা আরও সহজ করে দেয়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এভাবেই ছড়িয়ে পড়ছে দেশাত্মবোধ ও ইতিহাসের শিক্ষা।

স্বাধীনতা দিবসের প্রথম প্রহরে ভোর থেকেই স্মৃতিসৌধ মুখী মানুষের মিছিল ছিল। সববয়সী মানুষ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় জাতির বীর সন্তাদের স্মরণ করে। এরপর স্মৃতিসৌধ থেকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিগাথা স্থানগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীবাসী। ব্যতিক্রম নয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা জাদুঘরও। বরং অন্যান্য স্থানের চেয়ে ভিড় যেন একটু বেশি এদিন। লাল-সবুজের পতাকা ছিনিয়ে আনার অনেক ইতিহাস তো এই উদ্যান ঘিরেই।

স্বাধীনতা জাদুঘরে সরজমিনে দেখা গেছে, শিশুদের চিত্রাঙ্কন ও পরবর্তীতে বিভিন্ন বয়সী মানুষের ঢল। শিক্ষার্থী-অভিভাবকসহ বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের আনাগোনায় মুখর জাদুঘরের কক্ষগুলো।

ইফাদের বাবা ইমতিয়াজ হামিদ বলেন, আমাদের থেকেই আমাদের প্রজন্ম ইতিহাস জানবে, দেশপ্রেম শিখবে। আমি ছুটির দিনে সময় পেলে এসব স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। স্বাধীনতা দিবসে এই উদ্যানের জাদুঘর থেকে অতীত ইতিহাস জানানো চেষ্টা করলাম। ছোট মানুষ তবুও এই বিষয়টা ওর মনে থাকবে। দেশের প্রতি ভালবাস থাকবে। দর্শনার্থী সামিউল হাসান বলেন, আমাদের থেকেই তো আমাদের সন্তান বা ছোটরা শিখবে। আমিও একসময় বাবা মার সঙ্গে এসেছি। এখন বড় হয়েছি। হয় তো ভবিষ্যতে আমার প্রজন্মকে নিয়ে আসব।

মিরপুর থেকে পরিবারের সঙ্গে স্বাধীনতা জাদুঘরে এসেছে পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সঞ্চিতা। এই জাদুঘর দেখে তার ভাল লাগার কথাও বলে। পাশেই দেখা গেল এক শিক্ষার্থীকে তার অভিভাবক গণহত্যার ছবি দেখিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছেন গণহত্যা আসলে কি। অসংখ্য ছবির সামনে অপলক দৃষ্টিতে দেখছে দুই প্রজন্ম। প্রতিটি দৃশ্যই যেন এক একটি টুকরো টুকরো গল্প। জাদুঘরের তিনটি কক্ষেই দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা যায়। অনেককেই মোবাইল ফোনে সেলফিতে নিতেও দেখা যায়। বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে আসা মিরপুর বাংলা কলেজের শিক্ষার্থীরা বলেন, অন্যান্য সময় এদিকে আসা যায় না একটু যানজট থাকে। বিশেষ দিনগুলোতে ছুটি থাকে। রাস্তাও ফ্রি। আর এসব জায়গা এলে বুঝা যায় আমাদের জন্য যারা নিজের জীবনটা দিয়ে গেছেন তারা কতটাই না ভালবাসতেন দেশটাকে। সে হিসেবে আমরা কি দিতে পারছি।

জাদুঘরের নিরাপত্তা প্রহরী বলেন, জাদুঘরে প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চার শ’ দর্শনার্থী আসে। তবে শুক্রবার সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থী হয়। এর বাইরেও বিশেষ দিনে দর্শনার্থীদের চাপ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। তিনি বলেন, স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে এদিন ছাত্র, শিশু, প্রতিবন্ধী ও বয়স্কদের প্রবেশ ফ্রি।

একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবী ডাঃ আলীম চৌধুরীর মেয়ে ডাঃ নুজহাত চৌধুরী জনকণ্ঠকে বলেন, আমি একজন ডাক্তার তেমনি একজন মা। আমার সন্তানকে সঠিক মানুষ হওয়ার শিক্ষাটা কিন্তু বাবা-মাকেই দিতে হবে। ইতিহাস সমৃদ্ধ জায়গাগুলোতে সন্তানদের নিয়ে গেলে দেশের প্রতি যেমন ভালবাসা তৈরি হয়, সঠিক শিক্ষাটা জানতে পারে তেমনি পারিবারিক বন্ধনটাও ভাল থাকে সবসময়। আমি মনে করি শুধু বিশেষ দিনে নয় সন্তানদের নিয়ে এ রকম জাদুঘর বা বিশেষ জায়গাগুলোতে সময় পেলেই সপরিবারে যাওয়া উচিত।

জানা গেছে, জাদুঘরটিতে ১৪৪ কাঁচের প্যানেলে ৩০০-এরও বেশি ঐতিহাসিক আলোকচিত্র প্রদর্শিত হয়। টেরাকোটা, ঐতিহাসিক আলোকচিত্র, যুদ্ধের ঘটনা সংবলিত সংবাদপত্রের প্রতিবেদনও প্রদর্শিত হয়। রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিভিন্ন বিদেশী পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের প্রতিলিপি এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিদেশে প্রচার চালাতে তৈরিকৃত বিভিন্ন পোস্টারও।

এছাড়াও বাংলাদেশের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতœতাত্ত্বিক স্থান এবং স্থাপনার চিত্রও রয়েছে এখানে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে যে টেবিলে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্ব জোনের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি আত্মসমর্পণ করে স্বাক্ষর করেন, তার একটি অনুলিপি রয়েছে জাদুঘরটিতে। তবে মূল টেবিলটি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে রয়েছে।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বাধীনতা জাদুঘর পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে জাতীয় জাদুঘর। জাদুঘরে প্রবেশের ক্ষেত্রে ফি ২০ টাকা। ১২ বছরের নিচের শিশুদের প্রবেশমূল্য ১০ টাকা। সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের প্রবেশ ফি ৩০০ এবং অন্য দেশের নাগরিকদের প্রবেশ ফি ৫০০ টাকা।

জাদুঘরের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ‘ক’ বিভাগে শিশু শ্রেণী থেকে দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা ইচ্ছেমতো ছবি এঁকেছে। ‘খ’ বিভাগে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর ধ্বংসলীলা নিয়ে ছবি এঁকেছে। ‘গ’ বিভাগে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ বিষয়ক এবং ‘ঘ’ বিভাগে নবম ও দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের ছবি এঁকেছে।

এদিকে, এদিন রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা জাদুঘরের সামনে মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে পথশিশুদের অংশগ্রহণে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ৭ কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের ‘পলিটিক্যাল সায়েন্স ক্লাব’ এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে।

সেখানে দেখা যায়, রং পেনসিল ও কাগজ নিয়ে ঘাসের উপর ছবি আঁকতে বসে গেছে পথশিশুরা। কেউ আঁকছে লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা, কেউ স্মৃতিসৌধ। কেউ চুপচাপ অন্যের ছবি আঁকা দেখছে। তরুণ শিক্ষার্থীরা তাদের যতœ করে বুঝিয়ে দিচ্ছেন ছবি আঁকার বিষয়টি। জানা গেছে, স্বাধীনতা সম্পর্কে পথশিশুদের ধারণা দেয়া এবং শিক্ষা সম্পর্কে তাদের আগ্রহী করে তোলতেই এই আয়োজন। যেখানে ২০ জনের মতো পথশিশু অংশ নেয়। প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া শিশুদের খাবার ও শিক্ষা উপকরণও বিতরণ করা হয়। ক্লাবের সদস্যদের চাঁদায় প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে বলেও জানা যায়। এ সময় ক্লাবের সদস্য ইডেন কলেজ, তিতুমীর কলেজ, ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীদের দেখা যায়।

এদিকে, স্বাধীনতা জাদুঘর বিষয়ে জানা গেছে স্থাপত্যশৈলীতে অনন্য স্বাধীনতা জাদুঘর। প্লাজা চত্বরে টেরাকোটা ম্যুরালের নিচের অংশে এ জাদুঘরের অবস্থান। ওপর থেকে নিচে প্রসারিত হয়েছে জাদুঘরের প্রবেশ পথ। রঙিন কাঁচের ভেতর থেকে হালকা সবুজ আলোর পথ ধরে জাদুঘরে প্রবেশ করতে হয়। পুরো জায়গাজুড়েই স্থানে স্থানে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন সময়ের ছবি। জাদুঘরের মাঝখানে রয়েছে একটি ফোয়ারা। এটি নেমে এসেছে মাটির উপরিভাগ থেকে। মূলত স্বাধীনতা জাদুঘরের তিনটি অংশ। প্রথম অংশে বাংলা ভাষার উৎপত্তি, বাংলার উৎপত্তি ও স্বাধীনতার জন্য বিভিন্ন সময়কার আন্দোলন। এটি শেষ হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের ছবি দিয়ে। দ্বিতীয় অংশটি একটি অন্ধকার কুঠুরি। সেখানে একাত্তরের ভয়াবহ দিনগুলোর ছবি-নির্যাতন, হত্যাযজ্ঞ ইত্যাদি।