১৯ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চীনের থিঙ্ক ট্যাঙ্কগুলো কতটা স্বাধীন

চীনে রাষ্ট্রীয় অর্থপুষ্ট থিঙ্ক ট্যাঙ্ক বা বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব দীর্ঘদিনের। এর অনেকগুলোই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা কমিউনিস্ট পার্টির নানা সংগঠনের প্রয়োজন মিটিয়ে থাকে। ইদানীংকালে বেশ কিছু বিশেষজ্ঞ বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের আবির্ভাব ও বিকাশ ঘটেছে যেগুলো রাষ্ট্রের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা পরিহার করে চলে। কোন কোনটি বেসরকারী অর্থায়নে পরিচালিত ফাউন্ডেশন কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যুক্ত। অন্যগুলো প্রাইভেট কনসাল্টিং ফার্ম হিসেবে নিবন্ধিত। এদের যেমন নমনীয়তা আছে তেমনি আবার দুর্বলতাও আছে।

পাশ্চাত্যে থিঙ্ক ট্যাঙ্কের লোকেরা সরকার কিংবা বিরোধী দলকে নানা ধরনের বুদ্ধি, পরামর্শ ও মতামত যুগিয়ে থাকে। বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করে অনেকে। স্বভাবতই এসব দেশে এদের প্রভাব পরিমাপ করা যায়। কিন্তু চীনে সে কাজটা করা কঠিন। সরকারী কর্মকর্তারা অবসর নেয়ার পর থিঙ্ক ট্যাঙ্কে গিয়ে ঢোকেন তবে কদাচিতই তারা সরকারী কাজে ফিরে যান। সে দেশে ক্ষমতাসীন দল কখনও বদলায় না। চীনে থিঙ্ক ট্যাঙ্কের প্রকৃত প্রভাবটা কদাচিতই প্রকাশ্যে টের পাওয়া যায়। বিশেষ সুবিধা বা আনুকূল্যপ্রাপ্ত থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অভ্যন্তরীণ চ্যানেল দিয়ে তাদের পলিসি পেপারগুলো প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও অন্যান্য নেতার কাছে প্রতিদিনই পাঠিয়ে থাকে। সরকারের সঙ্গে ভাল যোগাযোগ থাকা থিঙ্ক ট্যাঙ্কগুলো তাদের স্টাফদের সরকার ও পার্টির বৈঠকগুলোতে পাঠায়। রুদ্ধদ্বার সে সব বৈঠকে এই বিশেষজ্ঞরা বড় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর গুণাগুণ, দোষ-ত্রুটি পর্যালোচনা করে দেখে। বেল্ট এ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের কথাই দৃষ্টান্ত হিসেবে ধরা যাক। এটি হচ্ছে গোটা বিশ্বকে রেললাইন, টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং অন্যান্য অবকাঠামো দিয়ে যুক্ত করার একটা স্কিম। কোন কোন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক যুক্তি দেয় যে এই প্রকল্পে অর্থায়ন ও নিয়ন্ত্রণ করলে চীনের লাভ হবে। অন্য থিঙ্ক ট্যাঙ্করা বলে যে এই প্রকল্প একটা আর্থিক ও কূটনৈতিক বোঝা যা অন্যান্য দেশেরও ভাগ নেয়া উচিত।

আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধের সময় চীন সরকারের ঘোষণার শব্দাবলী কি হবে সে ব্যাপারে পরামর্শ দেয়ার জন্য বিশেষজ্ঞদের ডাকা হয়। চতুর থিঙ্ক ট্যাঙ্কগুলো তাদের গবেষণাপত্রের দুই রকম সংস্করণ প্রকাশ করে। একটা প্রকাশ্য অন্যটা অপ্রকাশ্য। ভিভিআইপিদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে এমন বিশেষজ্ঞতা সরকারের নীতি পছন্দ করুক আর নাই করুক প্রকাশ্যে টু শব্দটি করবে না, কোন মতামতও দেবে না। বরং বলা যায় দিতে পারে না।

ক্ষমতার নৈকট্য মর্যাদার দিক দিয়ে ভাল। তবে বিশ্বাসযোগ্যতার দিক দিয়ে খারাপ, বিশেষ করে স্বৈরাচারী শাসনের বেলায়। কূটনীতিক ও বিদেশী পর্যবেক্ষকরা ‘চায়না ইনস্টিটিউট অব কনটেম্পোরারি ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস’ (সিআইসিআইআর)-কে রাষ্ট্রের অন্দরমহলের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার কারণে পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপারে দেশটির সবচেয়ে ধূর্ত ও বিচক্ষণ থিঙ্ক ট্যাঙ্ক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলে মনে করে। প্রতিটি দেশ এবং জাতীয় নিরাপত্তার ব্যাপক বিস্তৃত বিষয়ে দু’শ’রও বেশি বিশেষজ্ঞের অধিকারী এই ইনস্টিটিউটের ক্যাম্পাস দেখতে ছোটখাটো বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুরূপ। আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের প্রহরা ও বিশাল গেট থেকে বোঝা যায় যে প্রতিষ্ঠানটি চীনের প্রধান গোয়েন্দা সার্ভিস রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত।

সিআইসিআইআর প্রধান ইউয়ান পেং বলেন, পাশ্চাত্যের থিঙ্ক ট্যাঙ্কগুলো জোরালো শব্দাবলী ব্যবহার করে এবং অতীতের ভুলভ্রান্তির জন্য রাজনীতিকদের সমালোচনা করে। অন্যদিকে সিআইসিআইআর বর্তমান বাস্তবতাকে সঠিকভাবে তুলে ধরার জন্য ফুমা ভাষা প্রয়োগ করে এবং ভবিষ্যত সম্পর্কে গঠনমূলক পরামর্শ দেয়। ইউয়ান বস্তুনিষ্ঠতা সম্পর্কে পাশ্চাত্যের কোন শিক্ষা নিতে নারাজ। তিনি বলেন, মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্কগুলো ধনিকদের মতাদর্শের অনুগত। পাশ্চাত্যের থিঙ্ক ট্যাঙ্কগুলো সরকার থেকে স্বাধীন তবে স্বার্থবাদী গ্রুপগুলো থেকে নয়।

সেন্টার ফর চায়না এ্যান্ড গ্লোবালাইজেশন নামে আরেকটি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক আছে যা অবাধ বাণিজ্য ও বহির্বিশ্বের কাছে আরও বেশি উন্মুক্ত হওয়ার কথা প্রচার করে। এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান ওয়াং হুইইয়াও গর্বের সঙ্গে বলেন যে তার স্বাদীন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক চীনা শিল্পোদ্যোক্তা ও কোম্পানিগুলোর অর্থে পরিচালিতÑ রাষ্ট্রের অর্থে নয়। তবে ওয়াং হুইইয়াও রাষ্ট্রীয় পরিষদ বা মন্ত্রিপরিষদে নিয়োগপ্রাপ্ত উপদেষ্টা এবং একটি গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান। সেই গ্রুপটি বিদেশে শিক্ষাপ্রাপ্ত চীনাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করে থাকে। তিনি বলেন, আজকের চীনে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সুযোগ হয়ত নেই তবে সেখানে রাজনৈতিক প্রস্তাবের প্রতিযোগিতার দুয়ার উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। চীনা নেতারা ব্যাপক পরিসরে নানা শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে আলাপ- আলোচনা, সলা-পরামর্শ করে থাকে এবং এভাবে ফুলের রেণু থেকে মৌমাছির মধু আহরণের মতো নানা ধরনের মতামত চয়ন করে থাকে।

এটা সত্য যে স্বাধীনতার জন্য মাশুল দিতে হয়। ১৯৯৩ সালে বিশিষ্ট উদারপন্থী সংস্কারকদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ‘ইউনিরুল ইনস্টিটিউট ফল ইকোনমিক্স’ নামক থিঙ্ক ট্যাঙ্কটি এখন অবরুদ্ধ।

গত বছর ইউনিরুল রাষ্ট্রীয় একাধিপত্যের পক্ষপাতিত্ব ও ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিকারক নীতির সমালোচনা করার পর এ পৃষ্ঠপোষক একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায় লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। এই হচ্ছে চীনের স্বাধীন থিঙ্ক ট্যাঙ্কগুলোর অবস্থা।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট