১৯ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সবাই ছুটছে আফ্রিকায়

  • তৌফিক অপু

আফ্রিকায় বিদেশীদের আগ্রহের প্রথম বড় ধরনের জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল ঊনবিংশ শতাব্দীতে যখন ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীরা এই মহাদেশকে কাটাছেড়া করে আফ্রিকানদের ভূখণ্ড দখল করে নিয়েছিল। দ্বিতীয় জোয়ার সৃষ্টি হয় স্নায়ুযুদ্ধের সময় যখন আফ্রিকার সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর আনুগত্য লাভের জন্য পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা বেঁধে গিয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্ক্সবাদী স্বৈরশাসকদের সমর্থন দিয়েছিল। অন্যদিকে আমেরিকা পুঁজিবাদে বিশ্বাসী স্বেচ্ছাচারী শাসকদের ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছিল। এখন আফ্রিকার প্রতি বিদেশী আগ্রহের নতুন বা তৃতীয় একটি জোয়ার চলছে। যা অধিকতর নির্দোষ প্রকৃতির। কি সেই জোয়ার? আফ্রিকার বাইরের লোকেরা লক্ষ্য করেছে যে মহাদেশটি এমনিতেই গুরুত্বপূর্ণ তার ওপর সেটি আরও বেশি গুরুত্ব লাভ করেছে এই কারণে যে মহাদেশটির জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে এবং বৈশ্বিক জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান অংশ হয়ে দাঁড়াচ্ছে আফ্রিকানরা। জাতিসংঘের পূর্বাভাষ অনুযায়ী ২০১৫ সাল নাগাদ চীনা জনগণের চেয়ে বেশি হবে আফ্রিকান জনগণের সংখ্যা। এ দিকটি চিন্তা করে সারা বিশ্বের সরকার ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলো আফ্রিকান দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক স্ট্র্যাটেজিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করার জন্য এই মহাদেশের দিকে জোরেশোরে ধাবিত হচ্ছে।

আফ্রিকার সঙ্গে বিদেশীদের নানাভাবে জড়িয়ে পড়ার মাত্রাটা নজিরবিহীন। কূটনীতির কথাই ধরা যাক। ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত আফ্রিকায় ৩২০টিরও বেশি দূতাবাস খোলা হয়েছে। দূতাবাস খোলার দিক দিয়ে এমন বড় ধরনের তেজীভাব সম্ভবত বিশ্বের অন্য কোথাও আর কখনই দেখা যায়নি। তুরস্ক একাই খুলেছে ২৬টি দূতাবাস। গত বছর ভারত ঘোষণা দেয় যে তারা ১৮টি দূতাবাস খুলবে। সামরিক সম্পর্কও জোরদার হচ্ছে। আমেরিকা ও ফ্রান্স সাহেল অঞ্চলে জিহাদী ভাবধারার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সৈন্য ও প্রযুক্তি ধার দিচ্ছে। চীন এখন সাহারা সন্নিহিত আফ্রিকান দেশগুলোর কাছে অস্ত্রের বৃহত্তম বিক্রেতা। মহাদেশের ৪৫টি দেশের সঙ্গে চীনের প্রতিরক্ষা-প্রযুক্তি সম্পর্ক আছে। ২০১৪ সাল থেকে রাশিয়া আফ্রিকা দেশগুলোর সঙ্গে ১৯টি সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। তেলসমৃদ্ধ আরব দেশগুলো আফ্রিকাশৃঙ্গে ঘাঁটি নির্মাণ করছে এবং আফ্রিকায় সৈন্য ভাড়া করছে।

বাণিজ্যিক সম্পর্কও উত্তরোত্তর জোরদার হচ্ছে। এই ২০০৬ সালে আফ্রিকার তিন বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ছিল ক্রমানুসারে আমেরিকা, চীন ও ফ্রান্স। ২০১৮ সাল নাগাদ এই ক্ষেত্রে চীন হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রথম, ভারত দ্বিতীয় এবং আমেরিকা তৃতীয়। ফ্রান্সের অবস্থান ছিল সপ্তম। একই সময়ে তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে আফ্রিকার বাণিজ্য তিন গুণেরও বেশি ও রাশিয়ার সঙ্গে চার গুণেরও বেশি হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য বেড়েছে ৪১ শতাংশ। আফ্রিকায় প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের বৃহত্তম উৎসগুলো এখনও হলো আমেরিকা, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ব্যবসায় ও বিনিযোগ ফার্মগুলো। তবে চীনারাও তাদের ধরে ফেলছে এবং ভারত ও সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগকারীরাও এই মিছিলে যোগ দিতে আগ্রহী হয়ে উঠছে। আফ্রিকায় বিদেশীরা বরাবরই নব্য ঔপনিবেশিক শোষকের ভূমিকায় আবির্ভূত। তারা মহাদেশের জনগণের ব্যাপারে নয় বরং প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতিই বেশি আগ্রহী। তারা স্থানীয় ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির অধিকারীদের ঘুষ দিতে হাত করে এমন সব প্রশ্নবিদ্ধ চুক্তি করে সেখানে সাধারণ আফ্রিকানদের জন্য কিছুই করার ব্যবস্থা থাকে না। তেল ও খণিজ সম্পদ আহরণের এমন অনেক কলঙ্কজনক চুক্তি হয়েছে। দূর্নীতিবাজ আফ্রিকান নেতারা সম্পদ লুটের কাজে বিদেশীদের বর্দাসরে পরিণত হয়। চীন ও রাশিয়ার মত দেশগুলি যারা স্বচ্ছতা নিয়ে থোড়াই পরোয়া করে তাদের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিগুলো প্রায়শই ঘোলাটে হয়ে থাকে।

অবশ্য বহির্বিশ্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা বৃদ্ধি আফ্রিকানদের জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইতিবাচক হয়েছে। বিদেশীরা বন্দর তৈরি করে, বীমা বিক্রি করে, মোবাইল ফোন প্রযুক্তি নিয়ে আসে। ইথিওপিয়া ও রুয়ান্ডায় চীনা কারখানাগুলোতে কর্মচাঞ্চল্য লেগেই থাকে। তুর্কী এয়ারলাইন্স ৫০টিরও বেশি আফ্রিকান নগরীতে যাত্রী বহন করে। ব্যবসাবাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরও বেশি মুক্তদ্বার নীতি গ্রহণের ফলে সাহারার দক্ষিণাঞ্চলের মাথাপিছু জিডিপি ২০০০ সালে যা ছিল তার চেয়ে এখন দুই পঞ্চমাংশ বেশি হয়েছে। অবশ্য সুষ্ঠু মাইক্রো অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ ও যুদ্ধবিগ্রহ কমে আসাও অন্যতম কারণ হিসেবে করেছে। আফ্রিকার খাদ্য আমদানি ও রফতানিও বাড়ছে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের খাদ্যের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ আমদানি করে থাকে। সম্প্রতি তারা খাদ্য আমদানির জন্য মালি, মৌরিতানিয়া, মরক্কো, মোজাম্বিক, সুদান, তাঞ্জানিয়ার সঙ্গে চুক্তি করেছে। অন্যান্য দেশ আফ্রিকাকে তাদের উদ্বৃত্ত পণ্য বিক্রি ও খালাস করার আদর্শ স্থান হিসেবে গণ্য করে।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট