১১ এপ্রিল ২০১৯

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই হোক বাঙালীর শক্তি

৩০ ডিসেম্বর ২০১৮, একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে মহাজোট বিপুল বিজয়ে পুনরায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। এদেশের জনগণ ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮-এর নির্বাচনে পরপর তিনবার আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। এ বিজয় জনগণের বিজয়, এ বিজয় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষের বিজয়। ১৯৯৬ এবং ২০০৮ হতে ২০১৮ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির বিজয়ের প্রধান উৎস সাধারণ মানুষের জন্য কল্যাণ, উন্নয়ন ও সাধারণ মানুষের প্রতি তাদের ভালবাসা। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সততা, নিষ্ঠা, সাহসিকতা, বিচক্ষণতা ও দক্ষতা এদেশের মানুষকে মুগ্ধ করেছে। জনগণ সব সময়ই সৎ নেতৃত্ব ও সৎ মানুষকেই ভালবাসেন। বর্তমান বিশ্বে শেখ হাসিনা একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নেত্রী। বিশ্ব তাকে সেই সম্মান দিয়েছে। এদেশের মানুষ ভাবে যতদিন আছে শেখ হাসিনার হাতে এদেশ পথ হারাবে না বাংলাদেশ। দেশের জনসাধারণ মনে করেন এদেশে শেখ হাসিনার বিকল্প আর কেউ নেই। যে উন্নয়নের গতিধারা শুরু হয়েছে এই ধারা অব্যাহত রাখতে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব একান্ত অপরিহার্য। সৎ নেতৃত্ব ছাড়া উন্নয়ন ও কল্যাণ সম্ভব নয়। জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর এদেশে সামরিক শাসন, স্বৈরাচারী শাসন দেশকে দুঃশাসন উপহার দিয়েছে। এরা জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করেছে, পাচার করেছে এবং বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়েছে। জিয়া, এরশাদ, খালেদা জিয়া একই ধারায় দেশ শাসন করেছে। এই শাসকদের হাত রক্তে রঞ্জিত, দুঃশাসনের কালো হাত। হত্যা ও ষড়যন্ত্র এদের চরিত্রে মিশে আছে। এরা মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আদর্শ ও ধারাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে। জনগণের মৌলিক চাহিদাকে এরা ধ্বংস করেছে। স্বাধীনতার মূল্যবোধ, মুক্তিযুদ্ধের দর্শন এদের কাছে মূল্যহীন।

ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিগত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে ২০ দল ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে। এখানে আ.স.ম. আব্দুর রব, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, মোস্তফা মহসীন মন্টু, সুব্রত চৌধুরী, সুলতান মোঃ মনসুর, ডাঃ জাফরুল্লাহ ও মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ কতিপয় রাজনীতিবিদের সমাহার ঘটেছিল। নির্বাচনে এদেশের জনগণ তাদের চরমভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। কে এই ড. কামাল হোসেন? বঙ্গবন্ধু তাকে রাজনৈতিক অঙ্গনে তুলে এনেছিলেন। নিজের ছেড়ে দেয়া ছিটে এমপি করেছেন। স্বাধীনতার পর তিনি জাতির পিতার দয়ায় মন্ত্রী হয়েছেন। তাকে সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্বও দেয়া হয়। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫, জাতির পিতার হত্যার পর তার ভূমিকা কী ছিল দেশবাসীর অজানা নয়। এতিম শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে তিনি বিদেশে কতটুকু সহায়তা করেছেন তিনি বলবেন কি? তখন তিনি বিদেশে ছিলেন। মোশতাক-জিয়া বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী সরকারের বিপক্ষে তিনি কোন বিবৃতিও দেননি। পঁচাত্তর পরবর্তী তার রহস্যময় ভূমিকার পরও শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধুর সহকর্মী হিসেবে তাকে কাছে রেখেছেন এবং রাষ্ট্রপতি পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছেন। আর এখন তার সামগ্রিক কর্মকা- কী? এখন তিনি বিএনপির অভিভাবক। ড. কামাল ও খালেদা জিয়ার এই মিলন এক অভূতপূর্ব সেতুবন্ধন। ১৯৭১ সালে ড. কামাল ছিলেন পাকিস্তানে আর খালেদা জিয়া ছিলেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে; তারা সুখেই ছিলেন। কে এই মাহমুদুর রহমান মান্না? তিনি মূলত কখনোই স্বাধীনতার সপক্ষের লোক ছিলেন না। তার পরিবার ছিল জামায়াত-শিবির, একভাই ছিলেন রাজাকার। তিনি একাত্তর সাল পর্যন্ত জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘ করতেন। ১৯৭২ সালে ছাত্রলীগে যোগ দেন। পরে জাসদ, বাসদ, গণমুক্তি, আওয়ামী লীগ, নাগরিক ঐক্যফ্রন্ট, যুক্তফ্রন্ট হয়ে এখন ঐক্যফ্রন্টে ড. কামাল হোসেনের সান্নিধ্যে। এবারের ডাকসু নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী জেতানোর জন্য নীরবে কাজ করেছেন। বাকি রব, মন্টু, কাদের সিদ্দিকী, সুব্রত চৌধুরী প্রমুখ সুযোগের অপেক্ষায় আছেন। দুর্নীতির জন্য সাজাপ্রাপ্ত খালেদা জিয়ার জন্য তাদের প্রাণ মন কাঁদে। এহেন বিচিত্র রাজনৈতিক চরিত্রের সম্মিলন দেশ ও জাতিকে ভাল কি দেবেন বোধগোম্য নয়। খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা উদীয়মান রাজনৈতিক নেতা ডাঃ জাফরুল্লাহ বিএনপি ও খালেদার ওকালতি করতে করতে বেহুঁশ হয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন টকশোতে তার নানাবিধ বক্তব্য শুনলে মনে হয় এহেন নেতাকে খালেদা জিয়া তার দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করলে ভাল হতো। বঙ্গবন্ধুর ছেলে দাবিদার বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেছিলেন, ২ জানুয়ারির মধ্যে তিনি নিজে গিয়ে কারাগারের তালা খুলে খালেদা জিয়াকে বের করে আনবেন। জনগণ এদের আজগুবি বক্তব্যের যথার্থ জবাবই দিয়েছেন।

সেদিন হাঁটাহাঁটির পর রমনা পার্কে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। সামান্য কিছু দূরে কয়েকজন ভদ্রলোকও বসেছিলেন। তাদের বক্তব্য শুনছিলাম। একজন বলছিলেন, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর যদি খালেদা জিয়াকে নিজের কন্যার মর্যাদা দিয়ে তার স্বামীর হাতে তুলে না দিতেন তাহলে এই মহিলা কোথায় থাকতেন তা কি ভাবা যায়? খালেদার একাত্তরের ভূমিকার জন্য স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমান তাকে ঘরে ঢুকতে দেননি। খালেদা জিয়া সোজা চলে যান বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাসায়। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের সহায়তায়, শেখ হাসিনার সহায়তায় তিনি নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন। খালেদা জিয়া স্বেচ্ছায় নয় মাস পাকিস্তানী বাহিনীর সহযোগিতায় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ছিলেন। জিয়াউর রহমান লোক পাঠিয়েও তাকে নিতে পারেননি। যারা নিতে এসেছিলেন তাদেরকে ধমক দিয়েছেন এবং বলেছেন, আমি ওই গাদ্দার জিয়ার কাছে যাব না। পরের ইতিহাস আমরা সবাই জানি। জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার আসল নায়ক ইতিহাসের দ্বিতীয় মীরজাফর খন্দকার মোশতাক ও কিলার জিয়াউর রহমান। খুনী ফারুক-রশিদের সাক্ষাতকার শুনলে আর কোন প্রমাণ লাগে না।

শেখ হাসিনা সততার বলিষ্ঠ উদাহরণ। সততা, নিষ্ঠা, দক্ষতা ও সাহসিকতার সঙ্গে তিনি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন উন্নতির উচ্চ শিখরে। বিশ্ব তাকে অগণিত খেতাবে ভূষিত করেছে। এদেশের জনগণ এজন্য গর্বিত। তার সন্তানেরা শিক্ষাদীক্ষা জ্ঞান গরিমায় আদর্শ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাদের সাফল্যে বিশ্বে তারা প্রশংসিত হচ্ছেন। রত্মগর্ভা এই মা বিশ্বের জন্য আশীর্বাদ। জয়তু শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। প্রধানমন্ত্রীর বোন শেখ রেহানার সন্তান টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটিশ রাজনীতিতে একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। অন্যান্য সন্তানও স্ব-স্ব ক্ষেত্রে ভাস্বর। এদেশের মানুষ জাতির পিতার পরিবারের সদস্যদের সততা, নিষ্ঠা ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশ ও জাতির উন্নয়নে অবদান রাখার জন্য গর্ব অনুভব করে। আশা করি উন্নয়নের এই ধারায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে উন্নতির উচ্চ শিখরে। বাংলাদেশ বিশ্বে আজ এক উন্নয়নের রোল মডেল। গণতন্ত্র ও উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত গতিতে চালাতে হলে আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সমাজ হতে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, অপরাধ, অপরাজনীতি, যুদ্ধাপরাধী, রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও তাদের দোসরদের চিরতরে নির্মূল করতে হবে। সমাজ হতে সন্ত্রাস, মাদক, ইয়াবা ব্যবসায়ী, জঙ্গী ও অপরাধীদের দমন করতে না পারলে উন্নয়ন টেকসই হবে না, গণতন্ত্র বিকশিত হবে না। সরকারকে তাই আরও কঠোর হতে হবে। কেননা এদেশে স্বাধীনতাবিরোধী ও তাদের দোসররা বিদ্যমান। তারা নানা তৎপরতা ও অপকর্মে লিপ্ত। আমাদের দুর্ভাগ্য যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করে স্বাধীনতাবিরোধীদের এখনো দমন করতে পারিনি। এদেশে স্বাধীনতার পক্ষ ও বিপক্ষ একসঙ্গে থাকতে পারে না। স্বাধীনতাবিরোধীরা যতদিন থাকবে ততদিন এদেশে শান্তি আসবে না। সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা কঠিন হবে। গণতন্ত্র ও উন্নয়নের স্বার্থে এই অশুভ শক্তিকে স্তব্ধ করে দিতে হবে। এরা বাংলাদেশে বিশ্বাস করে না, এরা মনে প্রাণে পাকিস্তানী। আসুন সকলে মিলে এই অপশক্তিকে পরাজিত করি। আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করি। এই লক্ষ্যেই আমাদের এগোতে হবে বলিষ্ঠ পদক্ষেপে। রাজনীতি হবে মানুষের কল্যাণের জন্য, জনগণের উন্নতির জন্য। কথাবার্তায় আচার-আচরণে রাজনীতিবিদদের মুক্তিযুদ্ধের মূল আদর্শকে স্বাধীনতার মূলমন্ত্রকে ধারণ করতে হবে, লালন করতে হবে এবং পালন করতে হবে। সকলে শুদ্ধ হলেই রাজনীতি শুদ্ধ হবে এবং মানুষের কল্যাণ সাধিত হবে। বাংলাদেশ পৃথিবীতে হবে একটি আদর্শ ও উন্নত রাষ্ট্র।

শেখ হাসিনার সরকার চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। নতুন ও নবীন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে। কতিপয় বিতর্কিত সদস্য বাদ পড়েছেন, জনগণ খুশি হয়েছেন। আশা করি, নতুন এ সরকার দেশবাসীর আশাআকাক্সক্ষা পূরণে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন। অতীতের ভুল হতে শিক্ষা নিয়ে সামগ্রিক কর্মকা-কে ঢেলে সাজাতে হবে আগামী এক সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য। সামগ্রিক কর্মকা-কে চালাতে হবে অত্যন্ত প্রাজ্ঞতা, বিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে। আমরা মনে করি, ত্রিশ লাখ শহীদ ও চার লক্ষাধিক মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে হবে। স্বাধীনতাবিরোধী মুষ্টিমেয় মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। দলমত নির্বিশেষে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে একটি সুখী সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ে জাতির পিতার ও ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হবে। এখনও যারা বাইরে আছেন মূলধারায় ফিরে আসুন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে সহায়তা করুন।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সচিব