১২ এপ্রিল ২০১৯

নুসরাত হত্যার বিচার

ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির ওপর পর্যায়ক্রমে যে অন্যায় ও নৃশংসতা সংঘটিত হয়েছে তাতে সমাজের গভীরতর ব্যাধিই প্রকট হয়ে উঠেছে। একইসঙ্গে কেঁপে উঠেছে সমাজের মর্মমূলও। নারীর ওপর নানা স্তরে নানা পদ্ধতিতে নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। কিন্তু নুসরাতের সঙ্গে যা হলো তা বোধকরি পূর্বেকার সকল নারী নিপীড়নের ঘটনার সঙ্গে তুলনায় বিশেষ ব্যতিক্রম এবং অত্যন্ত পৈশাচিক। এ কোন বর্বর সময় যখন একটি মেয়ের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়! কী দোষ ছিল নুসরাতের? সে ছিল প্রতিবাদী এবং আপোসহীন। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা তার ওপর যৌন নিপীড়ন চালায়। নুসরাত তার প্রতিবাদ করে এবং পরিবারের অভিভাবক আইনগত ব্যবস্থা নেয়। নুসরাতের ওপর ওই মামলা তুলে নেয়ার প্রবল চাপ ছিল। কিন্তু নুসরাত আপোস করার মতো মেয়ে নয়। সে কঠোর অবস্থান নেয়। কুলাঙ্গারচক্র শেষ চেষ্টা চালায় নুসরাতকে দিয়ে মামলা প্রত্যাহারের। যখন তারা নিশ্চিত হয় যে নুসরাতকে টলানো যাবে না, তখনই তাকে আগুনে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করা হয়। অগ্নিদগ্ধ নুসরাতকে ঢাকায় নিয়ে এসে সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেয়া হয়। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তাকে সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে পাঠানোর নির্র্দেশও দেন। কিন্তু সে অবস্থা ছিল না নুসরাতের। অনেক কষ্ট পেয়ে ১০৮ ঘণ্টা লড়ে শেষ পর্যন্ত নুসরাত মারা যায়। এই মৃত্যুর কোন সান্ত¡না হয় না। নুসরাতের পরিবারকে কী বলে সান্ত¡না দেবে মানুষ!

নুসরাতের ওপর বর্বরোচিত ঘটনার নিন্দা জানাচ্ছে সারা দেশের মানুষ। তার ওপর অন্যায় আচরণ ও তার মর্মান্তিক মৃত্যুতে ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত দেশবাসী। নানাভাবেই এর প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে, নুসরাতের হত্যার বিচার চাওয়া হচ্ছে। বিচার তো হতেই হবে। এখানে বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। মূল অপরাধী সিরাজ-উদ-দৌলা, তাতে কোন সংশয় নেই। তবে শুধু তার নয়, বিচার করতে হবে যারা নুসরাতের গায়ে আগুন দিয়েছে তাদের সবার। কারণ, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকা-। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। অপরাধের মামলার ভার দেয়া হয়েছে পুলিশের ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। এর ভেতর দিয়ে অনুমেয় যে পুলিশ কর্মকর্তা প্রকৃত ঘটনাকে ভিন্ন পথে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা চালিয়েছিল। প্রকারান্তরে তা অপরাধীকে বাঁচানোরই অপচেষ্টা। বিচার করা চাই সবার। এমনকি অপরাধীর মুক্তির দাবিতে যারা সভা করে সর্মথন জানিয়েছে ও প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বক্তব্য দিয়েছে তাদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরী।

নুসরাতের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত শোক প্রকাশ করেছেন। যে কোন শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষই আজ শোকগ্রস্ত। শুধু শোক প্রকাশ করে নয়, সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলে এদেশ থেকে নারী নির্যাতন চিরতরে দূর করা চাই। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে নুসরাতের হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দিয়েছেন। মানুষ আশা করে নুসরাতের অপমান ও পুড়িয়ে মারার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যারাই জড়িত তাদের সবাইকে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে। ভয়ঙ্কর অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলেই মানুষ স্বস্তি বোধ করবে।

একজন শিক্ষকের কাছে শিক্ষার্থী হবেন সন্তানতুল্য। সেই সন্তানের ওপর কুদৃষ্টি যারা দেয় এবং যৌন নিপীড়ন করে তারা শিক্ষকের মতো মর্যাদাপূর্ণ পদে থাকতে পারে না। দেশের প্রতিটি শিক্ষালয়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শিক্ষার্থী-শিক্ষক সবার সম্মিলিতভাবে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার যাতে করে অনৈতিক আচরণ করার কোন ধরনের সাহস কেউ না পায়। আমরা নুসরাতের শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে আছি।