১৩ এপ্রিল ২০১৯

রাফি হত্যা আসামিদের ৯০ দিনের মধ্যে ফাঁসির দাবি

রাফি হত্যা  আসামিদের ৯০ দিনের মধ্যে ফাঁসির দাবি

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির হত্যা মামলার আসামিদের ৯০ দিনের মধ্যে ফাঁসির দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। একইসঙ্গে যারা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও তার সঙ্গীদের আশ্রয়- প্রশ্রয় দিয়েছেন তাদের আসামি করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুলের মাধ্যমে শাস্তির দাবি জানান তারা। পাশাপাশি আইন বর্হিভূতভাবে নুসরাতের ভিডিও ধারণ করায় ফৌজদারী অপরাধী হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকেও আইনের আওতায় আনা হবে বলেও মনে করেন মানববন্ধনে অংশ নেয়া আইন বিশেষজ্ঞরা।

শনিবার রাফি হত্যার প্রতিবাদে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মানববন্ধনের আয়োজন করে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সহ পেশাজীবী সংগঠন। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, বিচারপতি, মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সহ বিশিষ্টজনরা অংশ নেন।

গণভবন-বঙ্গভবন পর্যন্ত সিপিবির মানববন্ধন ॥ ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার প্রতিবাদে রাজধানীর গণভবন থেকে বঙ্গভবন পর্যন্ত মানববন্ধন কর্মসূচী থেকে নারী নির্যাতন প্রতিরোধের ডাক দিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি- সিপিবি। শনিবার সকালে ঢাকার আসাদ গেইট থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে মানবন্ধনে দাঁড়ান দলটির হাজারো নেতা-কর্মীরা। এছাড়াও এই হত্যাকা-ের ৯০দিনের মধ্যে বিচার দাবি জানিয়ে রাজধানীতে আরো একাধিক রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন মানববন্ধন করেছে।

মতিঝিলে রাজউক ভবনের সামনে মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, এই আন্দোলনে শুধু সিপিবির না, এটা সব দলের আন্দোলন। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন শেষ হবে না। আগামী ২০-২৭ তারিখ পর্যন্ত নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সপ্তাহ পালন করা হবে।

সেলিম বলেন, যে স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন করতে দেয়া হয়নি। তখন সবাই পাকিস্তান আমলের জুলুম অত্যাচার নিঃশেষ হয়ে যাবে বলে আশা করছিল। আজকে দেশকে নতুন অন্ধকারের দিকে নিক্ষেপ করা হয়েছে। ফেনীর সোনাগাজীর নুসরাত তার মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনেছিলেন। তাকে সেই মামলা প্রত্যাহারের চাপ দেয়া হলেও তিনি রাজি না হওয়ায় তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। পাঁচ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে মারা যান এই তরুণী।

নুসরাতের মৃত্যুতে দেশজুড়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভের মধ্যে মানববন্ধনের এই কর্মসূচী ডাকে সিপিবি। ঢাকার পাশাপাশি সারাদেশে একই ধরনের কর্মসূচী পালিত হয় বলে দলটির নেতারা জানান। ঢাকার আসাদ গেইটে মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আমরা নুসরাত হত্যার ন্যায়বিচার চাই। এই ঘটনার সঙ্গে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত, সবাইকে আইনের আওতায় নিয়ে কঠোর শাস্তি দিতে হবে।

এই ঘটনার কঠোর শাস্তি দেয়া সরকারের জন্য একটি অগ্নি পরীক্ষা। নূসরাত হত্যার কঠোর শাস্তি দিয়ে সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে দেশে আইনের শাসন আছে। আসাদ গেইটের মানববন্ধনে হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ, টিআইবি, নারী পক্ষ, কেন্দ্রী খেলাঘর, কৃষিবিদ ইউনিয়নসহ ১২-১২ টি সংগঠন যোগ দেয়।

মানববন্ধনে এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক সামসুল হুদা বলেন, নূসরাতের বিচার করতে সরকার যে ঘোষণা দিয়েছে, তা যেন কথার কথা না হয়। আমরা আইনের শাসন দেখতে চাই। ধানম-ি ২৭ নম্বর সড়কের মানববন্ধনে কলামনিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, এই ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে। নুসরাত হত্যার দ্রুত বিচারসহ পূর্বে এ ধরনের সবগুলো ঘটনার বিচার করতে হবে।

সেখানে দাঁড়িয়ে মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল বলেন, আমাদের সংস্কৃতি হল ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে রাস্তায় নামি, তারপর এক সময় সব ঘটনাই ধামাচাপা পড়ে যায়, এ থেকে আমরা পরিত্রাণ চাই। নুসরাতের মতো যাতে আর কোনো ঘটনা না ঘটে, এর জন্য আমরা এই ঘটনাসহ সবগুলো নারী সহিংসতায় জড়িতদের কঠোর শাস্তি চাই।

মানববন্ধনে বিভিন্ন সংগঠনের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন, সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহ আলম, সহকারী সাধারণ সম্পাদক কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, প্রেসিডিয়াম সদস্য লক্ষ্মী চক্রবর্তী, আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, কোষাধ্যক্ষ মাহবুবুল আলম, সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, জলি তালুকদার, বাসদ নেতা বজলুর রশীদ ফিরোজ, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের নেতা ফয়জুল হাকিম, টিইউসি’র সভাপতি সহিদুল্লাহ চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান, উদীচী সভাপতি অধ্যাপক সফিউদ্দিন আহমেদ, সহ-সভাপতি অধ্যাপক বদিউর রহমান, সাধারণ সম্পাদক জামশেদ আনোয়ার তপন, সিপিবি’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অ্যাড. মন্টু ঘোষ, অ্যাড. মাকছুদা আক্তার লাইলী, অ্যাড. সোহেল আহমেদ, ডা. সাজেদুল হক রুবেল সাদেকুর রহমান শামীম, অভিনু কিবরিয়া ইসলাম, হাসান তারিক চৌধুরী সোহেল, লুনা নূর, সিপিবি ঢাকা কমিটির সভাপতি মোসলেহ উদ্দিন।

৯০ দিনের মধ্যে হত্যাকারীদের বিচার দাবি ॥ নুসরাত জাহান রাফির হত্যা মামলার আসামিদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ফাঁসির দাবি জানান বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিষ্ট ফোরাম (বোয়াফ)। সেই সাথে যারা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে ধর্ষক, খুনি সিরাজ-উদ-দৌলা ও তার সঙ্গী-সাথীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে, তাদেরও আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির দাবি তুলে সংগঠনটি।

শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাব চত্বরে ‘ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাতের খুনিদের ৯০ দিনের মধ্যে ফাঁসির দাবি’তে এক মানববন্ধন কর্মসূচী পালনের মাধ্যমে এই দাবি জানানো হয়।

মানববন্ধনে অংশ নিয়ে বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নুসরাত হত্যার আসামীদের ফাঁসি নিশ্চিত করা এখন দেশবাসীর দাবি। সেই সাথে আইন বর্হিভূতভাবে নুসরাতের ভিডিও ধারণ করায় ফৌজদারী অপরাধী হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকেও আইনে আওতায় আনা হবে আইনের শাসনের দৃষ্টান্ত।

তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা একটি ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। নুসরাত হত্যার সাথে সম্পৃক্ত বা অপরাধীদের পক্ষপাততুষ্ট স্থানীয় কতিপয় আওয়ামী লীগ নেতাকে বহিঃস্কার করেছে। আমি মনেকরি, শুধু বহিঃস্কার করলেই হবে না, তাঁদের অপরাধ নির্ণয় করে সে অপরাধের বিচার করা উচিত।

মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন বোয়াফ সভাপতি কবীর চৌধুরী তন্ময়, বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশনের নির্বাহী সভাপতি-অশোক বড়–য়া, সাংস্কৃতিক ব্যক্তি মোহাম্মদ ফয়সাল আহসানউল্লাহ, আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য-মুফতী মাসুম বিল্লাহ নাফী, জাতীয় গণতান্ত্রিক লীগের সভাপতি-এমএ জলিল, বাকশালের মহাসচিব-কাজী মোহাম্মাদ জহিরুল কাইয়ূমসহ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

সর্বোচ্চ শাস্তির প্রত্যাশা ॥ গ্রীন ভয়েস-এর উদ্যোগে সোবহানবাগ, ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির সামনে “নুসরাত হত্যার বিচার, নারী-শিশু ধর্ষণ-হত্যা, ক্রমবর্ধমান বর্বরতা, রাষ্ট্রের ক্ষমাহীন উদাসীনতা, নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয়ের” প্রতিবাদে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

গ্রীন ভয়েস প্রধান সমম্বয়কারী ও বাপা’র যুগ্ম সম্পাদক, আলমগীর কবির এর সভাপতিত্বে এবং বাপা’র, যুগ্ম সম্পাদক, হুমায়ন কবির সুমন-এর সঞ্চালনায় মানববন্ধন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন, বাপা’র সহ-সভাপতি, মানবাধিকার কর্মী এডভোকেট সুলতানা কামাল, বিশিষ্ট লেখক-কলামিষ্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, সহ-সভাপতি, বাপা, সাবেক ছাত্র নেতা রুস্তম আলী খোকন, নারী পক্ষের সামীয়া আফরিন, পরিবেশবিদ সৈয়দা রতœা, এডভোকেট একরাম হোসেনসহ বিভিন্ন কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীবৃন্দ। সমাবেশে বক্তারা নুসরাত হত্যার বিচারসহ সকল নারী-শিশু ধর্ষণ-হত্যার বিচারের দাবী জানান।

সুলতানা কামাল বলেন, বার বার কেন আমাদের একই দাবী নিয়ে রাস্তায় দাঁড়াতে হবে। রাষ্ট্রযন্ত্র যখন তাদের দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন না করে তখনই এ সমস্ত হত্যাকান্ড ঘটে। এই রাষ্ট্র দুষ্টের দমন করতে ব্যর্থ হওয়ায় তনুর মত নুসরাতকেও খুন হতে হলো। আদালত যখন বলে, তনু ও সাগর-রুনীর হত্যার মত নুসরাতের ঘটনাও যেন চাপা পড়ে না যায়। তখন আমরা কার ওপর ভরসা করবো?। তিনি আরো বলেন, এটা একটা সুপরিকল্পিত হত্যা কান্ড। আমরা এর দোষীদের সবোর্চ্চ শাস্তি দেখতে চাই, প্রতিশ্রুতি না।

সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, আমরা আর কতো তনু, নুসরাতের মত হত্যা কান্ড দেখবো? না আর কোন মায়ের বুক এ ভাবে খালি হতে দেখতে চাই না। আমরা সরকারের নিকট দাবী জানাই যেন, অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা না করা হয় পাশাপাশি হাইকোর্টের বিচারকের সমম্বয়ে বিচারবিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে তদন্ত করে অপরাধীদের বিচারের দাবী জানাই।

ফেনী সমিতির মানববন্ধন ॥ ফেনী সমিতির মানববন্ধন থেকে নুসরাত হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করা হয়। বক্তারা বলেন, আসামিদের এমন শাস্তি দেয়া হোক, যেটা দেশবাসীর কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। কোনো মানুষ আর এ ধরনের ন্যাক্কার কাজ করার সাহস না পায়। পাশাপাশি এ অমানুষিক হত্যাকা- স্মরণে ১০ এপ্রিলকে নুসরাত দিবসের দাবি জানানো হয়।

সমিতির সভাপতি শেখ আব্দুল্লাহর সভাপতিত্বে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য শিরীন আক্তার, ফেনী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাহাদাত হোসেন সেলিম প্রমুখ। বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশন, বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী ও রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে নগরীর বিভিন্ন স্থানে নুসরাত হত্যার প্রতিবাদে মানবন্ধনের আয়োজন করা হয়।