১৮ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইরানের নওরোজ ফাল্গুন মাসে

  • শরীফা খন্দকার

ইরানী নওরোজকে বিশ্বের ইতিহাসে বলা হয়েছে পৃথিবীর প্রাচীনতম নববর্ষ। নতুন বছর শুরুর এই বর্ণাঢ্য উৎসবের একদিকে যেমন রয়েছে সুবিশাল এক ঐতিহাসিক পটভূমি, অন্যদিকে ঐতিহ্য ও নান্দনিকতার অপরূপ মিশেল। খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ সনে পারস্যের সর্বপ্রথম সম্রাট সাইরাস দা গ্রেট সিংহাসনে অধিষ্ঠিত থাকার সময় থেকেই এদিন উদযাপনের কথা শোনা যায়। কথিত আছে বৃহত্তর ইরানে নওরোজ পালনের সূচনা হয়েছিল সেই আমলের আরও দু’ শ’ বছর পূর্ব থেকেই। যদিও কিংবদন্তি ছাড়া নওরোজ উৎসবের প্রকৃত সময়টি সঠিকভাবে জানা সম্ভব নয়, তবে ঐতিহ্যগতভাবে নিঃসন্দেহে নওরোজ একটি জরথুস্ত্রবাদী উৎসব। জরথুস্ত্রবাদ হচ্ছে পৃথিবীর আদিতম ধর্ম এবং বর্তমান সময় পর্যন্ত পারসিক সম্প্রদায়ের ধর্ম হিসেবে প্রচলিত রয়েছে।

নওরোজের বিশেষত্ব হচ্ছে একটি প্রাচীন ধর্ম থেকে সৃজিত হলেও পরবর্তী সময়ে নানান ধর্মের যে সমস্ত মানুষ পারস্য সংস্কৃতির অন্তর্গত হয়েছে যেমন ইহুদি, খ্রীস্টান, মুসলিম কিংবা বাহাই সকলেই নিজ নিজ ঐতিহ্য হিসেবে গ্রহণ করে এসেছেন নওরোজকে। শুধু তাই নয়, পারস্যের শক্তিমান সম্রাটরা যেসব দেশ জয় করেছেন সেখানেও তারা বহন করে নিয়ে গেছেন তাদের নববর্ষ উৎসবটি। সে কারণে তদানিন্তন পারস্য সাম্রাজ্যের অন্তর্গত এলাকা থেকে বিস্তৃত হয়ে একসময় নওরোজ ছড়িয়েছে পড়েছিল ইরান দেশের তদানিন্তন সকল অন্তর্গত প্রদেশ এবং শাসিত রাজ্যগুলোতে। বর্তমান সময়ে সীমানা প্রাচীর ভিন্ন ভিন্ন হয়ে গেলেও সে সমস্ত অঞ্চলে আজও নওরোজ একটি বৃহৎ উৎসব। ইউনেস্কো ২০০৯ সালে নওরোজকে স্বীকৃতি দিয়েছে আজারবাইজান, ভারত, ইরান (ইসলামিক প্রজাতন্ত্র), ইরাক, কাজাকিস্তান, কিরগিজস্তান, পাকিস্তান, তাজিকিস্তান, তুরস্ক, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তানের সংরক্ষিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে।

ইরানের নওরোজ ভারতবর্ষে এসেছিল পারস্য থেকে আগত মোগল সম্রাটদের হাত ধরে। নতুন বছরের সূচনায় নওরোজ পরব বাদশাহী পৃষ্ঠপোষকতায় নানাবিধ ঐতিহ্য, আচারানুষ্ঠান নিয়ে রাজধানী দিল্লীসহ নানা স্থানে উদযাপিত হতো অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে এবং সেই পরব ছিল প্রায় দু’হফতাব্যাপী। মোগলদের বাদশাহী যুগের অবসানের পরও এই উৎসবের কথা শুধু ইতিহাসের কালো কালিতে লেখা হয়ে থাকেনি। পরবর্তীকালে এই নওরোজ নিয়ে রচিত হয়েছে নানা গল্প কাহিনী কবিতা, তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র। বাংলা নাটক উপন্যাস ছাড়াও নওরোজ জায়গা করে নিয়েছিল গ্রামীণ যাত্রা থিয়েটারেও। ভারতে বসবাসকারী পারসী সম্প্রদায় বর্তমান সময়েও সমারোহের সঙ্গে উদযাপন করে নওরোজ। প্রসঙ্গক্রমে স্মরণ করিয়ে দেয়া যায়, ভারতীয় ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট পাইওনিয়ার জামশেদজি টাটা এবং তার বংশ পরম্পরার কথা। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর স্বামী ফিরোজ গান্ধীর কথা।

আমার আমেরিকা প্রবাস জীবনের প্রথম দশকে আমার ইরানি সহকর্মী মাসুমে বলেছিল তার সমাজের সবচাইতে বড় পর্ব ‘জামশিদ নওরোজ’ সত্যি কথা বললে বলতে হবে ও আসলে ফেস্টিভাল কিংবা হলিডে শব্দ কোনটাই ব্যবহার না করে উচ্চারণ করেছিল ঈদ শব্দটি।

-আমাদের সবচাইতে বড় ঈদ উপলক্ষে সমগ্র ইরান ও আরও কিছু দেশে স্কুল কলেজ- অফিস আদালতে ১২ দিনের ছুটি থাকে। এই উপলক্ষে সে দু’সপ্তাহ ছুটি চেয়েছে। এমনিতেই তো কোনদিন ধর্মীয় গোঁড়ামির পথে হাঁটিনি। তারপরও সহসা মুখ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল।

-আরব্য ঈদ তোমাদের নওরোজ হয় কেমন করে?

- ঈদ আরবি শব্দ বটে কিন্তু তার অর্থটা কি জান? ঈদের মানে হচ্ছে আনন্দময় উৎসব।’

বাড়ি গিয়ে ডিকশনারি ঘেঁটে ঘুটে দেখলাম আসলেই আরবি ঈদ মানে ফিস্ট, ফেস্টিভ্যাল কিংবা হলিডে। ব্যাপারটা আমার অতি ক্ষুদ্র জ্ঞান চক্ষু যেন খুলে দিল কিছুটা হলেও। তবে সেই গল্পের দিনে মাসুমেকে ফের জিজ্ঞেস করেছিলাম-

-কিন্তু ‘জামশিদ নওরোজ’টা কি জানিনা তো? যদিও নওরোজের কথা অনেক শুনেছি।

নিজ সংস্কৃতি নিয়ে গরবিনী মেয়ে অবজ্ঞার সুরে আমাকে বলল-

-বাহ্ শুধু নওরোজ জান অথচ জামশিদ নওরোজের কথা জান না সেটা কি করে হয়? আমাদের দুনিয়া ছাড়া অন্য মার্কিন কলিগদের কেউ হলে কিছু বলার ছিল না। কিন্তু তুমি নিজেই তো আমার কাছে গল্প করেছ তোমার নানা এবং তার পূর্বপুরুষরা নাকি পড়তেন হাফিজ, রুমি, খৈয়াম। অথচ এসব কবিদের সবাইতো লিখেছেন জামশিদ নওরোজের কথা। আর ফেরদৌসী? তুমি স্কুলেই নাকি পড়েছিলে মহাকবি ফেরদৌসীর নাম তাঁর শাহনামাতে তো আছে কিংবদন্তির সম্রাট জামশিদের নওরোজের কথা! কবুল করলাম আমি আসলেই ব্যাপারটা জানি না। তবে ওর কাছে জানলাম পার্সিয়ান রাজাদের মধ্যে জনপ্রিয় এবং জাঁকজমকশালী পৌরাণিক রাজা হচ্ছেন জামশিদ। ইরানিয়ান সাহিত্য বিশেষত কাব্য সাহিত্যে হাফিজ সাদী রুমির কাব্য গ্রন্থে জামশিদ এসেছেন। মহাকবি ফেরদৌসীর শাহনামায় বর্ণিত আছে যে জামশিদ ছিলেন দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ও চতুর্থ সম্রাট। তার আমলেই মানব সভ্যতা চূড়ান্ত রূপলাভ করেছিল। তিনি রাজত্ব করেছিলেন ৭০০ বছর।

মাসুমে আরও জানিয়েছিল তাদের নববর্ষকে ‘জামশিদ নওরোজ’ নামে অভিহিত করার কারণ হচ্ছে পার্সিয়ান বর্ষপঞ্জি সর্বপ্রথম উদ্ভাবন করেছিলেন এই রাজাধিরাজ। শুধু তাই নয়, ইরানি বছর আরম্ভের মাস ফারভারদিনের শুভারম্ভ দিবসে মূল্যবান রত্ন খচিত সিংহাসনে বসে মহামহিম সম্রাট জামশিদ প্রজাবর্গকে নিয়ে সর্বপ্রথম উদযাপন করেছিলেন নওরোজ। আর সেই একই দিনে একটি ঘটনা তার সিংহাসন উল্টে দিলে জনতার চোখের ওপর দিয়ে তিনি উড়ে চলে যান আকাশে। তাই ইরানে নববর্ষ শুরুর দিনটিকে জামশিদ-ই-নওরোজ বলাই রীতি।

আমি ওকে যা বলেছিলাম সেটা হলো মোগল আমল থেকেই সমাজের বহু শিক্ষিত মানুষ চর্চা করতেন ফার্সি যেটা অব্যাহত ছিল ইংরেজ আমলে আমার নানার প্রথম যুগ পর্যন্ত। তিনি সুফিবাদের চর্চা করতেন বলে তার আসরে আলোচনা হতো রুমির মসনবী-দিওয়ানে হাফিজ ইত্যাদি। ফার্সি কবিদের কবিতা শুনতাম তাঁর মুখ থেকে। আমি ছোটবেলা থেকে এসব নিয়ে বাড়িতে যা কিছু শুনেছি সেসব কেবলি কবিতার অংশ- এসব নিয়ে আমার কোন লেখাপড়া কিংবা বিস্তারিত জ্ঞান নেই। আমাদের বিখ্যাত কবি নজরুলের বহু গানে ও কবিতায় রয়েছে ফারসি সংস্কৃতির ছোঁয়া। এই কবি তাঁর একটি গানে লিখেছেন ইরানের নওরোজ ফাল্গুন মাসে। ওর কাছে ফাল্গুনের অনুবাদ করে বলেছিলাম মান্থ অব স্প্রিং সেই সঙ্গে বলেছিলাম বাংলা জুড়ে ফাগুন মাস বৃক্ষের শাখায় শাখায় আনে প্রস্ফুটিত ফুলের দোলা।

-আচ্ছা বলতো কোন মাসে আসে তোমাদের নববর্ষ?

পার্সিয়ান সেই তরুণীর কাছ থেকে সবিস্ময়ে শুনলাম শীতের অবসানে যখন পুনর্জন্ম হয় প্রকৃতির-, তখনই মহাবিষুবের ক্ষণে বসন্তের আসে ডাক এবং ইরান ভূমিতে সমাগত হয় নওরোজ।

নওরোজ আসে ইরানিয়ান সৌর পঞ্জিকার প্রথম মাস ফারভার্ডিনের প্রথম দিনে, ইংরেজী ক্যালেন্ডারের মার্চ মাসে। ঐদিনটিতে পৃথিবীর অবস্থান হয় বিশুব রেখায় এবং দিন রাত্রি হয় সমান সমান। এটি উদ্যাপিত হয় জ্যোতির্বিজ্ঞানভিত্তিক গণনার দ্বারা। ওদের রেডিও টেলিভিশনে ঘোষণা আসে নওরোজ ক্ষণের এবং সেই মুহূর্ত থেকে শুরু হয় উদযাপন। তখন নার্গিস বনে ফুলের উৎসব, বনগোলাপের ঝাড়গুলোতে ফুল কুসুমের মেলা আর বাগিচায় বাগিচায় বুলবুলির মাতিয়ে তোলা সুর।

নজরুল ফারসি সংস্কৃতি, ভাষা, সাহিত্য ও ইতিহাসের সঙ্গে একীভূত হয়েছিলেন জানি কিন্তু এমন সুপরিচিত গানে নওরোজ আর ফাল্গুনের হিসেবে চমৎকৃত না হয়ে পারলাম না। মাসুমের কাছে শুনেছিলাম পারস্য দেশের নওরোজ পরব উদযাপনের বর্তমান ও অতীতের অজানা অজানা কথা। নিজ বাস গৃহে- পড়শী আত্মীয়-স্বজন নিয়ে নওরোজের পর্ব চলে ১২ দিনব্যাপী কিন্তু সেই দিনেই সেটা শেষ হয়েও শেষ হয় না। তখন ইরান দেশের ফাল্গুন ডাক দিয়ে যায় গ্রাম বা শহরের সব মানুষকে। এ যেন ‘ওরে ও গৃহবাসী খোল দ্বার খোল লাগলো যে দোল স্থলে জলে বনতলে লাগলো যে দোল।’ আর তাইতেই নওরোজ সমাপন হবার পর ১৩তম দিবসের প্রত্যুষেই গৃহগুলোর দ্বার শুধু খুলে নয় যেন শূন্য প্রেতপুরী বানিয়ে বসন্তের নবীন আনন্দে ভাসতে ভাসতে ছুটে যায় ঘর থেকে বহু দূরে। ‘সিজদাহ বেদার’ নামে এই উৎসবের অর্থ ‘তেরো দিন পালন’ যার আর এক নাম ‘প্রকৃতির দিন’। দল বেঁধে সেদিন সব বয়সের মানুষ হারিয়ে যায় পাহাড়ের পুষ্পিত কোন ফুলের মেলায়, সুদৃশ্য কোন প্রস্রবণ, নদ-নদী কিংবা বন বনান্তরে। তাদের গান, নাচ এবং নানাবিধ আনন্দ কোলাহলে ভরে ওঠে ধরণী। বিবাহযোগ্য বয়সের মেয়েরা বন্য ঘাসে গিঁট দিয়ে কামনা করে নবীন বছরে তাদের যেন ভাল বরের সঙ্গে বিয়ে হয় এবং সুন্দর শিশু নিয়ে তারা যেন গড়তে পারে সুখী সংসার।

আমি মাসুমকে বলেছিলাম মোগল অন্দরের রাজকীয় উৎসব পালনের কথা। সম্রাটদের নওরোজ উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল মিনা বাজারের কথা। রাজপুত্র সেলিম যিনি পরবর্তীকালে জাহাঙ্গীর নাম ধারণ করে সিংহাসনে আরোহণ করেন তার সঙ্গে সেখানেই দেখা হয়েছিল রূপবতী বুদ্ধিমতী নূরজাহান নামের ইতিহাস খ্যাত যুবতীর। সেলিম ও নূরজাহানের প্রণয় কাহিনী ও বিবাহ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাদের কাহিনী নিয়ে বাংলা সাহিত্যে ছিল গল্প কাহিনী।

ও জানিয়েছিল পারস্যের সাধারণ মানুষের নববর্ষ বরণের রীতি ও প্রথার কথা। নতুন বছর আগমনের মাসাধিক পূর্ব থেকে ঘর-বাড়ি পরিচ্ছন্নতা ও সাজানো গোছানোর পর্ব শুরু হয়। মূলত নওরোজ হলো একটি ফসলি পরব। গ্রামাঞ্চলে এটা উদযাপন হয় ফসল উৎসব হিসেবে। শহরে এটি হয় রূপক আকারে। নতুন বছরের ঠিক দশ দিন আগে থেকেই বড় গোল পাত্রে ও চায়না প্লেটে ভিজিয়ে রাখা হয় গম, ডাল, বার্লিসহ নানাবিধ ফসলের বীজ যাতে করে নওরোজ শুরুতে এই চারাগুলো হয়ে ওঠে তিন থেকে চার ইঞ্চি। এই সাজশয্যা হয় একটি বড় টেবিলের ওপর। সেখানে সাজানো হয় নানাবিধ ফল। এসবের প্রতিবিম্ব তৈরির জন্য সেখানে রাখা হয় বড় আয়না।

আমি ওকে সব শেষে জানালাম বাংলা ফসলি ক্যালেন্ডার তথা নববর্ষের প্রবর্তক মোগল বাদশা আকবর দি গ্রেটের কথা। আমাদের নববর্ষের নাম ‘জামশিদই নওরোজ’ তো নয় তবে হতে পারত ‘আকবরী-ই-নওরোজ’।

সঙ্গীতজ্ঞ এই সম্রাটের নবরত্ন সভায় ছিলেন গায়ক মিঞা তানসেন- যার রাগ মেঘমল্লারে নামতো বৃষ্টি, রাগ দীপকের রাগিণীতে জ্বলে উঠতো নেভা প্রদীপ। আমাদের শহরে শহরে সূর্যোদয়ের সঙ্গে নববর্ষ আঁখি মেলে সুরের ধারায়। যদিও বাংলার গ্রাম দেশে এই নববর্ষ পালিত হয় নানা ঐতিহ্যে মিলে মিশে।

লেখক : নিউইয়র্ক প্রবাসী লেখিকা

নির্বাচিত সংবাদ