২৩ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাংলা নববর্ষ ॥ বাঙালীর বৃহত্তম সর্বজনীন অনুষ্ঠান

  • সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী

বাংলা নববর্ষের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় শৈশবে, ৫০-এর দশকের গোড়ার দিকে। শান্ত স্নিগ্ধ গোপালগঞ্জ (ফরিদপুর) মহকুমা শহরে, তখন আমার বাবা সাবডিভিশনাল অফিসার (ঝউঙ) হিসেবে কর্মরত। সেই সুবাদে পহেলা বৈশাখে বিভিন্ন দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আমরা ভাই-বোনরা আমন্ত্রণ পেতাম এবং আমাদের অত্যন্ত উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আন্তরিকতার সঙ্গে বিভিন্ন সুস্বাদু বাঙালী মিষ্টি ও পিঠা দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো। আমার অবশ্য একটা ব্যক্তিগত আফসোস রয়েই যেত। কারণ, আমার অতিপ্রিয় জিলেপি দেয়া হতো না! গুণগত মানে জিলেপি উঁচুমানের মিষ্টি হিসেবে গণ্য হতো না, এটাই সম্ভবত ছিল কারণ। গ্রাহকদের মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করার এ রেওয়াজটি আসলে বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্যের একটি অংশ। নতুন বছরের শুরুতে ব্যবসায়ীরা হালখাতা খুলতেন এবং গ্রাহকদের নতুন হিসাব খোলার আগে পুরনো সব বকেয়া মেটাতে হতো। আর সে উদ্দেশ্যেই মিষ্টি দিয়ে তাদের আপ্যায়নের এই রেওয়াজ। হালখাতার পাশাপাশি বৈশাখী মেলা, নৌকাবাইচ, বিভিন্ন রকমের ক্রীড়া প্রতিযোগিতাও ছিল তখন নববর্ষ উদযাপনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।

তখন বাংলা বছরের প্রথম দিন সরকারী ছুটির দিন ছিল না। স্কুল, কলেজ ও অফিস খোলা থাকত। মা’র কাছে জেনেছিলাম, তদানীন্তন পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ এ দিনটিকে উদযাপন করতে নিরুৎসাহিত করত। কারণ, তারা মনে করত এ দিনটির উদযাপন ‘ইসলামি সংস্কৃতির পরিপন্থী।’ আমার কাছে ব্যাপারটি খুব অদ্ভুত মনে হলো এবং নিষিদ্ধ ফলের মতোই নববর্ষ উদযাপনের প্রতিও এক ধরনের ভাললাগা কাজ করতে লাগল। সরকারী চাকরির চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী, আমার বাবা বদলি হয়ে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য জেলায় গেলেন এবং সেখানেও আমরা একইভাবে নববর্ষ উদযাপনে যেতাম এবং রকমারি স্বাদের মিষ্টি খেতাম। পরবর্তী সময়ে আমরা যখন ঢাকায় এলাম তখন লক্ষ্য করলাম যে- রাজধানীতে নববর্ষ উদযাপন হতো অত্যন্ত স্বল্প পরিসরে ও অনাড়ম্বরভাবে শুধু দু-একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে। একটা টানাপোড়েনের মধ্যে পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ বাঙালী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে অবদমিত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগল। প্রতিরোধ যেহেতু বাঙালী জাতির মজ্জায়, তাই পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের অপচেষ্টার বিপরীতে আমরা বাঙালীরা আমাদের ‘প্রতিরোধ’ অব্যাহত রাখলাম। স্বল্প পরিসরে হলেও, নববর্ষ উদযাপন তখন ছিল আমাদের প্রতিরোধের অন্যতম হাতিয়ার।

১৯৬১ সালে স্বনামধন্য সাংস্কৃতিক সংগঠন, ছায়ানট প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তারা বিভিন্ন গণ-অনুষ্ঠানে বাংলা গান পরিবেশনের মাধ্যমে বাংলা গানকে জনপ্রিয় করে তোলার প্রয়াস নিল। জনমানুষের স্বতঃস্ফূর্তভাবে তারা ১৯৬৭ সালের পহেলা বৈশাখে রমনার বটমূলে একটি সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করল। রাজধানী ঢাকায় সেটাই ছিল প্রথম জাতীয়ভাবে বাংলা নববর্ষ উদযাপন। স্বভাবতই পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ ওই উদযাপনকে ভাল চোখে দেখেনি এবং এই উদ্যোগকে নস্যাৎ করে দিতে তারা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করল। কিন্তু যতই তারা আমাদের অবদমিত করার চেষ্টা করল ততই যেন আমরা উজ্জীবিত হলাম। ফলে রমনার বটমূলের সমাবেশ প্রতিবছর ক্রমেই বড় হতে লাগল।

যেহেতু বাংলা বর্ষ নিয়ে পাকিস্তান আমলে অনেক বিতর্ক ছিল। আমি এর কারণ অনুসন্ধানে কৌতূহলী হয়ে উঠলাম এবং ইতিহাসের বই-পুস্তক ঘেঁটে এর পেছনে কি কারণ থাকতে পারে তা খুঁজতে আগ্রহী হলাম। ইতিহাস বলে যে, বাংলায় মুঘল শাসনামলে, ইসলামি হিজরী বর্ষ অনুযায়ী কৃষকদের কাছ থেকে ভূমি কর আদায় করা হতো। ইসলামি বর্ষ এবং ফসলি বর্ষের মধ্যে পার্থক্য থাকায় কর পরিশোধে প্রজাদের যেমন কষ্ট হতো, রাজস্বের পরিমাণও সন্তোষজনক হতো না। আকবর ছিলেন একজন বিচক্ষণ সম্রাট। তিনি এই সমস্যার একটি বাস্তবসম্মত সমাধান চাইলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল এমন এক সময়ে ভূমি কর আদায় করতে হবে, যখন কৃষকরা নতুন ফসল ঘরে তুলবে এবং তাদের কাছে যথেষ্ট অর্থ থাকবে। এতে একদিকে প্রজাদের কষ্ট লাঘব হবে, রাজস্বের পরিমাণও বাড়বে। তিনি তাঁর অন্যতম নবরত্ন রাজ-জ্যোতিষী ফতুল্লা সিরাজীকে নির্দেশ দিলেন ইসলামি চন্দ্র বর্ষের সঙ্গে বাংলা সৌর বর্ষের এক ধরনের সমন্বয় সাধন করে একটি নতুন বর্ষ চালু করতে হবে। তাঁরই নির্দেশের ফলে সিরাজী নিয়ে এলেন এই বাংলা পঞ্জিকা। আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে নতুন এ পঞ্জিকা চালু করেন এবং এর নাম দেন ‘তারিখ ইলাহী অথবা ‘ঈশ্বরের পঞ্জিকা’।

তবে, অনেক ইতিহাসবিদের মতে রাজা শশাঙ্ক সপ্তম শতকে প্রথম এ পঞ্জিকা বর্ষ চালু করেন এবং আকবরের রাজ জ্যোতিষী ফতুল্লা সিরাজী শশাঙ্কের পঞ্জিকার ওপর ভিত্তি করেই তার ফসলি সন চালু করেন। অন্যদের মতে, বাংলার মুঘল শাসক নবাব মুর্শিদকুলী খান সর্বপ্রথম সম্রাট আকবরের অর্থবছর অনুযায়ী বাংলা পঞ্জিকা চালু করেন। ইতিহাসবিদদের একটি অংশ অবশ্য বাংলা সাল চালুর পুরো কৃতিত্ব সম্রাট আকবরকে দিতে নারাজ এবং তাদের যুক্তি হলো : বিভিন্ন মন্দিরের নকশা ও চিত্রলিপি থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়, সম্রাট আকবরের রাজত্বকালেরও বহু আগে বাংলা সালের প্রচলন ছিল। উৎপত্তি যেভাবেই হোক, সম্রাট আকবরের প্রচলিত বাংলা পঞ্জিকাই বর্তমানে বাংলাদেশে ভূমি কর আদায়ের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ থেকে আগত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার এখনও বাংলাদেশের দাপ্তরিক পঞ্জিকা হিসেবে চালু আছে। বাংলা নতুন বছর হিসাব করা হয় সৌর পঞ্জিকার ভিত্তিতে। তাই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের নতুন বছরের সঙ্গে বাংলা নতুন বছর মিলত না। এ সমস্যা সমাধানে ১৯৬৬ সালে ড. মু. শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি বাংলা ফাল্গুন মাসের সঙ্গে প্রতি লিপ ইয়ারে এক (০১) দিন যোগ করে গ্রেগরিয়ান মডেল অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নেন। সেই থেকে প্রতিবছর ১৪ এপ্রিল বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষ উদযাপন চালু হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ ও অন্যান্য বাঙালী অধ্যুষিত ভারতীয় রাজ্যসমূহ এই সূত্র অনুসরণ করে না এবং তারা সৌর চক্রের ওপর নির্ভর করে ১৪ অথবা ১৫ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ উদযাপন করে।

স্বাধীনতার পর বাঙালী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে এক নবজাগরণ পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষ উদযাপন যথাযোগ্য স্বীকৃতি লাভ করে এবং বর্তমানে এটি সরকারী ছুটির দিন। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের সর্বস্তরের জনগণ এখন বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে এ দিনটি উদযাপন করে। সময়ের পরিক্রমায় এ অনুষ্ঠানটি এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসবে পরিণত হয়েছে এবং সর্বস্তরের জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় দিবসটি উৎসবমুখর আমেজে উদযাপনের লক্ষ্যে নববর্ষ ভাতাও চালু হয়েছে।

ঢাকায় রমনার বটমূলে এবং অন্যান্য জায়গায় প্রভাতী অধিবেশনে সঙ্গীত পরিবেশনার মাধ্যমে সচরাচর দিবসটির উদযাপন শুরু হয়। ছায়ানট এই উদযাপনে সবসময়ই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের প্রথিতযশা শিল্পীরা রবীন্দ্রসঙ্গীত ও অন্যান্য দেশাত্মবোধক গান পরিবেশনের মাধ্যমে নতুন বছরকে স্বাগত জানায়। রবীন্দ্রনাথের সেই অমর সঙ্গীত ‘এসো হে বৈশাখ, এসো, এসো’ দিয়ে এ উদযাপন শুরু হয় এবং কালক্রমে এ গানটি নববর্ষ উদযাপনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। রমনার বটমূলের উদযাপন শেষে শুরু হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। নতুন বছরে মানুষের মঙ্গল কামনায় ঢাকার পথে পথে বিচিত্র রঙের সমাহার নিয়ে এ বিশাল শোভাযাত্রা এক ভিন্ন আমেজ এনে দেয়। সমকালীন সংস্কৃতি ও রাজনীতির প্রেক্ষাপটে প্রতিবছর নতুন নতুন থিমের আলোকে মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজন করা হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রার শুরু মূলত ১৯৮৯ সালে, যখন তৎকালীন সামরিক শাসনের যাঁতাকালে পিষ্ট মানুষের জীবনে একটু আনন্দ এনে দিতে, তাদের নতুন আশার আলো দেখাতে ছাত্র সমাজ এক ধরনের বর্ণিল শোভাযাত্রার আয়োজন করত। সেই শোভাযাত্রাই সময়ের পরিক্রমায় পরবর্তীতে মঙ্গল শোভাযাত্রা হিসেবে পরিচিতি পায় এবং বাঙালী লোকজ সংস্কৃতির প্রতীকে পরিণত হয়।

দেশের সীমানা পেরিয়ে বাংলা নববর্ষ উদযাপন এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ২০১৬ সালে, ইউনেস্কো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ‘ওহঃধহমরনষব ঐবৎরঃধমব ড়ভ গধহশরহফ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। নববর্ষের সর্বজনীন উদযাপনে ছায়ানটের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি ভারত সরকার ছায়ানটকে ‘Tagore Award for Cultural Harmo’ পুরস্কারে ভূষিত করেছে এবং ভারতের রাষ্ট্রপতি শ্রী রামনাথ কোবিন্দ, প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে এই পুরস্কার ছায়ানটকে হস্তান্তর করেন।

কালক্রমে পহেলা বৈশাখ আজ পরিণত হয়েছে বাঙালীর বৃহত্তম সামাজিক উৎসবে। এদিন সবাই উৎসবের আনন্দে মাতে। রমণীরা লাল, হলুদ, কমলা ও সবুজের সমারোহে বর্ণিল সাজে সজ্জিত হয়। শিশুরা আনন্দিত মনে বৈশাখী মেলায় অংশগ্রহণ করে। ঐতিহ্যবাহী বাঙালী খাবার যেমন পান্তাভাত, মাছ ভাজা ও রকমারি মিষ্টির আয়োজনে বৈশাখকে উদযাপন করা হয়। ব্যস্ত নাগরিক জীবনেও পহেলা বৈশাখ আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় চিরায়ত ঐতিহ্যের কাছে। পল্লী অঞ্চলে ষাঁড়ের লড়াই, নৌকাবাইচ, মোরগলড়াই, কবুতরলড়াই, কাবাডি, কুস্তি এবং অন্যান্য ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এ দিনকে বিশেষভাবে উদযাপন করা হয়।

পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুধু বাঙালী সংস্কৃতিতেই নয়, বরং আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডেও একই ধরনের উদযাপন চালু রয়েছে। পাকিস্তানের লাহোরে ষাটের দশকের শেষের দিকে কূটনৈতিক সার্ভিস প্রশিক্ষণের দিনগুলোতেও আমি বিস্ময়ের সঙ্গে দেখেছি সেখানকার বৈশাখী উদযাপন। ঘুড়ি ওড়ানো, মেয়েদের বর্ণিল সাজসজ্জা, বসন্তকে স্বাগত জানাতে হাতে মেহেদি লাগানো, সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। সুতরাং নববর্ষ উদযাপনের এই যে আয়োজন, তা যথার্থই সর্বজনীন, অসাম্প্রদায়িক ও চিরায়ত।

আমাদের সংস্কৃতিতে পহেলা বৈশাখকে মনে করা হয় নতুন সূচনার দিন। নতুন বছরের শুরুতে কালবৈশাখী এসে যেমন পুরনো সব ময়লা-আবর্জনা উড়িয়ে নিয়ে চলে যায়, তেমনি পহেলা বৈশাখও আমাদের জীবনের ব্যর্থতা, গ্লানি মুছে দিয়ে আমাদের নতুন উদ্যমে শুরু করার অনুপ্রেরণা যোগায়। তাই রবীন্দ্রনাথের অমর বাণী অনুসরণ করে, আসুন আমরাও আমাদের পুরনো-জীর্ণ অতীত, দুঃখ-কষ্টকে বিসর্জন দিয়ে বাংলা নতুন বছরকে স্বাগত জানাই, নতুনের আহ্বানে, নতুন আশায়, নতুন স্বপ্নে।

লেখক : ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার