১৬ এপ্রিল ২০১৯

বারবার বলেও শেষ হয় না যে কথা

ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, হত্যা ইত্যাদি নিয়ে বহুবার বলার পর আবারও বলতে হয়। সমাজ ব্যবস্থার এ এক নির্মম প্যারাডক্স। ক্ষমতাবানরা ক্ষমতাহীনদের আরও দুর্বল ও ভালনারএবল করে রাখার প্রক্রিয়াটি অব্যাহত রাখবে, আবার সে প্রক্রিয়ার মসৃণ পথ ধরে অপকর্ম ঘটলে আহাজারির বন্যায় বুক ভাসাবে। সুতরাং যতদিন সমাজের প্রচলিত এ কাঠামো টিকে থাকবে এ সবও থাকবে। আর আমাদের হাজারবার একই কথা বলে যেতে হবে।

মানুষ যখনই মুক্ত চিন্তা নিয়ে এগিয়ে যেতে চেয়েছে তখনই সামাজিক সঙ্কীর্ণতা এসে পথ রোধ করেছে। সামাজিক পশ্চাৎপদতা ভেঙ্গে মানবিক ও যুক্তিনির্ভর আধুনিক দৃষ্টি নিয়ে এগোতে চেয়েছে, তাকে পায়ে পায়ে বাধা পেরোতে হয়েছে। নারীর বেলা বাধার রূপটা আরও জটিল ও বিভিন্নমুখী। এই জটিলতার মূল রয়েছে অন্যখানে। সে কথা লেখা রয়েছে ‘পরিবার ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’ বইয়ে।

চাওয়া-পাওয়ার সীমানা এক বিন্দুতে মেলানোর জন্যই মানুষের যাবতীয় সংগ্রাম। জীবনময় যুদ্ধ, কখনও সরাসরি কখনও অন্তর্গত। এ অঞ্চলে সে লড়াই শুরু হয়েছিল সেই ঔপনিবেশিক আমলে। সময়ের ¯্রােতে গড়াতে গড়াতে গত শতকের পঞ্চাশের দশকে তা আবছা থেকে ক্রমশ স্পষ্ট আকার পেতে থাকে। ততদিনে এ অঞ্চল থেকে রাজ্যপাট গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে তারা। নতুন উপনিবেশ গড়ার স্বপ্ন কিংবা ষড়যন্ত্র নিয়ে যারা ঘাড়ে চেপেছিল তাদেরও বিদায় সুর বেজে উঠেছে। অন্তর্গত লড়াইয়ের রূপও এ সময় থেকে ক্রমশ স্পষ্টতর হতে থাকে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী উপলব্ধি করে সংঘবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই। কারণ তাদের বঞ্চনার কথা কেউ বলে না, বলে না তাদের অবদানের কথা। উপলব্ধি হয় নিজেদের পাওয়া বা না পাওয়ার কথা, কেবলই দিয়ে যাওয়ার কথা বলতে হবে নিজেদেরই। নয় মাস যুদ্ধ হলো। স্বাধীন ভূখ- মনের জোর বাড়িয়ে দেয়। আত্মপরিচয় খোঁজার রাস্তায় এতকাল খুঁড়িয়ে চললেও স্বাধীন দেশে হঠাৎই যেন আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে। বিশ্বাসে বাস্তবে সে এক অন্য রকম সময়। যুদ্ধে পরাজিত শত্রুরা চলে গেলেও বিভীষণ কিছু ঘাপটি মেরে রয়ে যায়। তারা চোরাবালির মতো গ্রাস করতে চায় স্বাধীন চলা। প্রাণপণ আঁকড়ে টেনে রাখে উল্টো দিকে, অন্ধকারের পথে, উন্নয়নশীল অনেক দেশের নারীর পক্ষে এই প্রেতছায়া মাড়িয়ে পুরোপুরি শক্তভাবে হাঁটা সম্ভব হচ্ছিল না। পথের বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করতে সহায়তার হাত বাড়ায় জাতিসংঘ গুরুত্বপূর্ণ কিছু সনদ অনুমোদন করে। সদস্য দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তাতে স্বাক্ষর করে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা করে নারী উন্নয়নকে আলাদা গুরুত্বে নেয় । নারীরা তখন অনেক পরিণত। নিজেদের ইস্যুতে নানা ধরনের কাজ করছেন। নিজেদের অবস্থা সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা অর্জন করলেও অন্য দেশের নারীদের সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই। অভিজ্ঞতা শেয়ারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। জানতে হবে বিশ্বের অন্য নারীদের অবস্থা।

এক সঙ্গে বসার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল জাতিসংঘই, উনিশ শ’ পঁচাত্তর সালে মেক্সিকোতে প্রথম বিশ্ব নারী সম্মেলন ডেকে। তার আগে বছরটিকে বিশ্ব নারী বর্ষ ঘোষণা করেছিল ওই জাতিসংঘই। আন্তর্জাতিক পরিম-লে সেই প্রথম পরিচয়। এ সংযোগে গুণগত অর্জন তেমন না হলেও আরেকটি সম্মেলনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করিয়েছিল। আশি সালে কোপেনহেগেনে দ্বিতীয়বারের মতো একাত্রিত হয় বিশ্বের নারীরা, পঁচাশি সালে নাইরোবিতে।

তার আগের বছর বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘ সিডও সনদ অর্থাৎ নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদে স্বাক্ষর করে। অবশ্য এ স্বাক্ষর ছিল সনদের একটি ধারা ও তিনটি উপধারা বাদ দিয়ে। পরে উনিশ শ’ সাতানব্বই সালে দুটো উপধারা থেকে সংরক্ষণ তুলে নিলেও একটি ধারা ও একটি উপধারায় এখনও সংরক্ষণ রয়েছে। সাতানব্বই সালে প্রণীত হয় জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি। দু’বছর আগে পঁচানব্বই সালে বেজিংয়ে নারী উন্নয়নের প্লাটফর্ম ফর এ্যাকশন নেয়া হয়। পঁচানব্বইয়ের পর থেকে নারী বিষয়টি একটু একটু করে যেন রূপ বদলাতে থাকে। এ সময় থেকে নারী উন্নয়নকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকা-ের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এতে ক্রমশ ভাঙতে থাকে নারী আন্দোলনের নিজস্বতা। কর্পোরেট অফিসের একঝাঁক পরিশীলিত স্মার্ট নারী কর্মী বা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার একগুচ্ছ তরতাজা সম্ভাবনাময় নারী সাংবাদিক সমাজের প্রচলিত চেহারায় ধাক্কা দিয়েছে নিঃসন্দেহে। একটি মেয়ে কাজ শেষে রাত করে বাসায় ফিরবে সে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। অফিস-আদালতে নারীদের বিচরণ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। নারী পুলিশ, নারী স্থপতি, বৈমানিক ইত্যাদি সব পেশাতেই নারীর উজ্জ্বল অংশগ্রহণ বেড়েছে। প্রায় সব পেশাতেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করা নারীর সংখ্যাও নিছক কম নয়। লাভ-ক্ষতির ঝুঁকি নেয়া পেশা ব্যবসাতেও সফল নারীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে।

তবে এই সাফল্য ও দক্ষতার পাশাপাশি নির্যাতন এবং সহিংসতার চিত্রও সমানতালে চলছে। কেন এ বৈপরীত্য? আজও এই আট চল্লিশ বছর পরও? আগুনে পুড়ছে, এসিডে ঝলসে যাচ্ছে, ধর্ষণ ও হত্যায় বীভৎস ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে, হয়রানি, নিপীড়ন সমানতালে চলছে।

কেন? এর উত্তর আগেই দিয়েছি ক্ষমতাবানদের ক্ষমতা ও এ সমাজ ব্যবস্থা টিকে থাকলে এ সবও টিকিয়ে রাখতে হবে। যে জন্য ধর্ম ও শরিয়া আইনের দোহাই দিয়ে সেক্যুলার সরকারকেও সিডও সনদের ১৬.১ (গ) এবং ২ নম্বর ধারায় সংরক্ষণ আরোপ রাখতে হয়। ১৬.১ (গ) ধারায় বিয়ে ও বিয়ে বিচ্ছেদে নারীকে পুরুষের সমান সুযোগ-সুবিধা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। সিডও সনদে স্বাক্ষর দেয়া বহু মুসলিম দেশে এ আইন কার্যকর হয়েছে। ধারা দুইয়ে সম্পত্তিতে সমানাধিকারের কথা বলা হয়েছে। এখানেও বাধা সেই শরিয়া আইন। প্রায় দু’যুগ আগে ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড বা অভিন্ন পারিবারিক আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছিল। কত সরকার এলো গেল আজও সেই খসড়া অনুমোদন পায়নি।

যে দেশে সংবিধানের চার মূলনীতির অন্যতম ছিল সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা, সে দেশের মানুষের বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার দিকে এগোনোর কথা। শুরুতে নারী আন্দোলনও সে পথে এগিয়েছে। বিপ্লবী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে। শোষণমুক্ত সমাজে নারী-পুরুষ পাশাপাশি সম্মানজনক বসবাসের দিকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওই ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর বেশিরভাগ তাদের কমিটমেন্ট থেকে সরে গেছে, নারী আন্দোলনও ক্রমশ আদর্শ বিচ্যুত হয়েছে।

অধিকার আদায়ের সেই সামগ্রিকতা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। এখন সব কিছু ইস্যুভিত্তিক, প্রকল্পনির্ভর, প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দ থাকে। তার হিসাব দিতে হয়। এ কাজে মেধা বা কমিটমেন্ট নয়, দক্ষতাই মূল বিবেচ্য। সারা পৃথিবীতেই এখন এ অবস্থা চলছে।